আলীম হায়দারের করোনা বিষয়ক সিরিজ কবিতা
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২০, ১২:৩০
আলীম হায়দারের করোনা বিষয়ক সিরিজ কবিতা
আলীম হায়দার
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

কোভিড নাইনটিন ১


কুশির ফাঁকে ফাঁকে ফুল খেলানোর সময় এটা
কোয়ারেন্টিনে ডালে লালটিকার বুলবুলিটা
একলা ঘুঘু, জোড়া ঘুঘু, হঠাৎ দেখা দোয়েলটা—
নিমের ডগায় নদীর প্রেম চক্রাবক্রা মাছরাঙা


শুধু চৈতালি বায়ুর ওড়াফেরা বেড়েছে অবাধ
উড়ছে বিরহনীলের বুকে শাদা শাদা মেঘের তুলা
স্বকীয় সজ্জা ফিরেছে রাতের: শুনছি নির্জনতা
লুটপাট হয়ে যাওয়া রূপ ফিরে পেয়েছে ঋতুরাজ


কোলাহল কমেছে হাটে, বাট্টা কমেছে ঘাটে,
সন্ধ্যার বাঁশঝাড়ে বেড়েছে বকের ডানার ঝাপটা—


জঙ্গলে ভাঁটের ফুল, কলি এসেছে শিয়ালমুতরায়,
তবুও ঘোমটা খোলেনি জোঁনাই পোকা—
এবার লকডাউন হয়ে যাও খামোশ মন্ত্রীরা
আসছে অম্যাবশ্যায় ফিরে আসুক আলোর পাখিরা—


কোভিড নাইনটিন ২


দেশে লকডাউন চলছে, সবাই হোম কেয়ারেন্টিনে
সড়কে সড়কে সেনা টহল—পুলিশ—ম্যাজিস্ট্রেট
এদিকে জ্যোতিষীর পেট খালি জনশূন্য শুক্রবারে
ঘরে চাল নেই, জ্বলেনি চুলো, জ্বালাটা কে বুঝবে!
ফুটপাতে ভাগ্য বলা লোকটি আসলে দিনমজুর
কখনো নিজের হাতটি দেখার সুযোগ পায়নি সে!


কোভিড নাইনটিন ৩


জন্মের আগে একা ছিল জঠরের সময়গুলো
মৃত্যুর পর কাফন মুড়িয়ে আসে চির একাকিত্ব
মাঝখানে বিরতি: জীবন বয়ে চলা নদীর মতো


করোনাভাইরাস অমোঘ নিঃসঙ্গতা মনে করালো
তুমুল কোলাহল মানে আইসোলেশনের প্রতীক্ষা
মানুষ শুধুই নিজের পাহারাদার, বাকি সব মিথ্যা।


কোভিড নাইনটিন ৪


শাবান মাসের ভরা পূর্ণিমা শেষ, ভাগ্যরাত্রির চন্দ্রপ্রহর কেটেছে
চৈতালি হাওয়ার ঝাপটা মেখে তারপর আরও এক রাত
দ্বিপ্রহরের আকাশ দেখে নিজেকে মনে পড়ে—
সওদাগরি সময় শেষে হারানো আত্মার প্রেতাত্মারা হাঁফ ছাড়ে


চাওয়া—পাওয়ার বাইরেও বিস্তর জীবন থাকে, সন্ধান করি
ধ্রুপদী সত্যের, কোথা থেকে ভেসে আসে অলৌকিক জ্যোতি
চারপাশে যা দেখি: মানুষ না, দুপেয়ে জানোয়ার ভরেছে পৃথিবী


পলাশবাড়ির কবিকুঞ্জে দাঁড়িয়ে আমি চন্দ্রহত হয়ে থাকি
ইউরোপ-মার্কিনে কাফন পড়িয়ে প্রিয় শহরে যমরাজ দাঁড়িয়ে-
গাইবান্ধা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে, মৃতদের মিছিল হবে!


জিলহজের জোছনায় বুক ভাসাতে পারবে ক’জন, কে জানে?


কোভিন নাইনটিন ভাইরাসের ছোঁয়া নেই হু হু করা বাসন্তী চাঁদে
শুনেছি একটি মাত্র বাঘ আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু লাখো মানুষ মরছে
তবুও— মানুষের চেয়ে হিংস্র পাশবিক জন্তু আর কিছু কী আছে?


