ইসকন মন্দিরে করোনা: সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দেয়ার চেষ্টা নিন্দনীয়
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২০, ২২:৪৩
ইসকন মন্দিরে করোনা: সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দেয়ার চেষ্টা নিন্দনীয়
মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান
প্রিন্ট অ-অ+

স্বামীবাগের ইসকন মন্দিরে ৩৬ জন করোনা আক্রান্ত। এ খবরে আনন্দ প্রকাশের কিছু নেই। যে কোনো মানুষের দুরবস্থার কথা শুনে আনন্দ প্রকাশ না করে দুঃখ প্রকাশ করাই ইসলামের শিক্ষা। চাই আক্রান্ত ব্যক্তি মুসলিম হোক চাই হিন্দু বা অন্য যে কোনো ধর্মের অনুসারী হোক। অন্যের ব্যথায় সমব্যথী ও সহমর্মী হবার শিক্ষা দেয় ইসলাম। রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না যাবত না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে অন্যের জন্যও তা পছন্দ করে। [মুসনাদু আহমাদ] এখানে মুসলিম অমুসলিমের মাঝে কোনো পার্থক্য করা হয়নি।


সদাচারের বিধান সবার জন্যই। সব মানুষের কল্যাণ চিন্তার কথাই বলে ইসলাম। প্রিয় নবীজীর অসংখ্য ঘটনা রয়েছে এ বিষয়ে। আছে সাহাবিদের আদর্শ। রাসূল সা. বলেন, তুমি অন্যের কষ্ট দেখে আনন্দ প্রকাশ করো না, তাহলে আল্লাহ তাকে মুক্ত করে তোমাকে তাতে আক্রান্ত করবেন। [তিরমিযি ওয়াসিলা ইবনুল আসকা থেকে বর্ণিত]


এর আগে চীনে যখন প্রথম করোনাভাইরাস ছড়ায় তখন আমাদের অনেক মুসলিম ভাই আনন্দ প্রকাশ করেছে। এরপর ভারতে করোনার কারণেও আনন্দে আত্মহারা হয়েছে অনেক অবুঝ মুসলিম। তিরমিযির হাদীসের ভাষ্য অনুসারে দেখতে পাচ্ছি আমাদের এমন অমানবিক মানসিকতার কারণেই আজ আমরাও করোনার শিকার। এ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। কারো বিপদেই আনন্দিত হওয়া ঠিক নয়।


প্রতিটি মুসলিম একেকজন ইসলামের একেকজন প্রচারক। একজন প্রচারকের আচরণ কখনও এমন হয় না। আপনি যদি আপনার ধর্ম ও আদর্শ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চান তাহলে অবশ্যই আপনাকে মানুষের মন জয় করতে হবে। ঘৃণা দিয়ে কখনও মানুষের মন জয় করা যায় না। প্রেম ভালোবাসার দ্বারাই পৃথিবীতে প্রতিটি ধর্ম প্রসার পেয়েছে। ইসলামও ব্যতিক্রম নয়। রাসূল সা. অমুসলিমদের যেভাবে ভালো বেসেছেন পৃথিবীতে তার কোনো নজীর হয় না।


রহমতের নবী যখন তায়েফে নিপীড়িত হন সে ঘটনা সবাই জানেন। আকাশ থেকে ফেরেশতা এসে তায়েফবাসীকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল। রাসূল সা. তাদের ধ্বংস করতে নিষেধ করেন। তাদের হেদায়াতের জন্য দুআ করেন। [ইবন হিশাম]


যেই কাফেররা তার দাঁত মুবারক শহীদ করেছিল তাদের জন্যও তিনি দুআ করেন। হে আল্লাহ তুমি আমার কওমকে ক্ষমা করে দাও, তারা তো জানে না তারা তো আমাকে চিনে না। চরম শত্রুর সাথে যে মহানুভবতা নবীজী দেখিয়েছেন ইতিহাসে তা চির ভাস্বর হয়ে থাকবে। রাসূল সা.-এর পরে তার প্রিয় সাহাবিরাও এ আদর্শের অনুসরণ করেছেন। [সিরাতে হালবিয়্যাহ]


স্বামীবাগের ইসকন মন্দিরে কয়েকদিন আগে বেশ কজন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। দুঃখজনক হচ্ছে কিছু তথাকথিত আলেমও এতে আনন্দিত হয়েছেন। আমি জানি না, এরা কেমন ধরনের আলেম? কি ধরনের শিক্ষা তাদের উস্তাদরা তাদের দিয়েছে? ইসলামের সাধারণ শিক্ষা থেকে তারা অনেক দূরে। বোঝা যায় আমাদের দেশে ইসলাম ধর্মের নামে যেসব শিক্ষা দেয়া হচ্ছে তাতে গোড়ায় গলদ রয়েছে। কুরআন হাদীসের সঠিক শিক্ষা অনেকেই পাচ্ছে না।


