বাইশশত পঞ্চাশ (পর্ব ২)
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২২, ১১:৩৮
বাইশশত পঞ্চাশ (পর্ব ২)
সঙ্গীতা ইয়াসমিন
প্রিন্ট অ-অ+

মর্তুজা হোসেনের মেজাজ যেন শ্রাবণের আকাশ। এই রোদ, এই বৃষ্টি, তো এই ঘন কালো মেঘ। কখন গর্জন দেবেন আর কখন প্রশংসার বন্যায় ভাসাবেন স্বয়ং দেবতাও জানেন না। তবে, একটা কাজ তিনি সচেতনভাবেই করতেন। নানা ছুতোনাতায় মনে করিয়ে দিতেন যে অনেকটা দয়াপরবশ হয়েই কাজটি তিনি দিয়েছেন মিথিলাকে। এই চরম সত্যটি মিতি যাতে না ভুলে যায় কখনও।


ইতোমধ্যে মাস দুয়েকের বেশি পার করে ফেলেছে মিতি এই প্রতিষ্ঠানে। দাপ্তরিক নিয়ম কানুন সব রপ্ত করে ফেলেছে। প্রকৃত অর্থে এই অফিসে দুই বসের দুই রীতি; একজন বলেন দিন তো আরেকজন বলেন রাত, একজন ডানে বললে আরেকজন বামে বলবেন অবধারিতভাবে। মালিক-মালকিনীর দ্বিজাতি তত্ত্বের গ্যাঁড়াকলে পড়ে মিতি ইউনিভার্সাল ট্রুথের মত সেই থাম রুল পাল্টে ফেলেছে- ‘বস নয়, বসিনি ইজ অলয়েজ রাইট। ইফ বসিনি ইজ রঙ রিমেম্বার দেয়ার ইজ নো আদার বস।”



শুধু তর্জন গর্জনই নয় মাঝেসাঝে মিথিলার পিঠ চাপড়ে কাজ করিয়ে নেবার নানাবিধ টোপও থাকে মুখের সামনে। বিশেষত ভালো চাকরির লোভ। যদিও মিতি ওসবে এখন আর কান পাতে না। ম্যডাম তো আরেক কাঠি সরেস। ক্লায়েন্ট মিটিংয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় ভাসিয়ে দেন। তার ওপরে মাস গেলে কড়কড়ে পনেরশত টাকা, চাট্টেখানি কথা নয়! সুতরাং মিতি সারাক্ষণ নাক ডুবিয়ে কাজ করে।



এতসব প্রশংসার মাঝে যে দেয়ালটি সুউচ্চ পাহাড়ের মত স্থানু হয়ে শ্রেণীবিভাজনের সীমারেখা স্পষ্ট করে সুতীক্ষ্ম আঙ্গিকে তাকে সামন্তপ্রভূর আধুনিক সংস্করণ বললে অত্যুক্তি হয় না। কিছু উদাহরণ দিলে সেটা বুঝতে সুবিধে হবে। যেমন, অফিসে মিথিলার জন্য নির্ধারিত কোনো ডেস্ক ছিল না। কম্পিউটার প্রশিক্ষণের কথা থাকলেও উচ্চবংশীয় দ্রব্য বিধায় উহা মিতির স্পর্শের অনুমতি ছিল না। গৃহপরিচারিকাদের জন্য বরাদ্দ জায়গায় মিতি লাঞ্চ করত এবং তাদের টয়লেটই মিথিলার ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ ছিল।


দু’এক জায়গায় চাকরির ইন্টারভিউ দিলেও তেমন কোন সাড়া মেলেনি। ইতোমধ্যে মাস্টার্সের রেজাল্ট বেরিয়েছে। সার্টিফিকেট তুলতে রাজশাহী যেতে হবে। দিন তিনেকের ছুটি দরকার। বসের কাছে বলতেই অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বললেন, তিন মাস চাকরি করেই তিনদিন ছুটি? তোমার প্রবেশন পিরিয়ড ছয় মাস, সুতরাং পলিসি মোতাবেক নো ছুটি। আরো তিনমাস অপেক্ষা করতে হবে। মিথিলার মন খুব খারাপ হল। পরের দিন অফিসে এসে বিনা বেতনে তিনদিনের ছুটির আবেদন করতেই ছুটি মঞ্জুর হয়ে গেল। এবার পলিসির মাজেজা সুস্পষ্ট হল মিতির কাছে।


