হাতের পরশ থাকুক ভরসা হয়ে
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২০, ১৮:২৫
হাতের পরশ থাকুক ভরসা হয়ে
অনামিকা রায়
প্রিন্ট অ-অ+

জীবন যে ছন্দ নিয়ে এগিয়ে চলার কথা, তার থেকে খানিক চ্যুতি হলেই প্রথমে যে মুখগুলোর ছবি ভেসে ওঠে মনে তা মা-বাবার। দারস্থ হই তাদের কোলের কাছে। তাদের অশক্ত হাত মাথার উপরে এক অপরিসীম শক্তি জোগায়। কিন্তু গত কয়েক মাসে তাদের নিয়ে চিন্তার পাহাড় জমছে মনে।


আর তারাও ক্রমশ ডুবে যাচ্ছেন অবসাদে, অসহায়তায়, একাকিত্বে। অতিমারির এই বিশ্বে টিকে থাকার লড়াই সহজ নয়। বিশেষ করে যাদের বয়স ষাট-সত্তর পেরিয়েছে, তাদের জন্য। বাড়ির বয়স্কদের অনেকেই এই কয়েক মাস একেবারেই গৃহবন্দি। তার উপরে রয়েছে নিকটাত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবের করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবর ও তাদের অন্তিম পরিণতি। এ সবই তাদের ভাবাচ্ছে। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েও অজস্র প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রবীণদের মাথায়। এর থেকে সুরাহার কোনও পথ আছে কি? তবে আগে বুঝতে হবে তাদের অসহায়তাকে।


আর্থ-সামাজিক অবস্থার কথা বিবেচনা করলে, যারা দারিদ্রসীমার নীচে বা আশপাশে, তাদের অবস্থা অসহনীয়। আমাদের দেশে সেই সংখ্যা কিন্তু অনেক। করোনার আগে পর্যন্ত অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাদের পাশে দাঁড়াত, নিজেরাও নানা ভাবে রোজগার করতেন। ফলে তারা রোজকার খাবারটুকু অন্তত পেতেন। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সেই সব কাজ খানিকটা থমকে গিয়েছিল। ফলে এরা সন্তানের উপরে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। রোজকার খাবারটুকুর জন্য এরা মানসিক ও শারীরিক অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন। অভাবের সংসারে একটা মানুষ মানে একটা পেট। এ ছাড়া রয়েছেন বিদেশে বসবাসরত সন্তানদের বাবা-মাও। ছেলেমেয়ের কাছে যাওয়ার কথা ছিল, যেতে পারেননি বা তাদের আসার পরিকল্পনাও ভেস্তে গিয়েছে। এরাও অসহায় হয়ে পড়েছেন। শরীর খারাপ হলে তাদের কে দেখবে, কী হবে? প্রশ্নগুলো মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।


একটা বয়সের পরে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। যে পৃথিবীতে এরা অভ্যস্ত ছিলেন, তা হঠাৎ বদলে গিয়েছে। তার জন্য কোনো প্রস্তুতিও ছিল না সে অর্থে। বহু বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আছেন, যাদের আর্থিক সচ্ছলতা রয়েছে, কিন্তু ডিজিটালি সক্রিয় নন। অনলাইন পেমেন্ট, শপিং, ভিডিয়ো কলও করতে পারেন না হয়তো অনেকেই। মধ্যবয়স্করা অনলাইনে কেনাকাটা করছেন বা প্রয়োজনে বেরোচ্ছেন। বেশি বয়স্কদের বেরোনো মোটেই নিরাপদ নয়। তাই পাশে কেউ না থাকলে নির্দিষ্ট দোকান থেকে ওষুধের হোম ডেলিভারি কিংবা প্রতিবেশীর উপরে তাঁদের ভরসা করতে হচ্ছে।


এদের অনেকেই কাজের লোকের উপরে নির্ভরশীল। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে তেমন নির্ভরযোগ্য মানুষও হয়তো পাচ্ছেন না। আবার শারীরিক ভাবে নিজের কাজ করতেও অক্ষম। ফলে তারা নানাবিধ সমস্যার মুখে পড়ে আরো অসহায় হয়ে পড়চ্ছেন প্রতিনিয়ত।


প্রথমেই বয়স্কদের ভাবতে হবে তারা এ যুদ্ধে একা নন। তাদের বয়সি, তাদের চেয়ে বেশি বয়সি বা আরো অসুস্থ অনেকেই এই যুদ্ধে শামিল। মনোবল ভাঙতে দেয়া চলবে না।


ডিজিটাল জগতের উপরে একটু হলেও ভরসা করতে হবে। ভিডিয়ো-কল, অনলাইনে অর্ডার করা কিছু বেসিক বিষয় তাদের শেখাতে পারি কি না, তার চেষ্টা করতে হবে। এতে এদের অসহায়তা ও একাকিত্ব অনেকটাই ঘুচবে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই কথা বলতে স্বচ্ছন্দ। এতে যেমন ওরা মনের খোরাক পান, তেমনই মনের ভারও লাঘব হয় কথা বলে।


বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ বহাল রাখতে হবে। প্রতিবেশীর সঙ্গেই দিনে অন্তত দুতিনবার কথা বলতে পারেন। প্রয়োজনে তাদের একবার বলে দেখতে পারেন, আপনার দরকারের ওষুধটা তিনি কিনে দেবেন কি না। আশপাশের মানুষের উপরে একটু ভরসা করতে হবে।


সন্তান দূরে আছে, চিন্তা করবে বলে অনেক মা-বাবাই শারীরিক অসুস্থতা বা সমস্যার কথা এড়িয়ে যান। মনে রাখবেন, এতে সন্তানের দুশ্চিন্তাও বাড়ে। তিনি যদি জানেন যে, আপনি সমস্যার কথা তাকে বলেন না, তা হলে আপনি ভাল থাকলেও তিনি অহেতুক চিন্তা করবেন। হয়তো ভাববেন যে, আপনি সত্যি গোপন করছেন। তাই সন্তানের সঙ্গে সব কথা শেয়ার করুন। কোনও বিষয় নিয়ে উদ্বেগ হলে সন্তানকে বলুন। আপনিও সুরাহার পথ পেয়ে যাবেন।


প্রত্যেক পাড়ায় এমন অনেক নবীন আছেন, যারা পাড়ার বয়স্কদের পাশে দাঁড়াতে পারেন। একে একে এগিয়ে এলেই কিন্তু তাদের সমস্যা অনেকটাই দূর করা যায়। পাড়ায়, আবাসনে বয়স্করা থাকলে তাদের কিছু লাগবে কি না খোঁজ নিন। ফোন করে দুটো কথা বলুন। প্রয়োজনে আপনাকে ফোন করতে পারেন, এই পাশে থাকার আশ্বাসই তাদের কাছে অনেক। মনে বল পাবেন তারা।


সমাজের ছাদ কিন্তু প্রবীণরাই। তাই অসময়ে তাদের পাশে স্তম্ভের মতো যদি দেশের তরুণরা দাঁড়াতে পারেন, তবেই সেই ছাদ মজবুত হবে। আখেরে মাথার উপরে ছাদ থাকবে গোটা সমাজের।


বিবার্তা/অনামিকা/জাই

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com