সাক্ষাতকার
বেকারত্ব দূরীকরণে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই: সুব্রত পাল
প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২২, ০৯:১৭
বেকারত্ব দূরীকরণে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই: সুব্রত পাল
মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

"কারিগরি কথাটির অর্থ হলো- শিল্প প্রণালীর দক্ষতা সম্পর্কিত। যে বিশেষ শিক্ষা দ্বারা এই প্রণালীগত দক্ষতার বিকাশ ঘটানো হয়, তাই কারিগরি শিক্ষা। আর এ শিক্ষায় যে দেশ যত বেশি শিক্ষিত, সে দেশ তত বেশি উন্নত। বেকারত্ব দূরীকরণ ও দেশের উন্নয়ন নিশ্চতকরণের এ শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখি কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত লোকদের চাহিদা বেশি এবং তাদের আয়ও অনেক ভালো। ফলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। জনগণকে দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করাই কারিগরি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। বর্তমানে দেশে কারিগরি শিক্ষার এনরোলমেন্ট প্রায় ২০ শতাংশ। কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে এই হারকে ২০৪১ সালের মধ্যে ৪১ শতাংশে নিয়ে যাওয়াই সরকারের মূল লক্ষ্য। "


এ কথাগুলো বলছিলেন, উপসচিব সুব্রত পাল। যিনি কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি বিবার্তা২৪ডটনেট এর কার্যালয়ে কারিগরি শিক্ষাসহ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিবার্তা প্রতিবেদক মহিউদ্দিন রাসেল।


বিবার্তা: কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্প নেয়া হয়েছে। কোন চিন্তাভাবনা থেকে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?


সুব্রত পাল: কারিগরি শিক্ষার এনরোলমেন্ট বৃদ্ধি এবং এ শিক্ষাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবার উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের দ্রুত উন্নয়ন নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারিগরি শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তেমনিভাবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জাতির পিতার এ উদ্যোগকে ফলপ্রসূ করে তোলার উদ্দেশ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে সুশিক্ষিত করে, দেশে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার জন্য এই প্রকল্পটি গ্রহণ করেছেন।


বিবার্তা: এই প্রকল্পের কাজের বর্তমান অগ্রগতি কেমন?


সুব্রত পাল: এই প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ৩৩ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে । বর্তমানে প্রকল্পের কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।


বিবার্তা: আপনি এই প্রকল্পের দায়িত্ব পালনকালে কী কী সংকট দেখেছন এবং সেগুলো সমাধানে আপনার পরামর্শ কী থাকবে?


সুব্রত পাল: এই প্রকল্প গ্রহণের পর প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে অনেকটা সময় ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ যথাসময়ে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ হয়নি। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বৈশ্বিক মহামারী করোনা শুরু হয়। ফলে দীর্ঘদিন প্রকল্পের কাজ প্রায় বন্ধ ছিল। এছাড়া করোনার কারণে প্রকল্পটি লো-প্রায়োরিটি প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ফলে তিন মাসের অধিককাল অর্থ বরাদ্দ বন্ধ ছিল। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের ভবন তৈরির জন্য স্থান নিবার্চন ও কিছু প্রতিষ্ঠানে জমির স্বল্পতার জন্য ভবনের ডিজাইন পরিবর্তন করতে হয়েছে বিধায় প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ সমস্ত বিষয়ে আরো মনোযোগী হতে হবে এবং যথাসময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।


বিবার্তা: কবে নাগাদ এই প্রকল্প সম্পন্ন হতে পারে?


সুব্রত পাল: এই প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু কোভিডসহ বিভিন্ন কারণে যেহেতু আমরা সকল কাজ শেষ করতে পারিনি, তাই প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ২ জুন ২০২২ তারিখে পিইসি-এর সভায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে এর মেয়াদ শেষ হবে।


বিবার্তা: কারিগরি শিক্ষার পূর্বের অবস্থা আর বর্তমানের মধ্যে কী পার্থক্য দেখেন?


সুব্রত পাল: বর্তমানে ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষার মান উন্নত করা হচ্ছে। নতুন নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয় করে এবং শিক্ষকদেরকে দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে আরো দক্ষ করে গড়ে তোলা হচ্ছে। এ প্রকল্পের অনুরূপ আরো দুটি প্রকল্প রয়েছে। ১০০ টি উপজেলায় ১০০টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্প এবং ৩২৯টি উপজেলায় ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে স্থাপন প্রকল্প। এসব প্রকল্পের প্রত্যেকটির উদ্দেশ্য কারিগরি শিক্ষার এনরোলমেন্ট বৃদ্ধি করা এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা।



বর্তমানে দেশে কারিগরি শিক্ষার যে এনরোলমেন্ট রয়েছে, তা ২০ শতাংশের কাছাকাছি। আর একে ২০৪১ সালের মধ্যে ৪১ শতাংশে নিয়ে যাওয়াই সরকারের লক্ষ্য। তারপর ধারাবাহিকভাবে এনরোলমেন্ট আরো বৃদ্ধি করা। তাছাড়া বর্তমানে যে টেকনিক্যাল এডুকেশন চালু রয়েছে সেখানেও বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। আমরা গত শিক্ষাবর্ষ থেকে ৬ষ্ঠ,৭ম ও ৮ম শ্রেণিতে টেকনিক্যাল স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু করেছি। আগে এ ক্লাসগুলোতে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হত না। অর্থাৎ ৯ম শ্রেণি থেকে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হত। সেই সাথে আমাদের কোর্সও পরিবর্তন করে ঢেলে সাজানো হয়েছে। চালু থাকা ডিপ্লোমা কোর্সগুলোকে কিভাবে আরো সুন্দর ও সময়োপযোগী করা যায় সেই বিষয়েও আমরা কাজ করছি। শিক্ষার্থীদের আরো সুন্দর ভাবে শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সময় ও যুগের সাথে সঙ্গতি রেখে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে। হাতে কলমে শিক্ষা আরো জোরদার হয়েছে।