আজ বৃষ্টির প্রচণ্ডপ্রতাপ মর্তুজা সাহেবের মেজাজ শীতল না করে বরং বিগড়েই দিয়েছে খানিকটা বেশি। সব শিডিউলই এলোমেলো। বাজারের ছেলেটি ফেরেনি, ড্রাইভার আসেইনি। ডি এফ পিতে মিটিং সকাল দশটায়, আর সে আটকে আছে ড্রাইভারের অভাবে, ইস্ত্রী করা যুতসই পোশাকের অভাবে। আগাগোড়া ছয়ফুট লম্বা তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে অস্থির পায়ে অফিসের বারান্দায় পায়চারি করছে।


ঠিক তখনই মিথিলা প্রায় কাকভেজা হয়ে অফিসের দরজায় পা রেখেছে। হাতের ছাতাটি বন্ধ করতে করতে ভেতরে যাবে সেই মুহূর্তে মর্তুজা সাহেব ডেকে বললেন, ওহ, তুমি এসে গেছ, তোমায় ঘরে ঢুকতে হবে না, এক কাজ কর- যাও তো রাস্তার ওপারের লন্ড্রির দোকানে গিয়ে আমার কাপড়গুলো নিয়ে এস। এই বলে একটি লন্ড্রীর রশিদ মিতির হাতে ধরিয়ে দিলেন। আবার সাবধান করে দিলেন দেখ, কাপড়গুলো ভিজিয়ে ফেল না যেন, তাড়াতাড়ি এস। আমাকে বেরুতে হবে। পূর্বাপর প্রফেশনাল আচরণগুলো ঠিকঠাক থাকলে এই অনুরোধের ঢেঁকিটাও গিলে ফেলতে পারত হয়তো সে। তবে আজ একটু অন্যরকম দিন।


রাজশাহী যাবার আগের মিথিলা আর আজকের মিথিলায় কোথায় যেন একটু ফারাক। সদ্য এম এ পাশ করা এক তরুণীটি মাথা না নোয়াবার যে প্রত্যয় বোধের আড়ালে লুকিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল এই ক’টা মাস, সেটি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। বসের দেওয়া রশিদটি হাতে নিয়ে সোজা অফিসের ভেতরে চলে গেল। ভেজা কাপড় বদলে নিয়ে নিজের যা কিছু ঘটি কম্বল সম্বল ছিল ব্যাগে ভরে নিল। একখানা ইস্তফা পত্র লিখে বারান্দায় দাঁড়ানো বসের হাতে দিয়ে হন হন করে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হল।


ব্যস! আর যায় কোথায়! মিথিলার এহেনো দুঃসাহস মর্তুজা হোসেনের পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব। তাঁর মেজাজ এবার সপ্তমে, চিৎকার করে বললেন- এত্ত বড় সাহস! আমার মুখের ওপরে ইস্তফা পত্র! কথা না বলে চলে যাচ্ছ? দাঁড়াও এখানে। রাস্তা থেকে তুলে এনে দয়া করে একদিন চাকরি দিয়েছিলাম। তার এই প্রতিদান!


স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে যার পর নেই চিৎকার করে স্ত্রীকে ডাকলেন। উত্তেজিত হলে স্ত্রীই তাঁর একমাত্র ভরসা। বিশাখা হোসেন সব শুনে বললেন, এত চেচামেচি করছ কেন? ওকে ভালোবেসে আমরা কাজ দিয়েছিলাম। ও যদি চলে যেতে চায় তো যাবে। এতে আমাদের কী বলার আছে? এই বলে তিনি দ্রুতই ভেতর ঘরে চলে গেলেন অন্য ঝামেলা সামলাতে। মিথিলা একইভাবে দাঁড়িয়ে খুব ক্ষীণ অথচ দৃঢ়স্বরে বসকে জিজ্ঞেস করল, আমার স্যালারিটা...? মানে গতকাল অব্দি হিসেব করলে পুরো দেড় মাসের বেতন বাকি...বাইশশত পঞ্চাশ টাকা।


এটা শোনার পরে মর্তুজা হোসেন অধিক ক্ষীপ্র কণ্ঠে বললেন, পরে ফোন কর, এখন আর কথা বলার মুড নেই। আসলে তোমাদের এই ফকিরনির জাতকে কখনওই বিশ্বাস করতে নেই। প্রশ্রয় দিলেই তোমরা মাথায় চড়। আজ যে খুব ডাট দেখিয়ে চাকরি ছাড়ছ, কাল কি আমার মত দয়া করে কেউ চাকরি দেবে? এই জগতটা এত সহজ নয় বুঝলে? এই ঢাকা শহরও অনেক রঙে ঢাকা। জীবনের কিছুই তো দেখনি এখনও।



