‘বিশ্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে পদ্মা সেতু’
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২২, ২২:১৯
‘বিশ্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে পদ্মা সেতু’
এস এম রিয়াদ রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

বহুল কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়, দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের সঙ্গে শরীয়তপুর ও মাদারীপুরকে যুক্ত করেছে। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি সংযোগ স্থাপন হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পদ্মা সেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রমাণ হয়েছে। সারা বিশ্বে এটি বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করবে।


দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের রাজধানীতে আসতে পদ্মায় জলযানের ভোগান্তি ছিল। আপদকালীন পরিস্থিতে সময়মতো ফেরিতে উঠতে না পারায় বহু জান-মালের ক্ষতি হয়েছে। এ সেতুর মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ সমস্যার সমাধান হতে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেতুকে কেন্দ্র করে সেতুর দুই পাড়ে প্রায় ২৯ শতাংশ নির্মাণ কাজ, সাড়ে ৯ শতাংশ কৃষি কাজের প্রবৃদ্ধি, ৮ শতাংশ উৎপাদন ও পরিবহন খাতের কাজ বাড়বে। যার ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি লোকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। পদ্মার ওপারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দরিদ্রতার হার প্রায় ১ শতাংশের বেশি কমবে। স্বাভাবিকভাবে ওই অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার কমলে এর প্রভাব পড়বে সারা দেশে। পরিসংখ্যান মতে, যাতে জাতীয়ভাবে দারিদ্র্যের হার শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমবে।



বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বিবার্তাকে বলেন, এটা তো আমরা জানি, পদ্মা সেতু নিয়ে বিদেশিরা আমাদেরকে যথেষ্ট বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত দৃঢ়চেতা মনোভাবের কারণে তারা জাতিকে কলঙ্কিত করতে পারে নাই। অত্যন্ত আনন্দের ব্যাপার যে আমরা পরিশেষে পদ্মার বুকে সেতু নির্মাণ করতে পেরেছি। এখান থেকে আমরা যে সুবিধাগুলো আশা করেছি, যে সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাশা করেছি- সেই সুবিধাগুলো যেন আমরা পাই। আমরা যাতে ভুলে না যাই। বঙ্গবন্ধু সেতু যখন হয়েছিল, তখন আমাদের প্রত্যাশা কী ছিল। আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী জাতি উপকৃত হচ্ছে কিনা।


তিনি আরও বলেন, আমি আশা করি পদ্মা সেতুর ওপর আমাদের যে প্রত্যাশা, সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী জাতি সুযোগ-সুবিধা পাবে। উন্নতির পথে ধাবিত হবে, অগ্রগতির পথে ধাবিত হবে। এটা আমাদের অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। জাতি হিসেবে আমরা এই ধরনের বড় একটা অবকাঠামো নির্মাণ করতে পেরেছি নিজস্ব অর্থায়নে। এটা বিশ্বের মানচিত্রে আমাদের অনেক উপরে তুলেছে।


পদ্মা সেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ আত্মসম্মানবোধ ফিরে পেয়েছে বলে মনে করেন ড. কায়কোবাদ। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বিশ্বে আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন জাতি হিসেবে আর্ভিভূত এবং অগ্রগতির দিকে ধাবিত হতে যাচ্ছি আমরা। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যাতে মনে না করি সেতুটা উদ্বোধন করলাম আর আমাদের সমস্ত কিছু হয়ে গেল, তা নয়। এই সেতুটাকে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা দায়িত্ব আমাদের। সেতুটা যাতে দীর্ঘদিন চলে এবং আমাদের দেশকে সেবা দিতে পারে। কাঙ্খিত প্রত্যাশা অনুযায়ী যে সুযোগ-সুবিধা গোটা জাতি পেতে পারে। আর সেসব সুযোগ-সুবিধা পেতে যা যা করা দরকার তা যেন আমরা করতে পারি। এখানে অনেক পরিকল্পনা আছে সেতুতে রেলপথ চলার ব্যবস্থা রয়েছে।


