'নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে যুগপৎভাবে আইন ও জনসচেতনতা জরুরি'
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২২, ০৮:২১
'নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে যুগপৎভাবে আইন ও জনসচেতনতা জরুরি'
সাইদুল কাদের
প্রিন্ট অ-অ+

ইউনাইটেড ন্যাশন পপুলেশন ফান্ডের একটি জরিপ অনুযায়ী নারীর প্রতি তার পুরুষ সঙ্গীর শারীরিক নির্যাতনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। এমনকি দেশের শতকরা চৌদ্দ শতাংশ গর্ভকালীন মৃত্যু হয় নির্যাতনের কারণে। এছাড়াও শতকরা একষট্টি শতাংশ পুরুষ মনে করে থাকেন যে, পুরুষ হওয়ার কারণে তিনি চাইলেই নারী সঙ্গীর উপর শারীরিক যে কোনো ধরনের নির্যাতন করতে পারেন।


বিশ্বে বেশিরভাগ জায়গায় আজও নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ করা হয় না, কেননা মনে করা হয় এতে নারীদের সম্মানহানি হবে। আবার যখন ব্যাপারটা আসে ঘরোয়া সহিংসতার বিষয়ে, তখন অনেক নারী এখনো মনেই করে থাকেন যে ঘরের পুরুষটির অধিকার রয়েছে তার প্রতি সহিংস আচরণ করার।



যুগ যুগ ধরে এইসব কিছুই হচ্ছে শুধুমাত্র সচেতনতার অভাবে। নারীরা নিজেরাও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। অনেক নারী সমাজ এবং লোক লজ্জার ভয়ে তার প্রতি সহিংস আচরণের কোনো ধরনের প্রতিবাদ না করেই নীরবে সহ্য করে থাকে। এমনকি নারীর প্রতি সহিংস আচরণের যে প্রতিকার পাওয়া যায় এটাই অনেকে জানেন না, এই অত্যাচার যেন অবধারিত নিয়তি মেনে নিয়েই চলছে লাখো নারীর জীবন।



আজ ২৫ নভেম্বর, শুক্রবার বিশ্ব নারী সহিংসতা প্রতিরোধ দিবস। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইনের শাসনের পাশাপাশি মানুষের মনোজগতের পরিবর্তন ও জনসচেতনতা তৈরি করা দরকার বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপার্সন ড. সাদেকা হালিম এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন।



আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক সচতনতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।



২০০০ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষধ কর্তৃক দিবসকে (২৫ নভেম্বর) অফিশিয়াল স্বীকৃতি দেয়। ফলস্বরূপ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পাশাপাশি এনজিওগুলোও নারী সহিংসতা রোধের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির একটি অফিশিয়াল মাধ্যম হিসেবে এই দিবসটিকে ঘিরে নানা কর্মসূচি পালন করা শুরু করে দেয়। জাতিসংঘ দ্বারা প্রবর্তিত এই দিবসের মূল লক্ষ্য হল নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করা। জাতীয়, সামাজিক ও পারিবারিকভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে প্রয়োজন আমাদের সবার সচেতনতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।


নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ যেমন একটি সময়ের দাবি, ঠিক তেমনই এই দাবি উঠে আসার পেছনেও রয়েছে হাজারো, লাখো কিংবা তারো বেশি সহিংসতার ঘটনা। যুগে যুগে বিভিন্ন সময়ে নারীর প্রতি যে সহিংস আচরণ এবং ঘটনা ঘটে এসেছে সেগুলোর সমাপ্তি যেন আজ বহুল প্রত্যাশিত একটি বিষয়।


বাংলাদেশ সরকার থেকেও নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। বর্তমানে ১০৯ নম্বর হল বাংলাদেশ সরকারের জরুরি হেলপ লাইন। একজন নারী যদি কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হন তাহলে তিনি এই নম্বরে এর প্রতিকার চাইতে পারেন।



ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপার্সন ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন ড. সাদেকা হালিম বিবার্তাকে বলেন, 'আন্তর্জাতিকভাবে নারী সহিংসতা প্রতিরোধ দিবসের সাধারণত সাবজেক্টিভ ও অবজেক্টিভ দুটি দিক রয়েছে। এই সহিংসতাকে ঘিরে জাতিসংগ কর্তৃক এই দিবসটি স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশেও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি হতে দেখেছি। এর পূর্বেও 'জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-৯৭' প্রণীত আমরা পড়েছি। এর উপর ভিত্তি করে এই সমস্যাকে কেন্দ্র করে এদেশে আইনগত ও কাঠামোগত অনেকগুলো পরিবর্তন এসেছে। দেখা যাচ্ছে নির্যাতন দমন আইনে পরিবর্তন, ধর্ষণ আইনেও মৃত্যুদণ্ড,দেয়ার নীতিগত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে যা এখনও অফিসিয়ালি পাস করা হয়নি। পাশাপাশি নারী সহিংসতা প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সচেতনতামূলক কর্মসূচি করে চলছে। সহিংসতা শুধু যে সেক্সুয়াললি হয় তা নয়। এখানে নারীকে পিছিয়ে রাখার কৌশলগত রাজনীতি হতে পারে, উন্নতি ও নারীর অগ্রগতির পথ বন্ধ হয়ে যাওয়াও একইভাবে নারী সহিংসতা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের শুধু মূল ধারার নারীরা নয় একইসাথে প্রান্তিক নারী, আদিবাসী নারী ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী নারীরাও এই সহিংসতার অবজেক্টিভ দিকের সাথে সম্পৃক্ত।'