বিবার্তা: কারিগরি নিয়ে আপনাদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিষয়ে সরকারের উদ্দেশ্যে বিশেষ কোনো মেসেজ দিতে চান কী না?


সুব্রত পাল: বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষাকে এতো বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, সেটা আমাদের জন্য আশীবার্দ স্বরূপ।


গত শিক্ষাবর্ষ থেকে ৬ষ্ঠ, ৭ম ও ৮ম শ্রেণিতে ১৩৪ টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। এটি মানুষের ভেতরে অনেক সাড়া ফেলেছে। এভাবে যদি আমরা এগিয়ে যেতে পারি তাহলে কারিগরি শিক্ষার দ্রুত বিস্তার ঘটানো সম্ভব। আর এটা করা গেলে যেমন দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে উঠবে,, একইসাথে তাদেরকে কাজে লাগিয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা সম্ভব।


তাছাড়া আরেকটা বিষয়, সাধারণ লাইনে পড়াশোনা করে অনেকেরই চাকরি পেতে কষ্ট হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষায় ডিগ্রি অর্জন করলে, ডিপ্লোমা কিংবা শর্ট কোর্স সমাপ্ত করতে পারলেও দেশে-বিদেশে চাকুরি পাওয়া সম্ভব। ফলে আমাদের অর্থনীতিও আরো সুন্দর ও সমৃদ্ধ হবে। তাই কারিগরি শিক্ষার জন্য সরকারের নানামুখী উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি।


বিবার্তা: শিক্ষাবিদরা বেকারত্ব দূরীকরণে কারিগরি শিক্ষার কথা প্রায়ই বলে থাকেন। এটা নিয়ে আপনাদের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কী না?


সুব্রত পাল: বেকারত্ব দূরীকরণ এবং জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে চলমান এ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর তথা কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের একটাই স্লোগান। সেটা হচ্ছে- ‘একটাই লক্ষ্য, হতে হবে দক্ষ’।


বিবার্তা: বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা এবং কারিকুলাম উন্নত বিশ্বের সমমানের কী না?


সুব্রত পাল: কারিগরি শিক্ষায় যে কারিকুলাম গ্রহণ করা হয়েছে, তা অস্ট্রোলিয়া, জার্মানি, কোরিয়া, মালয়েশিয়াসহ যে সকল দেশ কারিগরি শিক্ষায় অগ্রগামী তাদের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রণয়ন করা হয়েছিল। তবে এই কারিকুলাম সময়ের সাথে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে, বিশ্ব যতটা এগিয়েছে, আমাদের ততটা পারিনি। আমাদের বেশকিছু সমস্যাও রয়েছে। কাজ করতে গেলে সময়, অর্থ, আন্তরিকতা ও গুরুত্বের দরকার। কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বর্তমান সরকারের আমল থেকে। আর এ সময়ে যে কোর্সগুলো হচ্ছে সেগুলো বর্হিবিশ্বের সাথে সঙ্গতি রেখেই করা হচ্ছে।


বিবার্তা: কিউ এস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং ২০২২-এ বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বুয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০০ এর বাহিরে। বিষয়টি আপনি কী ভাবে দেখেন?


সুব্রত পাল: আসলেই এটা ভাববার বিষয়। একসময় আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলতাম প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। কিন্তু এখন এই বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ে অনেকটা নেমে গেছে। এক সময় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক ছিলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীও ছিলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের। বর্তমানে বিশ্বমানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী তেমন একটা তৈরি হচ্ছে না। এটা আসলেই বড় উদ্বেগের বিষয়। এ বিষয়টি ভালোভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের সাথে অনেক কিছু জড়িত। সেই বিষয়গুলো ঠিক আছে কিনা, সেটা ভালোভাবে যাচাই করা দরকার।


বিবার্তা: কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান?


সুব্রত পাল: আমি সুন্দর ও স্বপ্নের বাংলাদেশ দেখতে চাই। যে স্বপ্ন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক প্রচেষ্টা ও দৃঢ় পদক্ষেপে এর অনেকটাই পূরণ হয়েছে। আর এভাবেই যদি আমরা এগিয়ে যেতে থাকি, তাহলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ আরো সুন্দর ও সমৃদ্ধ হবে। আমরা অতি শীঘ্রই একটি উন্নত দেশে পরিণত হতে পারব। যে দেশ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বর্হিবিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো। এ রকম একটি উন্নত বাংলাদেশ আমি দেখে যেতে চাই।


বিবার্তা: বিবার্তাকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।


সুব্রত পাল: আপনাকেও ধন্যবাদ। বিবার্তার জন্য শুভকামনা রইলো।


বিবার্তা/রাসেল/রোমেল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com