দীর্ঘ জীবনের পথচলায় মিতি জেনেছে জীবন এত সহজ নয়; তবে সে এও জানে দরিদ্রতা নিরুপিত হয় প্রয়োজনের ভিত্তিতে নয়, সীমাহীন প্রাচুর্যের অন্তরালেই থাকে দরিদ্রতার মলিন ছাপ। বিত্ত-বৈভব ছিল না বলেই নিজেকে দরিদ্র বলতে নারাজ মিথিলা। জীবনে প্রয়োজন যাদের সীমিত তাঁদের অভাবও কম। বিশাল আকাশের নীচে একটা পেটের আহার যে কোনোভাবে জুটিয়ে নিতে পারবে মিথিলা সেই বিশ্বাস তার আছে।



মর্তুজা হোসেনের শেষ কথাগুলো কানের পর্দায় বাড়ি খেলেও গায়ে মাখাল না। মিতি জানে মানুষের হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো বৈভব নেই। হৃদয়ের ঐশ্বর্যে মিথিলা চিরকালের গরবিনী।তাই কিছু কথা সে ঐশ্বর্য্যের জৌলুসে অনায়াসেই চাপা পড়ে যায়।


দ্রুত পায়ে বের হয়ে যেতে যেতে ভেতর ঘর থেকে কান্নার মত গোঙানীর শব্দ পেল মিথিলা। কৌতূহলবশত কান উঁচিয়ে শুনতে পেল--ধম্মে সইবে না, এই অট্টালিকা একদিন ধইসে পড়বে।একদিন সব ধইসে পড়বে।


মিতির বুঝতে কষ্ট হল না সেটা হামিদার কণ্ঠস্বর। সেই মুহূর্তে হামিদাকে নিয়ে ভাববার কোনো ইচ্ছেই নেই তার। রাজশাহী থেকে ফিরে পকেট একেবারেই শূন্য। কাল বেতন পাওয়ার কথা ছিল। আজই চাকরিটা নাই হয়ে গেল। এখন কিছু একটা না জুটলে চলাটাই মুছিবত হয়ে যাবে। এসব ভাবতে ভাবতে গেটের বাইরে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল।


অনেক কান্নার পরে মানুষের বেদনা ভার যেমন লাঘব হয় তেমনি আকাশও এখন সোনারঙা সূর্যমুখে হাসছে ঝলমল করে। তপ্ত রোদে বিশাল আকাশের নীচে নিজের ছায়াটাকে অনেক দীর্ঘ মনে হল। চাকরি খোয়ানো, বসের অপমান, পাওনা টাকা ছেড়ে দিতে পারার আনন্দে নিজেকে অনেক দামী মনে হল। মনে হল মেরুদণ্ড সোজা করে হাঁটতে পারলে বাইশশত পঞ্চাশ এই জীবনে কেবল একটি ক্ষুদ্র সংখ্যা।


কতকটা স্বস্তি আর খানিক অনিশ্চয়তার মিশ্র অনুভব নিয়ে বাসার ফিরল মিতি। খানিক আগেই রিমি ফিরেছে আজ। দরোজা খুলতেই মিতির হাতে একটা চিঠি দিয়ে বলল, তোমার নিশ্চয়ই কোনো সুখবর আছে। শিগগিরই খোল। খুলে দেখল, একটি বিদেশী সংস্থার জব অফার। শিশু পল্লী প্লাস এ চাকরীর ইন্টারভিউ দিয়েছিল মাস খানেক আগে। ভাল বেতন, থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা ফ্রি। পরেরদিনই মিতি চলে গেল কর্মক্ষেত্রে যোগদান করতে।


দিন সাতেক পরে গাজীপুরে কর্মস্থলের স্টাফ কোয়ার্টারে সাপ্তাহিক ছুটির অলস দুপুরে শুয়ে শুয়ে পত্রিকা পড়ছিল মিথিলা। হঠাৎই একটা শিরোনামে চোখ আটকে গেল, “ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায় তরুণীর রহস্যজনক মৃত্যু”, ফাইল ছবিতে যে নিষ্পাপ মুখটি ভেসে উঠল সেটা দেখে মিথির বুকের ভেতরটা স্তব্ধতায় হীম হয়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল অনেক দিনের চেনা কিছু মুখ, কিছু স্মৃতি, গভীর কিছু ক্ষত নিয়ে থাকা ছবির অ্যালবাম।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com