বাঙালি জাগরণের মহাজাদুকর শেখ মুজিব (পর্ব ১২ ও ১৩)
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২২, ০৮:০৬
বাঙালি জাগরণের মহাজাদুকর শেখ মুজিব (পর্ব ১২ ও ১৩)
এফ এম শাহীন
প্রিন্ট অ-অ+

শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়েছিল ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় থেকে। ঐ বছর বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসেন তদানীন্তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং খাদ্যমন্ত্রী ও পরবর্তীকালে বাংলা ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী। গোপালগঞ্জে করা হয়েছে বিশাল জনসভার আয়োজন। এ নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিপুল আলোড়ন। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর ভার মিশন স্কুলের ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর।


সভা শেষে মিশন স্কুল দেখতে গেলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। বঙ্গবন্ধুসহ অন্যরা তাকে সংবর্ধনা দিলেন। ঐ সময় বিদ্যালয়ের ছাদ সংস্কারের দাবি নিয়ে একটি দল তাদের কাছে যায়। দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন হেঁটে লঞ্চের দিকে চলছিলেন, বঙ্গবন্ধুও ছিলেন তার পাশে। তখন কিছু কথা হয় তাদের মধ্যে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নোটবুকে বের করে বঙ্গবন্ধুর নাম-ঠিকানা লিখে নেন। কয়েক দিন পর পাঠান চিঠি। সেই চিঠিতে বঙ্গবন্ধুকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি কলকাতায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন সোহরাওয়ার্দী।


১৯৩৯ সাল। কলকাতা বেড়াতে যান শেখ মুজিবুর রহমান। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখে করে বললেন, গোপালগঞ্জে মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগ গঠন করবেন। তাঁর নেতৃত্বেই গড়ে উঠল গোপালগঞ্জের ছাত্রলীগ। সভাপতি হলেন খন্দকার শামসুদ্দীন। বঙ্গবন্ধু হলেন সম্পাদক। এভাবেই ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। গোপালগঞ্জে তখন তার নামেই মুসলিম লীগ চলত।


একই বছর তিনি গোপালগঞ্জ মহকুমা মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি এবং মহকুমা মুসলিম লীগের ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। এ সময়ে তিনি এক বছর মেয়াদের জন্য নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের কাউন্সিলর জন্য নির্বাচিত হন। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের পর মুসলিম লীগ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য মাঠে নেমে পড়ে। মুসলিম লীগের তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিব এ সময় পাকিস্তান আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন।



১৯৪১ সালে ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ প্রমুখ যোগদান করেন। শেখ মুজিব এই সম্মেলনের অন্যতম আয়োজক ছিলেন। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে ম্যাট্রিকুলেশন (এনট্র্যান্স) পাশ করার পর ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং এখানে পড়াশোনাকালীন তিনি বাংলার অগ্রণী মুসলিম নেতা হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন। এম. ভাস্কর তাকে সোহ্‌রাওয়ার্দীর ছত্রতলে রাজনীতির উদীয়মান বরপুত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একই বছর কলকাতায় ছাত্রনেতা আবদুল ওয়াসেক প্রমুখের নেতৃত্বে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ঐ সময় থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বেঙ্গল মুসলিম লীগে যোগ দেন। এখানে তাঁর ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য বিষয় ছিল পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি কলকাতায় বসবাসকারী ফরিদপুরবাসীদের নিয়ে তৈরি “ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট এসোসিয়েশনের” সেক্রেটারি মনোনীত হন। এর দুই বছর পর ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের মহাসচিব নির্বাচিত হন।


“পাকিস্তান দাবির পক্ষে গণভোট” খ্যাত ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে শেখ মুজিব বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে লীগের ওয়ার্কার ইনচার্জ হিসেবে একনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে, সাধারণ কৃষক সমাজের কাছে গিয়ে তিনি পাকিস্তান দাবির ন্যায্যতা প্রচার করে ভোট চান। এই নির্বাচনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোতে মুসলিম লীগ বিজয় লাভ করে। তবে একমাত্র বাংলায় তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং সোহ্‌রাওয়ার্দীর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়।


১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস পালনের সময় কলকাতায় ভয়ানক হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। এসময় মুজিব মুসলিমদের রক্ষা এবং দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক তৎপরতায় শরিক হন। সেই সময় সোহ্‌রাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎচন্দ্র বসু প্রমুখের নেতৃত্বে ভারত ও পাকিস্তান কর্তৃত্বের বাইরে অবিভক্ত স্বাধীন বাংলা গঠনের যে “যুক্তবঙ্গ আন্দোলন” সংগঠিত হয়, শেখ মুজিব তাতেও যুক্ত হন। পরবর্তীকালে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি নিশ্চিত হয়ে গেলে আসাম প্রদেশের বাঙালি মুসলমান অধ্যুষিত সিলেট জেলার ভাগ্য নির্ধারণে গণভোট হয়। শেখ মুজিব সিলেট গণভোটে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে সংগঠক ও প্রচারক হিসেবে কাজ করেন। তিনি এসময় প্রায় ৫০০ জন কর্মী নিয়ে কলকাতা থেকে সিলেট গিয়েছিলেন। গণভোটে জয়লাভ সত্ত্বেও করিমগঞ্জ পাকিস্তানে না আসায় এবং দেশভাগের সীমানা নির্ধারণের সময় পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন ভৌগোলিক অপ্রাপ্তির বিষয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।


