মুজিব আমার স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬:৫৬
মুজিব আমার স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি
মুহাম্মদ সামাদ
প্রিন্ট অ-অ+
বাংলাদেশ সরকারের বর্ণাঢ্য সব আয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাতিসংঘসহ দেশের সকল গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ-মুজিববর্ষ উযাপনে নানান কার্যক্রম গ্রহণ করে। ২০২০ সালে মুজিববর্ষে প্রতি বছরের ন্যায় অনুষ্ঠিত হয় চৌত্রিশতম জাতীয় কবিতা উৎসব। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কবিতার এই বৃহত্তম উৎসব মুজিববর্ষে আয়োজিত হয় বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে। ১৯৮৩ সালের মার্চে রচিত মুজিব শিরোনামের আমার একটি কবিতার পঙ্ক্তি ‘মুজিব আমার স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি’ চৌত্রিশতম কবিতা উৎসবের মর্মবাণী এবং কবিতাটিকে উৎসব সংগীত হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এতে আমি অভিভূত হই ও গর্বিত বোধ করি। রচনার পর থেকেই পঙ্ক্তিটি সারা দেশের দেয়ালে-পোস্টারে লিখিত হয়েছে; রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের কণ্ঠে বক্তৃতায়-শ্লোগানে ধ্বনিত হয়েছে; এবং কবিতাটি বহু আবৃত্তিকারের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়ে চলেছে।

উল্লেখ্য, প্রথমে চয়ন ইসলামের সুরে ও কণ্ঠে; পরবর্তীতে গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীরের সুরে ও কণ্ঠে কবিতাটি গান হিসেবে গীত হয়ে দেশে-বিদেশে জনপ্রিয় হয়েছে। আজ থেকে প্রায় চার দশক পূর্বে রচিত কাব্যপঙ্ক্তিটিকে উৎসবের মর্মবাণী হিসেবে গ্রহণ করার সূত্রে জাতীয় কবিতা উৎসবের উদ্বোধনী পর্বে ২০২০ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি সকালে প্রদত্ত আমার সভাপতির ভাষণ এই লেখার উৎস।

২.

সকল সুন্দরের শ্রেষ্ঠ সুন্দর হলো কবিতা। তাই, তুলনা করতে গিয়ে আমরা বলি- গল্পটি বা উপন্যাসটি যেনো একটি সুন্দর কবিতা; রূপসী মেয়েটি দেখতে ঠিক যেনো একটি নিটোল কবিতা; একটি সুন্দর বক্তৃতাকে তাৎক্ষণিক তুলনা করি অসাধারণ কবিতা বলে। ইতিহাসের প্রবল ঘটনা বা বিজয়ের কাহিনীকে তুলনা করি মহাকাব্য হিসেবে। শিল্প-সুষমায় সমৃদ্ধ এই কবিতা, কাব্য বা মহাকাব্যের স্রষ্টা হলেন কবি; এই কবি সর্বশ্রেষ্ট ও সার্বভৌম মানুষ। প্রাচীনকালে কাব্যরচনা ছিলো জ্ঞানচর্চার সমার্থক। আমরা তো জানি, অতীতকালের প্রায় সকল দার্শনিক, গণিতশাস্ত্রবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী- এমন কি চিকিৎসাশাস্ত্রবিদদের মধ্যেও কাব্যচর্চার রেওয়াজ ছিলো। তাঁদের কারো-কারোর লেখার বাহন ছিলো কাব্যভাষা। যেমন, বিশ্বখ্যাত আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রবিদ বিজ্ঞানী ইবনে সিনার রচনাসম্ভারের প্রায় অর্ধেকই ছন্দোবদ্ধ কবিতার ভাষায় লিখিত। কাজেই, ভাষার সুন্দরতম রূপ এই কবিতার সঙ্গে মহৎ সৃষ্টির তুলনা নতুন নয়। যেকোনো অনন্য সৃজনের স্রষ্টা মাত্রই একেকজন শ্রেষ্ঠ কবি।

১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বাংলায় বক্তৃতা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

জীবনানন্দ দাশের দৃষ্টিতে- ‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি। তাঁর মতে, ...কবি তারাই যাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে; ...আধুনিক জগতের নব নব কাব্যবিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে। নানা রকম চরাচরের সর্ম্পকে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়’। জীবনানন্দের এমন ব্যাখ্যায়- কল্পনায়, চিন্তায়, অভিজ্ঞতায়, আধুনিক জগতের নতুন আলোয় উদ্ভাসিত এবং নানা রকম চরাচরের সঙ্গে সর্ম্পকিত যে কবি-পুরুষের ছবি আমাদের মানসপটে ফুটে ওঠে, তাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কান্তিমান অবয়বও আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। সকল কবির সৃষ্টির প্রধান পাথেয় স্বপ্ন, সাহস ও ভালোবাসা। আশৈশব নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের মুক্তির স্বপ্ন, অসম সাহস ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাই প্রধান পাথেয় ছিলো বঙ্গবন্ধু মুজিবের। তাঁর শিল্পশৈলীসমৃদ্ধ রাজনীতির সোনালি ফসল এই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে এক অনুপম সৃষ্টি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সারা জীবনের স্বপ্ন ও সাধনা ছিলো বাঙালির একটি শোষণমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রের সর্বস্তরের মানুষের উন্নত জীবন- বিশেষ করে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখি- অসহনীয় জেল-জুলুম, নির্যাতন, ষড়যন্ত্রমূলক মামলা-মোকদ্দমা অসম সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করে তিনি লক্ষ্যে স্থির ও অবিচল থেকেছেন। এভাবেই ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ ভাষা-আন্দোলনে নেতৃত্বদান ও গ্রেফতারবরণ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে শাস্তি স্বরূপমুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব রক্ষার প্রস্তাব প্রত্যাখান করায় ছাত্রত্ব বাতিল বা বহিষ্কার; যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, বাঙালির বাচাঁর দাবি ছয় দফার সংগ্রাম, ফাঁসির আশঙ্কা নিয়ে আগরতলা মামলায় দীর্ঘ কারাভোগ; ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে নিঃশর্ত মুক্তিলাভ ও সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে বিশাল বিজয় লাভের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। সর্বোপরি ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে হাজার বছরের পরাধীন বাঙালি জাতির মুক্তির জন্যে প্রতিষ্ঠা করেন স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