কাক ডাকা জোছনা, গাছের সঙ্গে গাছের মিতালিতে বাসরি বাজে
ঝোপঝাড় কেঁপে ওঠে, দমকা হাওয়া নাকে-চোখে-ফুসফুসে—
তবুও মানুষ নামের পশুরা ঘুমায়, শুধু টিকটিকি জেগে থাকে বুকে।


চন্দ্রাহত হয় না যে, সে মানুষ নয়; আস্ত জানোয়ার, পশু হয়ে গেছে।
হিংস্র জন্তুদের গ্রাস থেকে নরম মৃত্তিকা একদিন নিশ্চই মুক্ত হবে।


কোভিড নাইনটিন ৫


তবু এবারও ভ্যাবসা গরম ছিল চৈত্রের শেষ দিনটা—
করোনাক্লান্ত ঘরবন্দি সময়গুলোর প্রতিটি সন্ধ্যায় ছিল শিশিরছটা
এবারের চৈত্র অনেকটাই শান্ত, শীতের প্রভাবে বয়ে গেছে ফল্গুহাওয়া
এই ঋতুচক্র প্রজাপতি-মৌমাছি পতঙ্গে-বিহঙ্গের পুষ্পিত বিরহমালা
উত্তর আকাশে নিয়মিত সপ্তর্ষিমণ্ডল, পশ্চিমে জ্বলজ্বলে শুকতারা
বিকালের আকাশনীলায় রাতভর ঝিকিমিকি আলোর মেলা
প্রকৃতির প্রতিশোধে হত্যার শিকার প্রাণগুলো নক্ষত্রে উঁকি দেয়
জানায় অভিমানের কথা, অভিশাপ দেয় রক্তের পরম্পরা।


হুট করে খসে পড়া ধুমকেতুর কান্নায় ভারী হয় পূবালি হাওয়া—
বৃদ্ধর অবয়ব, নারীর অবয়ব, শিশুর অবয়ব, প্রাণচঞ্চল ক্রীড়াবিদ,
এই গ্রহের সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকহাসানো মানুষটার আর্তনাদ
গুমোট করে তোলে নিঃশ্বাস, নক্ষত্রে সাজানো নকশিকাঁথায়
ঝরে যাওয়া প্রাণের বর্ণিল মালা হয়ে ওঠে মনুষ্যত্বের হাহাকার—
এই বসন্ত মানুষের মুখোশ খুলে দিয়ে গেছে—
মায়ের কবরে মাটি দিতে যায়নি নাড়িছেড়া ছেলে
আইসোলেশনে থাকা প্রিয়মুখের কথা মনে হলে সবাই হাত ধুচ্ছে


এবারের বসন্তে অবলা পৃথিবী নিজেকে বাঁচানোর প্রতিঘাত করেছে
শোকের সুরেলা বিউগেলে ধূসর গ্রহজুড়ে অবিরাম প্রাণকলি ফুটছে।


কোভিড নাইনটিন ৬


গল্পের ভাঁজে ভাঁজে লুকোচুরি খেলে গোপন কবিতারা
জোছনা শেষ হলে রাতের কোলজুড়ে নেমে আসে তারা
বৈশাখের ভ্যাবসা কাটানো মধ্যরাত
এক চিলতে আঁধার, ঠাণ্ডা বাতাস—
কোথাও জল ভাঙে আলো হারানো আকাশ
এখানে শুনশান নিস্তব্ধ চারপাশ
বুকের ককপিটে ঘাঁপটি মেরে বসে থাকে দক্ষ গোলন্দাজ


নীরব রাত অনেক কথা বলে: স্নায়ুকুঞ্জে গুঞ্জরিত হাট
নির্জনতার শব্দ প্রতিধ্বনিত হয় দৃষ্টির থেকে দূরে—
শব্দহীনতার আরাধ্য শক্তিকে জয় করতে শেখো
এখন নিজের সাথে অন্তত একবার মুখোমুখি বসো


করোনাময় নববর্ষে দাপট দেখাতে পারেনি ইলিশে কালচার
নগরে নগরে খাদ্যের বিক্ষোভ—‘পান্তা দে, ভাত না হোক’


দেশ-দশের দোহাই দেওয়া চড়া দামের ব্রান্ডওয়ালারা
এবার পলাতক, বরাবর পোয়াবারো এই উদ্যোক্তারা
সামনে হয়তো বেশি দামে কাফনের কাপড় বিক্রি করবে


লকডাউন হওয়া দেশে তাই কারখানা খোলার পাঁয়তারা!
লাশের মিছিল দেখার দাবিতে স্মারকলিপি লেখে কারা?
এদিকে কফিন ব্যবসায়ীদের প্রেস রিলিজ ভাইরাল হয়েছে
কাফনের দাম বাড়লে কফিনের দামও তারা কিছুটা বাড়াবে


এবার বৈশাখে হলো না মঙ্গল, হলো না শোভাযাত্রা,
আইসোলেশনের নীরবতা ভাঙায় গোরখোদকের বেলচা—


বিবার্তা/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com