তিনি বলেন, 'এই সহিংসতা প্রতিরোধে সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে এতে কোনো ঘাটতি দেখি না৷ তবে পদক্ষেপগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেকধরণের প্রভাবান্বিত হয়ে থাকে। যখন কোনো নারী সহিংসতার স্বীকার হয় তখন তারা আইনের দ্বারস্থ হয়। বিশেষকরে ধর্ষণের ক্ষত্রে মাত্র ৩ শতাংশ নারী মুটামুটি বিচার পায়। তাছাড়া যেসব নারীরা ধর্ষণের স্বীকার হচ্ছে তারা এতটাই পাওয়ারলেস যে ধর্ষকের সাথে ফাইট করে বিচার পাওয়াটা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। আবার কোনো উচ্চবিত্ত নারী যদি সহিংসতার স্বীকার হয় তারা পারিবারিক ইমেজ রক্ষার্থে প্রকাশ করতে চায় না। প্রান্তিক নারীদের জীবনযাপন, পথেঘাটে রাত কাটিয়ে অনেক নারীকেও এদেশে জীবনযাপন করতে হয় তারা নানাভাবে সহিংসতার স্বীকার হচ্ছে। এসব সহিংসতা চেপে যাওয়ার মূলে রয়েছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। এক্ষেত্রে পারিবারিক ইমেজ রক্ষার্থে এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার চাপে যে সহিংসতাগুলো প্রকাশ করতে পারি না এই জায়গাগুলোতে আমরা পিছিয়ে পড়ি।'


তিনি আরও বলেন, 'রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে এবং বন্ধুত্বের খাতিরে এদেশে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্র ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রভাবশালীদের দ্বারা নারীরা যৌন নির্যাতনের স্বীকার হয়। ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার এদেশে ধর্ষণের জন্য খুব সুন্দর একটি আইন প্রণয়ন করেছেন। কিন্তু এটির প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে ধীরগতি রয়েছে তার জন্য একবছর ধরে আলোচনা হচ্ছে তাও তার কোনো আলোর মুখ দেখছি না। প্রধানমন্ত্রী নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করেন দেখেই এইধরণের যুগান্তকারী আইনগুলো এসেছে। এবিষয়ে তাঁর সক্রিয় দিকনির্দেশনা রয়েছে৷ কিন্তু তাঁর নির্দেশনা আমরা কতটুকু মানছি বা অবহেলা করছি তার কোনো সুষ্ঠু মনিটরিং হয় না।'


এক্ষেত্রে নারী সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু সচেতনতা দিলেই চলবে তা নয় আইন প্রণয়ন এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নারীরা কেমন অগ্রাধিকার পাচ্ছে এটির মনিটরিং করারও প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন তিনি।



গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন বিবার্তাকে বলেন, 'নারী সহিংসতা প্রতিরোধে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত সচেতনতামূলক কর্মসূচি এদেশে প্রভাব পড়েছে। তবে এর একদিকে যেমন ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে অন্যদিকে নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। ইতিবাচক দিক থেকে গত বাইশ বছরে এদেশে অনেক বেশি কর্মক্ষেত্র এসেছে, রাজনীতিতে নারীদের অবস্থান বেড়েছে কিন্তু সেটি যথেষ্ট না। এখন পর্যন্ত সহিংসতার যে জায়গাটা এটি খুব খারাপভাবে পরিলক্ষিত হয় এদেশে। একদিকে আমরা দেখি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে, নারীর কর্মক্ষেত্র বেড়েছে সেইসাথে সহিংসতাও প্রচণ্ডমাত্রায় রয়েছে। বরঞ্চ আগে যেখানে ঘরোয়া সহিংসতার স্বীকার হতো এখন সেটি ঘরের বাইরেও ঘটছে প্রতিনিয়ত। গত ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল প্রর্যন্ত একটি জরিপে দেখা যায় গণমাধ্যমে যতগুলো খবর এসেছে তন্মধ্যে সবচেয়ে বেশি খবর এসেছে নারী সহিংসতাকে কেন্দ্র করে। ফলে এই নারী সহিংসতা সময়ের সাথে বিরাট আকার ধারণ করেছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র আইন করেও সেটির সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে পারেনি।'


তিনি আরও বলেন, 'বর্তমানে একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায় যে, পূর্বে নারীরা সহিংসতার বিষয়টি পারিবারিক লজ্জা, সামাজিক লজ্জার ভয়ে লুকিয়ে রাখার বিষয়টি এখন প্রতিবাদ রূপে পরিবর্তন এসেছে। অধিকাংশ নারীরা এখন বিচার চায়। কিন্তু আমাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্য যথাযথ কার্যকর না করার কারণে এই অপকর্মগুলো রয়ে গেছে এবং ক্ষেত্র বিশেষে নারী সহিংসতা বেড়ে গিয়েছে। এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদেরকে নিয়ে অনেকধরণের বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা হয়, ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে নারীদেরকে হেয় করে অনেকধরণের প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয় এবং অপরাধমূলক সাইবার বোলিং করা হয়ে থাকে নারীকে ব্যবহার হরে। যার কারণে নানাক্ষেত্রে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে সুইসাইড করতে দেখি নারীকে।'


এদেশে নারী সহিংসতাকে কেন্দ্র করে ভালো ভালো আইন রয়েছে। কিন্তু সেগুলোকে যথাযথ কার্যকর হচ্ছে না৷ তাহলে আইনের পাশাপাশি যদি মানসজগতকে পরিবর্তন করা না যায় এবং সামাজিক সচেতনতা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন না আসে শুধু আইন দিয়ে সহিংসতা প্রতিরোধ করা যাবে না। আইনের শাসনও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পাশাপাশি মানুষের মনোজগতেরও পরিবর্তন করতে হবে। তাহলেই সার্বিককভাবে নারী সহিংসতা প্রতিরোধ সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।


বিবার্তা/সাইদুল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com