একটা কথা বলা আবশ্যক যে, শৈশব থেকে কলকাতার কলেজ জীবন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ব্যাকুল হয়ে সহায়হীন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে পড়ার সময় তিনি গরিব ছাত্রদের সাহায্যের জন্যে কাজ করেছেন। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে হত্যা, লুটতরাজ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আক্রমণে কলকাতা নরকে পরিণত হয়। সেই সময় তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে দাঙ্গায় আক্রান্ত উভয় ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষদের রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।

প্রসঙ্গত ১৯৬৪ সালে পুর্ব পাকিস্তান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বাঙালি হিন্দুদের উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে পাকিস্তানী শাসকচক্রের প্ররোচনায় নিষ্ঠুর গণহত্যার সময় বঙ্গবন্ধু ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে হিন্দু জনগোষ্ঠীর বিপন্ন মানুষজনকে নিজে জিপে করে এনে ধানমন্ডির বাড়িতে আশ্রয় দেন এবং শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব তাদের খাওয়ার আয়োজন করেন। ১৯৬৪ সালের ১৪ জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিককার ‘শেখ মুজিবের উপরও হামলা’ শীর্ষক একটি রিপোর্ট এখানে প্রণিধানযোগ্য: গতকল্য সকাল হতেই শেখ মুজিবুর রহমান কয়েকজন কর্মী সমভিব্যাহারে ওয়ারি এলাকার সংখ্যালঘু অধিবাসীদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের কাজে ব্যাপৃত হন। তাঁহারা যখন উদ্ধার কার্যে ব্যাপৃত ছিলেন, তখন দুস্কৃতিকারীরা তাঁহাদিগকে ধাওয়া করিয়া লইয়া যায়। কিন্তু ইহাতেও শেখ মুজিব কর্তব্য বিচ্যুত হন নাই। নিজের প্রাণের উপর ঝুঁকি নিয়াও পরে তিনি অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গে যাইয়া পুনরায় সংখ্যালঘুদের উদ্ধার কার্যে গমন করেন। শেখ মুজিবুর রহমান এবং সঙ্গী কর্মীবৃন্দ বহুকষ্টে ওয়ারী এলাকার প্রায় পাঁচশত সংখ্যালঘু অধিবাসীকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করিতে সক্ষম হন।

ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু

২.১

১৯৪৬ সালে লাহোর প্রস্তাবের সংশোধন ও ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ভারত-বিভাগের পরিকল্পনা ঘোষণার পরপরই ভাষা সমস্যা নিয়ে বাঙালি বুদ্ধিজীবী মহলে প্রতিক্রিয়া হয়। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের প্রেক্ষিতে পূর্ব বাংলার বুদ্ধিজীবীরা রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ই সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত যুবলীগের সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবসমূহের মধ্যে একটি প্রস্তাব ছিলো বাংলা ভাষা বিষয়ক। ভাষা সম্পর্কিত প্রস্তাব উত্থাপন করে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন- ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক’।এভাবেই ভাষার দাবি প্রথম রাজনৈতিকভাবে উত্থাপিত হয়েছিলো।

১৯৪৭ সালের পয়লা ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি পূর্ব বাংলার প্রথম সরকার বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। আর রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রথম প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু হয় ১৯৪৮ সালের ৪ঠা মার্চ। সেদিন বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা দাবি করে ছাত্রলীগের পক্ষে লিফলেট বিলি করা হয়। সেই লিফলেটের অন্যতম স্বাক্ষরদাতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অন্যদিকে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১১ই মার্চ দেশব্যাপী ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। ধর্মঘটের সমর্থনে জনমত গঠনের লক্ষ্যে শেখ মুজিব ফরিদপুর, যশোর, খুলনা ও বরিশালে ছাত্রসভা করেন। ঢাকায় ফিরে ১০ই মার্চ রাতে ফজলুল হক হলে এক সভায় ১১ই মার্চের কর্মসূচিতে কারা, কোথায় ও কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন তা ঠিক করে দেন।

১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধু কর্মীদের নিয়ে হরতালের পিকেটিং শুরু করেন। পিকেটিং করার সময় পুলিশি হামলার শিকার হয়ে তিনিসহ অনেক নেতা-কর্মী গ্রেফতার হন। ১৫ই মার্চ বঙ্গবন্ধু মুক্তিলাভ করেন। ১৬ই মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সদ্যকারামুক্ত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন।

এই প্রসঙ্গে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন: “জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানে এসে ঘোড় দৌড় মাঠে বিরাট সভায় ঘোষণা করলেন, ‘উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে’। আমরা প্রায় চার পাঁচ শত ছাত্র এক জায়গায় ছিলাম সেই সভায়। অনেকে হাত তুলে দাঁড়িয়ে জানিয়ে দিলো, ‘মানি না’।” ভাষা আন্দোলন ও বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্রদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদে শেখ মুজিবুর রহমানকে আহ্বায়ক করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের উদ্যোগে গঠন করা হয় ‘জুলুম প্রতিরোধ কমিটি’। ১৯৪৯ সালের ৮ই জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ‘জুলুম প্রতিরোধ’ কমিটির উদ্যোগে হরতাল, মিছিল ও ছাত্র-সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

উল্লেখ্য, ভাষা আন্দোলনের আটচল্লিশ পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা ও তরুণ রাজনীতিক শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃস্থানীয় ভূমিকা ছিলো খুবই উজ্জ্বল। মূলত ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানের মাধ্যমে তিনি ঢাকার ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হন এবং অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতায় নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের শক্ত ভিত নির্মাণ করেন।

১৯৭১ সালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে উৎফুল্ল জনতার মাঝে পতাকা তুলে ধরছেন জাতির পিতা

১৯৫০ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের নিরাপত্তা আইনে বন্দি হিসেবে কারাগারে ছিলেন। অসুস্থতার কারণে বেশকিছু সময় তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, লেখক-ইতিহাসবিদদের রচনা, সে সময়ের পত্র-পত্রিকা এবং গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, কারাগারে বন্দি, এমন কি অসুস্থ অবস্থায়ও বঙ্গবন্ধু জেল থেকে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন। কারাগারের রোজনামচা’র ভাষ্যে বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক কর্মসূচির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পৃক্ততা বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। তিনি লিখেছেন: ‘...জানুয়ারি মাসে আমাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। ...সেখানেই ছাত্র নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করে ১৬ই ফেব্রুয়ারি [আমি] অনশন করবো আর ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলা দিবস পালন করা হবে বলে স্থির হয়'।