বাংলাদেশ বড় একটা অবকাঠামো তৈরি করতে পারে, পদ্মা সেতু করে তা বিশ্বকে বাংলাদেশ জানিয়ে দিয়েছেন বলে তিনি বলেন, যেখানে বিদেশি দাতা সংগঠনগুলো বৈরী আচরণ করার পরেও আমরা পদ্মা সেতু করতে পেরেছি। এখন এর পূর্ণ সদব্যবহার নিশ্চিত করতে করতে হবে, যাতে দেশের সাধারণ মানুষ এটা থেকে উপকৃত হয়।



ব্র্যাকের অভিবাসন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বিবার্তাকে বলেন, পদ্মা বহুমূখী সেতু তৈরি করা আমাদের বাংলাদেশ সরকারের সক্ষমতার পরিচয়। আজকে ২০২২ সালে অনেকেই হয়তো সেটা বুঝতে পারবে না। কিন্তু যখন বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়, তখন সবাই একে একে সেটা থেকে সরে এসেছিল। সবাই সেটাকে নেতিবাচক হিসেবে নিচ্ছিল। সেই সময় বাংলাদেশ সরকার বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এই সাহসী পদক্ষেটা নিলেন যে, দেশের অর্থেই এটা করা সম্ভব। এতে দেশের অনেক অর্থনীতিবিদের বিরোধিতা সত্যেও এটা একটা বিরাট সিদ্ধান্ত ছিল। ওই সময় সিদ্ধান্তটা কত জরুরি ছিল এটা এখন সবাই দেখছে।


তিনি আরও বলেন, এই সেতু কেবল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করবে তা না। আমি মনে করি, পদ্মা সেতু পুরো দেশের সঙ্গে এই অঞ্চলকে যুক্ত করবে। এখানকার পর্যটন, সমাজ, অর্থনীতি এমনকি এখানকার রাজনীতি সবকিছুতেই খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কোনো কোনো সময় কোনো ঘটনা পুরো একটা জাতিকে তার সক্ষমতা বা শক্তির পরিচয় দেয় এবং পদ্মা সেতু তেমনই আমাদের পুরো জাতির শক্তি, দেশের শক্তি বলে মনে করেন শরিফুল হাসান।


তিনি বলেন, পদ্মা সেতু নিয়ে যদি কেউ বিরোধিতা করে বা নানান কথা বলে- আমি মনে করি, এটা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে করে। এবং তারাও একটা সময় এটা বুঝতে পারবে, এই সেতুটা আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সামনে আট-দশদিন পরে মুসলমানদের উৎসব ঈদ। আর ঈদের সময় মানুষের দূর্ভোগ-হাহাকার লেগেই থাকে। ঈদে দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখী মানুষের চিন্তা থাকে, ঘাটে ফেরি থাকবে কি না? এসব হয়রানি থেকে মানুষ যে সুবিধাটা পেল তা অত্যন্ত আনন্দের। দক্ষিণাঞ্চলের লোকজন শত বছরের দুঃখ-কষ্ট, ভয়-অতঙ্ক ছিল পদ্মা নদী। এই শত বছরের দুঃখের অবসান হবে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটা নতুন দিগন্তের সূচনা হলো। এটা জাতি হিসেবে সবাই আমরা এর অংশীদার হব।


শরিফুল হাসান আরও বলেন, আমি মনে করি বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক ধরনের একক শক্তি বা সাহসী সিদ্ধান্তের প্রতীক পদ্মা সেতু। সেটার সাথে আমি আরও যুক্ত করতে চাই, অনেক সময় আমরা সবাই মিলে যেটা ভাবতে পারি না বা চিন্তাও করতে পারি না, কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরা ইচ্ছা করলে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছু করতে পারেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদ্মা সেতু তৈরি তেমনি একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


এটা বাংলাদেশের মানুষের আনন্দের সেতু, সক্ষমতার সেতু, গৌরবের সেতু এবং এটা বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করবে সারা পৃথিবীতে, এমনটাই মনে করেন শরিফুল হাসান।


বিবার্তা/রিয়াদ/রোমেল/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com