তখন তাঁর ১৬। পনের ষোল বছরের ছেলেরা স্বদেশী আন্দোলনের দলে ভিড়ছে। স্বদেশী আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি অংশ। এই আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নতি। আন্দোলনের কৌশলগত অন্তর্গত ছিল ব্রিটিশ পণ্য বয়কট এবং দেশীয় শিল্প ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার উন্নতিসাধন। স্বদেশী আন্দোলনের উৎস ছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী গণজাগরণ। এটি ১৯১১ সাল পর্যন্ত চলেছিলো। এই আন্দোলন ছিল প্রাক-গান্ধী যুগের সফলতম আন্দোলনগুলির অন্যতম।


ইংরেজদের নির্যাতন নিপীড়ন দেখে শিশু শেখ মুজিবুর রহমানের মনেও বৃটিশদের প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হয়। স্বদেশী আন্দোলন তখন গোপালগঞ্জ আর মাদারীপুরের ঘরে ঘরে। তিনি ছিলেন মাদারীপুরে। সবেমাত্র চোখের অপারেশন হয়েছে। লেখাপড়া নেই, খেলাধুলাও নেই। শুধু একটাই কাজ, বিকালে সভায় যাওয়া। সভায় যাবেনই না কেন! তাঁর প্রতিটি রক্তকণায় যে অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার দুর্নিবার স্রোত। ইংরেজরা সীমাহীন অত্যাচারে উপমহাদেশের সামগ্রিক অবস্থাকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের এদেশে থাকার অধিকার নেই- স্বাধীনতা আনতে হবে। তিনি এটাই বুঝতেন। ফলাফল, স্বদেশী আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়া। সুভাষ বসুর ভক্ত হয়ে গেলেন, রোজ সভায় যান, মেলামেশা করেন স্বদেশী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের সাথে। অর্থাৎ নিজের অজান্তেই শুরু হয়ে যায় রাজনীতির চর্চা। চর্চাটা খুব খাটো করে দেখার উপায় নেই, কারণ- তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁর দাদা খান সাহেবকে গোপালগঞ্জের সেই সময়ের এসডিও হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন।


বয়স এক বছর বাড়তেই, অর্থাৎ ১৭তে আরও একটু বেশিই তৎপর হয়ে উঠলেন, সে গল্প আগেই বলা হয়েছে। গৃহশিক্ষক আবদুল হামিদ এমএসসির উদ্যোগে 'মুসলিম সেবা সমিতি' গঠন করেন। এলাকার সকলের সহায়তায় এই সমিতি চালাতেন। কেউ সাহায্য করতে নারাজ হলে খবর করে ছাড়তেন। এজন্য তাঁর বাবার কাছে শাস্তিও পেতেন। কিন্তু সেই শাস্তি তাকে দমায় কী করে? তিনিতো বাবার সাথে বসেই রাজনীতির আলাপে মগ্ন হতেন। আনন্দবাজার, বসুমতী, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী, সওগাত এই সমস্ত পত্রিকা তাঁর বাবা বাসায় রাখতেন। শেখ মুজিবুর রহমান ছোটবেলা থেকেই এইসব খবরের কাগজ পড়তেন। নীতি-নৈতিকতা-আদর্শের অনবদ্য অটল শিক্ষা তাঁর ছোটবেলার। প্রথমটা যেন বাবার হাত ধরেই শুরু- বাবার সাথে রাজনৈতিক আলোচনায় কতো কতো সময় মগ্ন হয়েছেন, অন্যদের কাছে প্রশ্রয় না পেলেও ভালো কাজে বাবার উৎসাহ পেয়েছেন। রাজনৈতিক চর্চার শুরুটি তাঁর ঘরেই।


এই প্রসঙ্গে একটা গল্প না বললেই নয়। শেখ মুজিবুর রহমানের বাবার এক অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন আবদুল হাকিম মিয়া। যিনি সবসময়ই শেখ মুজিবুর রহমানের উপর নজরদারি করতেন। পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়েছিলেন মুজিব, তাই একগুঁয়েও হয়ে পড়েছিলেন। এলাকায় একটা দল নিয়ে ঘুরতেন। তাঁর দলের ছেলেদের কেউ কিছু বললে রীতিমতো মারপিট করতেন। তাঁদের যন্ত্রণায় শেখ লুৎফর রহমান অতিষ্ঠ হয়ে উঠতেন প্রায়ই। আবদুল হাকিম মিয়া শুধুই ছেলের অভিযোগ নিয়ে আসতেন শেখ লুৎফর রহমানের কাছে। কখনো কাজ হতো, কখনো কাজ হতো না। কখনো নিজেই বকে দিতেন শেখ মুজিবুর রহমানকে। কিন্তু তাতে করে শেখ মুজিবুর রহমানকে ঠেকিয়ে রাখা যায়নি কোনদিন, তিনি সর্বদাই উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো বিরাজমান বাংলার আকাশে।


লেখক : এফ এম শাহীন, লেখক ও সাংবাদিক।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com