তার পরের ইতিহাস সকলেরই জানা আছে। ইতিহাসের পথপরিক্রমায় বর্তমান প্রজন্মের কাছেও আজ স্পষ্ট হয়েছে যে, ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এভাবে ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারিতে শহীদের রক্তের বিনিময়ে ভাষা আন্দোলন যৌক্তিক পরিণতি লাভ করে। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারাবিশ্বে মর্যাদার সঙ্গে পালিত হচ্ছে।

২.২

বাঙালি জাতির মুক্তিই ছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধ্যান-জ্ঞান ও সকল কর্ম-প্রয়াসের মূল লক্ষ্য। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক সাহসী ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হলো বাঙালির বাঁচার দাবি ৬দফা কর্মসূচি ঘোষণা। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের বিরোধী দলসমূহের কনভেনশনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু তাঁর এই ঐতিহাসিক কর্মসূচি পেশ করেন। ৬ দফার উল্লেখযোগ্য দাবিগুলো ছিল: ০১. পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অধীনে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত আইন পরিষদের মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন; ০২. বৈদেশিক সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা ব্যতীত সকল বিষয় প্রদেশের হাতে ন্যস্তকরণ; ০৩. একটি ফেডারেল ব্যাংকের অধীনে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের জন্যে পৃথক কিন্তু অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রাব্যবস্থা প্রচলন এবং পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচার রোধ করা; ০৪. প্রদেশগুলোকে শুল্ক ধার্য করার ক্ষমতা প্রদান করা এবং তা থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্যে একটি নির্দিষ্ট অংশ রাখা; ০৫. পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের বৈদেশির মুদ্রার পৃথক হিসাব এবং অর্জিত বৈদেশির মুদ্রা স্ব-স্ব প্রদেশের নিয়ন্ত্রণে রাখা; কেন্দ্রীয় সরকারের বৈদেশিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রাদেশিক সরকার কর্তৃক বিদেশে বাণিজ্য প্রতিনিধি প্রেরণ ও চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা প্রদান; এবং ০৬. প্রদেশসমূহের নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্যে আধাসামরিক বাহিনী গড়ে তোলা।

এই ৬দফা কর্মসূচি দেখে তৎকালীন পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বুঝতে বাকি রইলো না যে, বঙ্গবন্ধুর মূল লক্ষ্য বাঙালি জাতির মুক্তি এবং দ্বিতীয় লক্ষ্য পাকিস্তান রাষ্ট্রের সকল প্রদেশের স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠা করা। ফলে সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খান, কিছু রাজনৈতিক দল এবং পশ্চিম পাকিস্তানের পত্র-পত্রিকাগুলো ৬ দফা কর্মসূচিকে পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের এক নম্বর শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফার প্রচার ও জনসমর্থনে গণসংযোগ কর্মসূচি চলাকালে তিন মাসে বঙ্গবন্ধুকে আটবার গ্রেফতার করা হয়। ৬ দফা ঝড়ের গতিতে বাংলার সর্বস্তরের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর ভিত কেঁপে ওঠে। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে জেনারেল আইয়ুব খানের সরকার বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামী করে ৩৫জন সামরিক-বেসামরিক বাঙালির ব্যক্তির নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করে। ১৯৬৬ সাল থেকে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনে বন্দি বঙ্গবন্ধুকে এই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ১৯৬৮ সালেই এপ্রিল মাসে আইয়ুব খান এক অর্ডিন্যান্স জারির মাধ্যমে বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠন করে তৎকালীন ঢাকার কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করেন। বিচারে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসি ছিল অবধারিত। এই সময় বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেয় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। শেখ মুজিব তা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখান করেন। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে সারাদেশে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে ওঠে- যা বাঙালির ইতিহাসে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান হিসেবে নন্দিত। ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় আন্দোলনের জোয়ারে আইয়ুবের ষড়যন্ত্র তৃণখণ্ডের মতো ভেসে যায়। ১৯৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান নিঃশর্ত মুক্তি লাভ করেন এবং ২৩শে ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষ লোকের সমাবেশে জাতির পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

বঙ্গবন্ধু বাঙালির বাঁচার দাবি ৬ দফার পথ ধরে মুক্তির পথে এগিয়ে চলেন। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে ২৮শে অক্টোবর রেডিও-টেলিভিশনের ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালির মুক্তির কথা; নির্বাচনে বিশাল বিজয়ের পর ১৯৭১-এর ৩রা জানুয়ারি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ‘মানুষে মানুষে বিরাজমান চরম রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের চির-অবসান ঘটিয়ে শোষণমুক্ত এক সুখী সমাজের বুনিয়াদ গড়ার এবং অন্যায় অবিচার বিদূরিত করে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবার’ দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা। সেদিন বঙ্গবন্ধু বলেন- ৬ দফা ও ১১ দফা আজ আর আমার নয়, আমার দলেরও নয়। ৬ দফা আজ বাংলার জনগণের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। কেউ যদি এর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে বাংলার মানুষ তাকে জ্যান্ত সমাধিস্থ করবে। এমনকি আমি যদি করি আমাকেও। প্রকৃত ও মহৎ কবি বা শিল্পীর প্রধান দাবি যেমন বর্তমানকে না মানার, বর্তমানকে ফলার এবং বিপরীতে নতুন চিন্তা, নতুন স্বপ্নকে আবাহন করার, তেমনি আপোসের সকল প্রস্তাব অনমনীয় দৃঢ়তায় প্রত্যাখান করে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার পথে এক ধাপ এগিয়ে নিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

২.৩

১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বিশাল বিজয় অর্জনের মধ্যে দিয়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধান নির্বাচিত নেতা আর বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা তাঁর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। বাংলাদেশের সকল প্রশাসন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে। অতঃপর বঙ্গবন্ধুর জীবনের সকল সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয় ১৯৭১-এর ৭ই মার্চ তারিখে। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর লক্ষ লক্ষ জনতার মহাসমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন: ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- যা বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা। কেউ কেউ আবার ৭ই মার্চের ভাষণে সুদূরপ্রসারী আত্মপ্রত্যয়ে বলীয়ান: ‘...আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না’ উক্তিটিকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অপ্রতিরোধ্য বাঙালি জাতির বুকে সাহস সঞ্চারী চিরকালীন কাব্যপঙ্ক্তি রূপে মান্য করেন। ৭ই মার্চের ভাষণের মহিমা কীর্তন করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সাপ্তাহিক সাময়িকী দি নিউজউইক-এর ৫ই এপ্রিল ১৯৭১ সংখ্যায় বঙ্গবন্ধুকে পোয়েট অব পলিটিক্স অর্থাৎ রাজনীতির কবি বলে আখ্যায়িত করে। বলা বাহুল্য, আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না’- এই ধ্রুপদী পঙ্ক্তিটি আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে অগণিত মুজিব অনুসারীদের কণ্ঠে প্রতিদিন ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে।