মসজিদগুলিতে সীমিত মুসল্লি নামাজ পড়ছে। সরকারি নির্দেশনার কারণে মসজিদ উন্মুক্ত করা যাচ্ছে না। সরকার এ নির্দেশনা ইসলামের সাথে শত্রুতা করে দেয়নি। মহামারী থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করতেই ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সারা বিশ্বের দুএকটি দেশ ছাড়া এ রমজানে সারা বিশ্বেই মসজিদ বন্ধ বা সংরক্ষিত। অকারণ আমাদের সমাজে সরকারের প্রতি মানুষকে বিরূপ করার পায়তারা করছে একটি কুচক্রি মহল। তারা প্রচার করছে যে মসজিদ বন্ধ করছে অথচ মন্দির খোলা।


মন্দিরের বিষয়টি স্পষ্ট করি। মসজিদের মত স্বামীবাগের মন্দিরে পাঁচ ওয়াক্ত পূজা দিতে পূজারিরা ভিড় করে না। মন্দির বললেই আমাদের দেশের সাধারণ মসজিদের মত চিত্র ফুটে ওঠে। কখনও তো আমাদের মন্দিরে যাওয়া হয় না, এজন্য সেখানের মানুষের সুখ দুঃখ সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়ে ওঠেনি আমাদের। তাই যারা এখন আবোল তাবোল বকছেন তাদের ক্ষমা করা যায়। মূলত বড় বড় মন্দিরগুলিতে কেবল পূজা আর্চনাই হয় না। সেখানে ধর্মগুরুরা মুসলমানদের মাদরাসার মত ধর্ম শিক্ষাও দেয়। দরিদ্র দুস্থ এতিম গরিবও সেখানে সারা বছর অবস্থান করে। আমাদের ঢাকা শহরের প্রায় প্রতিটি মাদরাসায় এই দুর্যোগের ভেতরও কিছু ছাত্র অবস্থান করছে। দারুল উলুম দেওবন্দে মাদরাসা বন্ধ হবার পরও দুহাজারের উপর ছাত্র অবস্থান করছে। মনে করুন স্বামীবাগ মন্দিরেও এমন ঘটনাই ঘটেছে। লকডাউনের পর সেখানে বাইরে থেকে কেউ যায়নি। সেখানে অবস্থান করা ছিন্নমূল মানুষগুলো আক্রান্ত হয়েছে করোনা ভাইরাসে। কয়েকজন পুরোহিত যারা সবসময় সেখানে অবস্থান করে তারাও আক্রান্ত হয়েছেন। যে খানে যুদ্ধের সময়েও এসমস্ত পুরোহিত পূজারিদের আক্রমণ করার নিষেধাজ্ঞা আছে। আর সেখানে এমন দুর্যোগের সময়ও আমাদের তথাকথিত ইসলামিক স্কলাররা হিন্দু বলে আক্রান্ত লোকগুলিকে ক্ষমা করতে পারলেন না। তাদের বিরুদ্ধে ঘটনাটিকে নিয়ে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে উস্কে দেয়ার চেষ্টা করছে। এসময় উচিত ছিল তাদের সেবায় এগিয়ে যাওয়া। তা না করে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে। পরিবেশন করা হচ্ছে মিথ্যা সংবাদ।


ভারতের মুসলিমদের কাছ থেকে শিক্ষা নিন। নিজামুদ্দিন মার্কাজের বিরুদ্ধে হিন্দুরা চরম বিদ্বেষ ছড়িয়েছিল। মুসলমানরা এর বদলা দিয়েছে এভাবে যে, নিজামুদ্দিনের তাবলিগের সাথীরাই এখন হিন্দুদের জন্য প্লাজমা দিয়ে সহায়তা করছে। ইটের জবাবে পাথর নয় বরং কাঁটার জবাব ফুল দিয়ে দেয়া শিখুন। ইসকন বিভিন্ন সময় নানান কাজে সমালোচিত হয়েছে। তার কারণে এই দুর্যোগের সময়ে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সৃষ্টি করা কোনো সুস্থ মানুষের কাজ হতে পারে না।


ইসলামের নাম দিয়ে যারা এধরনের কাজ করছেন তাদের কাছে অনুরোধ করবো দয়া করে ক্ষান্ত হোন। আমাদের প্রিয় ধর্ম ইসলামকে আর খাটো করবেন না। এই রমজানের পবিত্র সময়ে মন পবিত্র করুন। ইসলামের সঠিক শিক্ষাটা ছড়িয়ে দিন জনে জনে। প্রাণে প্রাণে ছড়িয়ে পড়ুক ভালোবাসা। সৌহার্দ ও সম্প্রীতির এক বাংলাদেশ হোক করোনামুক্ত পৃথিবীতে। আল্লাহ সবাইকে সুমতি দিন। মানুষে মানুষে বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো থেকে রক্ষা করুন। আমীন।


লেখক: মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিআ ইকরা বাংলাদেশ


বিবার্তা/জাহিদ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com