২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘উই শ্যাল ফাইট অন দি বিচেস: দি স্পিচেস দ্যাট ইনস্পায়ার্ড হিস্ট্রি (We Shall Fight on the Beaches: The Speeches That Inspired History)’ গ্রন্থে ইতিহাসবিদ জ্যাকব এফ. ফিল্ড ৭ই মার্চের ভাষণটিকে পৃথিবীর আড়াই হাজার বছরের ৪১টি শ্রেষ্ঠ ভাষণের একটি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা বা ইউনেস্কো এই ভাষণটিকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ‘মেমোরি অব দি ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্ত করে। ইউনেস্কো এই ভাষণ অন্তর্ভুক্তির গুরুত্ব ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছে এইভাবে: The speech effectively declared the independence of Bangladesh. The speech constitutes a faithful documentation of how the failure of post-colonial nation-states to develop inclusive, democratic society alienates their population belonging to different ethnic, cultural, linguistic or religious groups.

২.৪

১৯৭১-এর ২৫শে মার্চ অপারেশন সার্র্চলাইটের নামে নিরীহ-নিরাপরাধ বাঙালিদের হত্যায় মেতে ওঠে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং এই বাংলাদেশে পৃথিবীর ইতিহাসে বর্বরতম গণহত্যা সংঘটিত হয়। ২৫শে মার্চ গভীর রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানী বাহিনী। গ্রেফতারে আগে পূর্ব-পরিকল্পনা মাফিক বঙ্গবন্ধু ১৯৭১-এ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেও আরেক শ্রেষ্ঠ কবিতা:

ইহাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছো, যাহার যাহা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও। -শেখ মুজিবুর রহমান, ২৬ মার্চ, ১৯৭১

৭ই মার্চের ভাষণে নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাই তাঁর ডাকে ত্বরিৎ সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাঙালি পুলিশ, ইপিআর, ছাত্র-তরুণ-তরুণী, শ্রমিক-কৃষক-কৃষাণি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা অস্ত্র হাতে পাকহানাদার বাহিনীকে রুখে দাঁড়ায়। বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় এবং শুরু হয় সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষের অধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের মূল্যে অর্জিত হয় স্বাধীনতা- পৃথিবীর মানচিত্রে আবির্ভূত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

২.৫

১৯৭২-এর ১০ই জানুয়ারি সাড়ে সাত কোটি মানুষের ব্যাকুল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পাকিস্তানের অন্ধকার কারা-প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্ত হয়ে বাঙালির মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সগৌরবে ফিরে আসেন রক্তেভেজা মাতৃভূমির পবিত্র মাটিতে। বঙ্গবন্ধুর জেল-জুলুম-ত্যাগ-তিতিক্ষাসহ সকল সংগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিলো বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি। সেই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিলো তাঁর জীবনের সব চেয়ে বড় চাওয়া ও পরম পাওয়া। তাঁর জীবনের সাধনা ছিল দুঃখ ও দারিদ্র থেকে বাংলার কৃষক-শ্রমিক মেহনতী মানুষের মুক্তি আর তাদের মলিন মুখে হাসি ফোটানো। তিনি যেমন শ্যামল বাংলা ও বাংলার মানুষকে প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছেন তেমনি বাংলার সবুজ প্রকৃতি ও সরল মানুষ তাঁকে ভালোবেসে তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মরণপণ স্বাধীনতা সংগ্রামে ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে। তাই দেখি, ১৯৭২-এর ১০ই জানুয়ারি বাঙালির হাজার বছরের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়- যখন তৎকালীন রেসকোর্সে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তি উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচনা করেন আরেকটি নতুন কবিতা। তার কিছু উল্লেখযোগ্য পঙ্ক্তি:

আমি প্রথমে স্মরণ করি আমার বাংলাদেশের ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী, সেপাই, পুলিশ, জনগণকে, হিন্দু-মুসলমানকে [যাদের] হত্যা করা হয়েছে, তাদের আত্মার মঙ্গল কামনা করে আমি আপনাদের কাছে দুই-এক কথা বলতে চাই। আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে, আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে। ...বাংলার ছেলেরা, বাংলার মায়েরা, বাংলার কৃষক, বাংলার শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবী যেভাবে সংগ্রাম করেছে; আমি কারাগারে বন্দি ছিলাম, ফাঁসিকাষ্ঠে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম- আমার বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। ...প্রায় ৩০ লক্ষ লোককে মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছে বাংলায়।...আমি জানতাম না আমি আপনাদের কাছে ফিরে আসবো। আমি খালি একটা কথা বলেছিলাম- তোমরা যদি আমাকে মেরে ফেলে দাও আমার আপত্তি নাই, শুধু আমার লাশটা আমার বাঙালির কাছে দিয়ে দিও, এই একটা অনুরোধ তোমাদের কাছে।...বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশ স্বাধীন থাকবে। বাংলাদেশকে কেউ দমাতে পারবে না।

আমি বলেছিলাম যাবার আগে- ও বাঙালি এবার তোমাদের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবার তোমাদের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। আমি বলেছিলাম- ঘরে ঘরে দুর্গ তৈয়ার করো, তোমরা ঘরে ঘরে দুর্গ তৈয়ার করে সংগ্রাম করেছো। আমি আজ বাংলার মানুষকে দেখলাম, বাংলার মাটিকে দেখলাম, বাংলার আকাশকে দেখলাম, বাংলার আবহাওয়াকে অনুভব করলাম। বাংলাকে আমি সালাম জানাই। আমার সোনার বাংলা তোমায় আমি বড় ভালোবাসি!

...আমারে আপনারা পেয়েছেন আমি আসছি। জানতাম না আমার ফাঁসির হুকুম হয়ে গেছে। আমার সেলের পাশে কবর খোঁদা হয়েছে। আমি প্রস্তুত হয়ে ছিলাম; বলেছিলাম- আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, একবার মরে দুইবার মরে না। আমি বলেছিলাম আমার মৃত্যু এসে থাকে যদি আমি হাসতে হাসতে যাবো, আমার বাঙালি জাতকে অপমান করে যাবো না, তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইবো না এবং যাবার সময় বলে যাবো- জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।

...নতুন করে গড়ে উঠবে এই বাংলা। বাংলার মানুষ হাসবে, বাংলার মানুষ খেলবে, বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে, বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে- এই আমার জীবনের সাধনা।

৩.

ইতিহাসে দেখা যায় স্বাপ্নিক মানুষ সৃজনশীল লেখালেখিতে ব্রতী না হয়ে পারেন না। হোক সে কবিতা, কথাসাহিত্য, আত্মস্মৃতি বা ভ্রমণ কাহিনী। রাজনীতিক ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইস্টন চার্চিল তাঁর আত্মজৈনিক লেখালেখি ও বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত ভাষণ-বক্তৃতা-বিবৃতির সংকলনের জন্যে ১৯৫৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনকারী ও পথিকৃত সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী বাবুরনামার খ্যাতি বিশ্বজনীন। বাবরের কবিতা আজও উজবেকিস্তানের জনপ্রিয় লোকসংগীত রূপে গাওয়া হয়। বৃটিশ ভারতের সিভিল সার্ভিস অফিসার ও ভারত বিশেষজ্ঞ হেনরী বেভারিজকে (১৮৩৭-১৯২৯) উদ্ধৃত করে ইংরেজ প্রাচ্যবিদ-প্রত্নতাত্ত্বিক স্ট্যানলি লেইন-পুল (১৮৫৪-১৯৩১) ইউরোপের সেন্ট অগাস্টিন, দার্শনিক রুশো, ইতিহাসবেত্তা এডওয়ার্ড গিবন ও বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনের আত্মজীবনীর সঙ্গে তুলনা করে বাবুরনামাকে এশিয়ার একমাত্র সুলিখিত ও প্রাণবন্তু আত্মজীবনী রূপে উল্লেখ করেছেন। ১৯২৫ থেকে ১৯২৯ সালের মধ্যে রচিত মহাত্মা গান্ধীর আত্মজীবনী দি স্টোরি অব মাই ইক্সপেরিয়েন্স উইথ ট্রুথ সম্ভবত লেইন-পুল-এর চোখ এড়িয়ে যায়।

প্রসঙ্গত: দার্শনিক জ্যাঁ জাঁক রুশোর কনফেশনস এবং কবি পাবলো নেরুদার মেমোইরস পাঠ করলে নিঃসন্দেহে কবিতা-সাহিত্য-দর্শনে আগ্রহী আমাদের হৃদয় রোমাঞ্চিত হয়। মহাত্মা গান্ধীর আত্মজীবনী দি স্টোরি অব মাই ইক্সপেরিয়েন্স উইথ ট্রুথ-এর এক অংশ আমাদেরকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনস্মৃতির কাছে নিয়ে যায়; অন্য অংশে বর্ণবৈষম্য ও শোষণ-বঞ্চনার নিরিখে দক্ষিণ আফ্রিকায় আর ভারতবর্ষে মানবাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যপট চোখের সামনে মেলে ধরে।

অন্যদিকে বাবুরনামা পাঠ করলে ষোড়শ শতাব্দির প্রথমার্ধে ঘোড়া ছুটিয়ে মধ্য এশিয়ার বিপদসংকুল পাহাড়-পর্বত-বন-বাদাড় আর খরস্রোতা নদ-নদী উজিয়ে; অসীম আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে, অসংখ্য সম্মুখ সমর জয় করে ক্ষুদ্র ফরগানা রাজ্যের নৃপতি জহীর উদ্দীন মুহম্মদ বাবরের ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনকারী সম্রাটের শিরোপা অর্জনের কাহিনী অকল্পনীয় মনে হয় বৈ কি? উপরন্তু পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ, যুদ্ধের চরম নির্দয়তা, কখনো বা ক্ষমার মহানুভবতা এবং ক্ষণে ক্ষণে নিজের ও অন্য কবিদের মহৎ কবিতার উদ্ধৃতি পাঠকমাত্রকেই জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনদর্শনে ভাবিয়ে তোলে।

প্রসঙ্গত: উজবেকিস্তানের জাতীয় বীর হিসেবে বরেণ্য বাবরের অসংখ্য জনপ্রিয় কবিতা এখন লোকগান হয়ে শুধু মধ্য এশিয়ায় নয় সারাবিশ্বে সংগীতসুধা ছড়িয়ে চলেছে এবং তূর্ক ভাষার লোকসংগীতশিল্পীদের বিখ্যাত করে তুলেছে। যেমন বাবর রচিত লোকগান পরিবেশন করে উজবেক সংগীতশিল্পী শেরআলি জোরায়েভ-এর খ্যাতি আজ বিশ^জোড়া। এসব আত্মজীবনী ভাষা-কথা, অনুপম বর্ণনা ও সাহিত্যের তুল্য-মূল্য বিচারে একেকটি অমর কাব্যই বটে!

বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর পবিবারের সাথে তোলা ছবি

আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বে রাজনীতির কবি অভিধায় অভিষিক্ত আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সংগ্রাম, ভাষণ-বক্তৃতা আর লেখালেখিও যেনো মানুষের ভালোবাসায় ভেসে যাওয়া এক কবিরই কারুকাজ খঁচিত সৃষ্টিসম্ভার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তিন খণ্ডের মহাকাব্যোপম আত্মজীবনী: অসমাপ্ত আত্মজীবনী (২০১৭), কারাগারের রোজনামচা(২০২০) এবং আমার দেখা নয়া চীন (২০২১) পাঠ করলে প্রতিটি পঙ্ক্তিতে একজন স্বপ্নচারী শক্তিমান কবির সাবলীল কণ্ঠস্বর আমাদের হৃদয়-মনকে মথিত করে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ-বিবৃতি-কথা ও কথকতার প্রসাদগুণ অনন্য সাহসে ও শিল্পসুষমায় দীপ্যমান। গণমানুষের অফুরন্ত অনুপ্রেরণা ও মুক্তির উৎস তাঁর ভাষণের দোলায়িত ছন্দ ও কাব্যগুণ এতই শক্তিশালী যে, রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা তো বটেই, সারা দেশের অসংখ্য শিশু-কিশোর বঙ্গবন্ধুর অমৃত ভাষণ কণ্ঠে ধারণ করে জনসমাজকে প্রতিদিন উদ্দীপ্ত করে চলেছে।

৪.

কবি উপাধিটি সমাজের কীর্তিমান মানুষদের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জনের স্বীকৃতিজ্ঞাপক। প্রাচীন সময় থেকে স্বপ্ন, সাহস ও ভালোবাসায় ঋদ্ধ অনেক কবি প্রশাসক ছিলেন কিংবা প্রশাসক কবি ছিলেন। এছাড়া বহু জনগণনন্দিত মহান নেতা, রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান থেকে রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ, আইনবিদ, আমলা ও কূটনীতিক কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। যেমন- কবি দান্তে তাঁর কালে ইতালির অন্যতম প্রভাবশালী প্রশাসক ছিলেন; চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক ও কবি-দার্শনিক ইবনে সিনা স্বদেশে একটি অঞ্চলের প্রশাসক ছিলেন; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার সৃষ্টির পাশাপশি জমিদারীর দায়িত্ব পালন করেন এবং শান্তিনিকেতনে একটি বিশ্বখ্যাত ব্যতিক্রমী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন ও দক্ষতার সঙ্গে সেটি পরিচালনা করেন। নয়াচীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সে তুং ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির প্রবক্তা কার্ল মার্কসের মহৎ কবিতা আমাদের মুগ্ধ করে; সেনেগালের রাষ্ট্রপতি লিও পোল্ড সেঙ্ঘর কবিতায় নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন; হিন্দিভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি অটলবিহারী বাজপেয়ি সম্প্রতিকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বপালন করলেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করে বাঙালির মুক্তিদাতা ও জাতির পিতায় ভূষিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বস্বীকৃত রাজনীতির কবি। এমনকি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির পুনরুত্থান ঘটিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে অভাবিত সমৃদ্ধি এনে দেয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে বলা হয় উন্নয়নের কবি।

৫.

রাজনীতি করতে পোস্টার প্রয়োজন আর বিপ্লবের জন্যে প্রয়োজন ভালো সাহিত্য। ভারতে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পথে অন্যতম পাথেয় ছিলো। বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি, কবিতা ও সংগীতের প্রতি ছিলো তাঁর অসামান্য অনুরাগ। আর, এই সবই বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক ও উদার রাজনৈতিক মানস গঠনে সহায়ক হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবন চলার পথে কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক এবং সংগীত ও চিত্রশিল্পীদের সান্নিধ্য লাভ করে যে আনন্দিত ও অভিভূত হয়েছেন; গর্বিত বোধ করেছেন- তা আমরা পাই তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে, কারাগারের রোজনামচায়এবং আমার দেখা নয়াচীন-এ। দেখা যায়, বত্রিশ বছরের তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান উনিশশ বায়ান্ন সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত গণচীনের শান্তি সম্মেলনে বাংলায় বক্তৃতা করেছেন; এবং প্রসঙ্গক্রমে বাঙালি লেখক মনোজ বসুর কাছে মাতৃভাষার জন্যে পূর্ব বাংলার ছাত্রদের জীবন উৎসর্গের কথা গর্বিতচিত্তে স্মরণ করেছেন। এই সম্মেলনে সোভিয়েত রাশিয়া প্রবাসী তুরস্কের বিপ্লবী কবি নাজিম হিকমত ও রুশ বংশোদ্ভুত মার্কিন লেখক আইজ্যাক আসিমভ-এর সান্নিধ্যে খুব অভিভূত হয়েছিলেন। খ্যাতিমান বাঙালি কবি-শিল্পী-গায়ক-লেখক-সাংবাদিকদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, জসীম উদ্দীন, জয়নুল আবেদিন, আব্বাসউদ্দিন আহমদ, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, শাহ আবদুল করিম প্রমুখের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কের কথা আমাদের সকলেরই জানা।

প্রসঙ্গত বলা আবশ্যক যে, ১৯২৫ সালে ভারতবর্ষীয় দার্শনিক সঙ্ঘের সভাপতির ভাষণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন: ‘দার্শনিকপ্রবর প্লেটো তাঁহার আদর্শ গণরাষ্ট্র হইতে কবিদের নির্ব্বাসিত করেন। কিন্তু ভারতবর্ষে দর্শন চিরদিন কাব্যকে মিত্রপক্ষীয় বলিয়া আদর করিয়া আসিয়াছে। কারণ এখানে দর্শনের চরম লক্ষ্য সাধারণের জীবনকে অধিকার করা- বিদগ্ধমণ্ডলীর রুদ্ধদ্বার খাস কামরা আশ্রয় করা নহে।’ অভিভাষণটির পরতে পরতে মহাভারত-রামায়ন, বেদ-উপনিষদের কাব্য-গীতকে ছাপিয়ে ভারতের মরমীসাধক ও লোককবিদের কবিতা আর গানের বাণী উদ্ধৃত হয়েছে। আমাদের বলতেই হবে যে, সারা বাংলার লোককবিরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিরাম সংগ্রাম, অবিসংবাদিত নেতৃত্ব ও শোকাবহ পঁচাত্তর নিয়ে বহু কবিতা, বাউল-জারি-সারি-ভাওয়াইয়া-পালা ও গম্ভীরা গান রচনা করেছেন।

লোককবিদের মধ্যে আমরা কয়েকজনের কথা এখানে উল্লেখ করতে পারি। ছয় দফা ও এগারো দফার সংগ্রাম এবং সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে সাহসী নেতৃত্ব নিয়ে আবদুল মজিদ তালুকদার তাঁর গানে লিখেছেন: ‘ছয় দফারই নৌকাখানি/এগার দফার বৈঠা/গরিব-দুঃখী লইয়া নাও/শূন্যে মারছে উড়া রে।/ভয় করি না আসুক যত/তুফান কিংবা ঝড়/নায়ের পাছায় বইসা আছে/নেতা শেখ মুজিবুর রে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতি বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসার অভিব্যক্তি লক্ষ করা যায় মকছেদ আলী সাঁইয়ের গানে: ‘একটি পরাণে রহিয়াছে গাঁথা/সাড়ে সাত কোটি প্রাণ/একটি মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে/জীবন করিল দান/...‘বঙ্গবন্ধু নয়কো একা/আয়নায় যায় সব মুখ দেখা’। তেমনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যার শিকার সকল বাঙালি হয়ে যান একেকজন মুজিবুর রহমান; আর ঠিক এই কথা প্রকাশ পায় আগরতলার লোককবি সুমিবল ভট্টাচার্যের গানে: ‘আল্লারে এই কি তোর বিচার আল্লাহ এই কি তোর ফরমান/ কোন দোষোতে মরে লক্ষ মুজিবুর রহমান’।

অন্যদিকে শোকাবহ উনিশশ পঁচাত্তর-পরবর্তীকালে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে সামরিক শাসকরা বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির চক্রান্তে লিপ্ত হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সারা জীবনের সংগ্রাম, জেল-জুলুম ও ত্যাগের মহিমাকে ম্লান করে ইতিহাস থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলার এই চক্রান্ত চলে দীর্ঘ দুই দশকের অধিককাল। কিন্তু পঁচাত্তর-পূর্বকালেই স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুর অমূল্য অবদান ও বাঙালির জাতির পিতা হিসেবে তাঁর স্বীকৃতির ইতিহাস আমরা পাই গ্রামবাংলার সত্য-সাধক শাহ আবদুল করিমের বাউলগানে: ‘...এনে দিলেন স্বাধীনতা/তাই তো বলে জাতির পিতা/সাক্ষী বিশ্বের জনতা/‘...শুনি জ্ঞানী-গুণীর কথা/শ্রেষ্ঠ হয় মানবতা/শেখ মুজিব জাতির পিতা/করিম বলে নাই সংশয়।।’

৬.

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ও গান ছিলো বঙ্গবন্ধুর জীবনে আনন্দের উৎস আর সংকটকালের সঞ্জীবনী অনুপ্রেরণা। জানা যায়, বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণার পর পাকিস্তানের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের সমর্থন না পাওয়ায় তিনি গাইতেন: ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।’ কারাগারের রোজনামচায় দেখা যায় কারা-অন্তরালে দুঃসহ যাতনার মধ্যে তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে: ‘বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর প্রার্থনা-বিপদে আমি না যেন করি ভয়’। ১৯৫৬ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর একান্ত আগ্রহে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি দেশাত্মবোধক গান হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে এবং পরবর্তীকালে এই গানটিকেই তিনি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রূপে গ্রহণ করেন।

কবিতার প্রতি বঙ্গবন্ধুর যেমন অনুরাগ ছিলো, তেমনি বঙ্গবন্ধুর প্রতি বাংলার কবিদের হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসার কথা আজ সর্বজনবিদিত। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাংলা ভাষার নবীন-প্রবীণ কবিদের রচিত শোক, ভালোবাসা আর প্রতিবাদের উজ্জ্বল পঙ্ক্তিমালা আমরা পাই প্রধানত ১৯৭৫ সালে তাঁর মর্মান্তিক মহাপ্রয়াণের পরে। এই স্বল্প পরিসরে যেমন অনেক কবির কথা উল্লেখ করা সম্ভব নয়, আবার অগ্রগণ্য কয়েকজন কবির কথা না বললেও নয়। নির্মলেন্দু গুণ পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে চতুর্দিকের ভয়-ত্রাস থেকে নিজেকে মুক্ত করার মানসে এবং মুজিব হত্যার খুনিদের বিরুদ্ধে জাতিকে আগামী দিনের প্রস্তুতির আহ্বান জানিয়ে উনিশশ ছিয়াত্তর সালে বাংলা একাডেমির একুশের কবিতাপাঠের আসরে তাঁর ভয় নেই কবিতাটি পাঠ করেন- যেটির উল্লেখযোগ্য পঙ্ক্তিগুচ্ছ হলো: ‘আমি আছি নির্ভিক/আগামীর যুদ্ধে,/ঘৃণার কৃপাণ হাতে/খুনির বিরুদ্ধে।’ অতঃপর বাঙালি জাতির ওপর চেপে বসা জগদ্দল ভয়ের আগ্রাসন থেকে জাতিকে মুক্ত করার অভিপ্রায় নিয়ে পরের বছর একাডেমির একুশের কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানে নতুন কবিতা নিয়ে হাজির হন এবং দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করেন: ‘সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,/... সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ গতকাল/আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।/আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।...আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’। এবং এই কবিতাটিই ছিলো উনিশশ পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুর নির্মম-নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর নাম উচ্চারণ করে প্রথম প্রকাশ্য প্রতিবাদ- যা করতে হয়েছিলো বাংলার এক দুঃসাহসী কবিকেই। অতঃপর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শামসুর রাহমান লিখলেন- ‘ধন্য সেই পুরুষ, যার নামের ওপর পতাকার মতো/দুলতে থাকে স্বাধীনতা’। সৈয়দ শামসুল হক বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন ও পথচলা এবং জাতির পিতা মুজিবের স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও জীবন উৎসর্গের কথা স্মরণে এনে লিখলেন- ‘এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ আমি কি তেমন সন্তান/যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান’। বাংলাদেশের মাতৃতুল্য নদীদের সাক্ষী রেখে উনিশশ একাত্তরের ডিসেম্বরে অন্নদা শংকর রায় লিখেন- ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’- এই কবিতা বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তির চিরকালের স্বীকৃতি।

৭.

বঙ্গবন্ধুর জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তিনিতাঁর শৈশব থেকে সহায়হীন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। দুর্ভিক্ষের সময় মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন। নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আক্রান্ত উভয় ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষদের রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। সর্বোপরি, মাতৃভূমির ও রাজনীতির শ্রেষ্ঠ সেবক হিসেবে ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জন্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র। আমরাসহজে বলতে পারি- একজন কবির সৃষ্টিসম্ভার যেমন সকল বয়সের, সকল শ্রেণীর, সকল পেশার মানুষের কাছে আদরণীয় হয়, বঙ্গবন্ধুর জীবনে অর্জিত বর্ণাঢ্য সৃষ্টিসম্ভার তেমনি অতুল বহুমুখীনতায় সমৃদ্ধ। একজন কবি যেমন দুঃখ-বেদনা ও ভালোবাসার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পান; অকথ্য দৈহিক ও মানসিক যাতনাকে সঙ্গে নিয়ে তার বেদনাবিদ্ধ হৃদয়ই যেমন হয়ে ওঠে কবিতার জন্মভূমি; এক অতি মানবীয় শক্তিমত্তার বরাভয়ে তিনি যেমন হয়ে ওঠেন সকল মানুষের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ; তেমনি বঙ্গবন্ধুও সেই অতিমানবীয় ও অদম্য শক্তিমত্তায় রচনা করেছেন বাঙালির স্বাধীনতা নামক শ্রেষ্ঠ কাব্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সংগ্রামের আবশ্যিক অনুসঙ্গ তাঁর ভাষণ-বক্তৃতা আর লেখালেখিও শিল্পসুষমায় সমৃদ্ধ এক মহৎ কবির অনুপম সৃষ্টিসম্ভার। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সকল কবির কর্তব্য মানুষের জন্য অনিন্দ্য সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন রচনা করা। একজন কবির মতই একজন রাজনৈতিক নেতাও মানুষকে স্বপ্ন দেখান। তবে, তিনি শুধুমাত্র স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষান্ত হন না, জনমানুষের স্বপ্নকে তিনি বাস্তবে রূপদানও করেন। বাঙালির হাজার বছরের স্বাধীনতার স¦প্ন যাঁর জীবনের সাধনা ও সংগ্রামে বাস্তব রূপ লাভ করেছে- তিনি নিঃসন্দেহে রাজনীতির এক মহান কবি। তাই, ‘মুজিব আমার স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি’।


সহায়ক গ্রন্থ ও তথ্যসূত্র:

১. অন্নদাশঙ্কর রায়, শালিধানের চিঁড়ে (ডিএম লাইব্রেরি, কলকাতা, ১৯৭২)

২. আমিনুর রহমান সুলতান, লোকগানে জনকের মুখ, (সাতভাই চম্পা প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১৯)

৩. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, (লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ঢাকা, এপ্রিল ২০১৬)

৪. গাজীউল হক, ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা’, ভালোবাসি মাতৃভাষা (বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঢাকা ১১ মার্চ, ২০০২)

৫. জহীর-উদ্দীন মুহম্মদ বাবুর, বাবুরনামা [বাবুর কর্তৃক চাঘতাই তুর্কি ভাষায় রচিত স্মৃতিকথা, প্রথম ও দ্বিতীয় খÐ, ইংরেজি অনবাদ: জন লেডেন ও উইলিয়াম র্এস্কিন, ১৮২৬; বাংলা অনুবাদ: প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ, তৃতীয় পুনর্মুদ্রণ] (বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১৮)

৬. তোফায়েল আহমেদ, ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ৫০ বছর পূর্তি, দৈনিক ইত্তেফাক (ঢাকা ২৩ ফেব্রæয়ারি, ২০১৯)

৭. তোফায়েল আহমেদ, রক্তঝরা মার্চ ১৯৭১: অসহযোগ আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা, (জার্নিম্যান, ঢাকা, ২০২০)

৮. নির্মলেন্দু গুণ, মুজিবসমগ্র, (বিভাস, ঢাকা, ২০২০)

৯. ফয়জুল লতিফ চৌধুরী (সম্পাদিত), জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধ সমগ্র, (দেশ প্রকাশন, ঢাকা, ১৩৯৬)

১০ জীবনানন্দ দাশ, কবিতার কথা, (বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১৬)

১১ ভবানীপ্রসাদ দত্ত (অনুদিত), অনুস্মৃতি (গবসড়রৎং ড়ভ চধনষড় ঘবৎঁফধ; প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০২০)

১২ মুনতাসীর মামুন (সম্পাদিত), বঙ্গবন্ধু কোষ (বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ঢাকা, জুন ২০১২)

১৩ মোনায়েম সরকার (সম্পাদিত), ‘দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে (১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি জাতীয় সংসদে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ)’ বাঙালির কণ্ঠ, (আগামী প্রকাশনী, ২০১১)

১৪ মো. শাহ আলমগীর (সম্পাদিত), সংবাদপত্রে বঙ্গবন্ধু, (দ্বিতীয় খÐ, ষাটের দশক, প্রথম পর্ব), (বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট, ২০১৫)

১৫ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ভারতবর্ষীয় দার্শনিক সংঘের সভাপতির অভিভাষণ’ রায়হান রাইন (সম্পাদিত), বাংলার ধর্ম ও দর্শন, (সংবেদ প্রকাশনা- ২০, ঢাকা, ২০০৯)

১৬ শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী (দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা ২০১২)

১৭ শেখ মুজিবুর রহমান, আমার দেখা নয়াচীন, (বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০২০)

১৮ শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা (বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১৭)

১৯ শামসুজ্জামান খান (সম্পাদিত),বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ: বহমাত্রিক বিশ্লেষণ, (বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১৬)

২০ শামসুর রাহমান, ‘আসাদের শার্ট’, শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা (সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ১৯৯৯)

২১ সরদার ফজলুল করিম (অনুদিত) দি কনফেশানস: আমি রুশো বলছি, (আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১২)

২২ সৈয়দ শামসুল হক, শ্রেষ্ঠ কিশোর কবিতা, (শোভা প্রকাশ, ঢাকা, ২০২০)

২৩ হারুন-অর-রশিদ, বাংলাদেশ: রাজনীতি সনকার ও শাসনতান্ত্রিক উন্নয় ১৭৫৭ - ২০০০ (নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ২০০১)

২৪ Avicenna. (n.d.). In Wikipedia. Retrieved April 19, 2021, from https://en.wikipedia.org/wiki/Avicenna

২৫ Baburnama. (n.d.). In Wikipedia. Retrieved April 19, 2021, from https://en.wikipedia.org/wiki/Baburnama

২৬ Bangladesh Awami League. (n.d.). Bangabandhu's Speech on 10th January, 1972 [Video]. Youtube. https://www.youtube.com/watch?v=Qfc5l76i5f0

২৭ Dante Alighieri. (n.d.). In Wikipedia. Retrieved April 19, 2021, from https://en.wikipedia.org/wiki/Dante_Alighieri

২৮ Jakob F. Field (Edited), We Shall Fight on the Beaches: Speeches That Inspired History, (Machael O’Mara Books Limited, London, 2013)

২৯ Mohandas Karamchand Gandhi, The Story of My Experiments with Truth,(Beacon Press, USA 1993)

৩০ Muhammad Samad, ‘The Historic 7th March Speech of the Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman: Today’s Bangladesh’, Key-Note Speech, 8 March 2021, Organized by Embassy of Bangladesh, Jakarta, Indonesia.

৩১ United Nations Educational, Scientific and Cultural Organization, Memory of the World (2017). The Historic 7th March Speech of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman. Retrieved from:

http://www.unesco.org/new/en/communication-and-information/memory-of-the-world/register/full-list-of-registered-heritage/registered-heritage-page-4/the-historic-7th-march-speech-of-bangabandhu-sheikh-mujibur-rahman/

৩২ Winston Churchill as a writer. (n.d.). In Wikipedia. Retrieved April 19, 2021, fromhttps://en.wikipedia.org/wiki/Winston_Churchill_as_a_writer#:~:text=In%201953%20Churchill%20was%20awarded,his%20main%20source%20of%20income


বিবার্তা/আশিক
সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com