'চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে রোবট’ (পর্ব-২)
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২২, ১৭:১১
'চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে রোবট’ (পর্ব-২)
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট সারা বিশ্বে ছয় দশকের বেশি সময় ধরে মানুষের কাজকে সহজ করে তুলেছে। রোবট দিয়ে এখন পারিবারিক নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ, অফিস, কল-কারখানার কাজ এমনকি হাসপাতালের কাজও করানো হচ্ছে। তারা মানুষের পাশাপাশি কারখানার ভারী কাজ করা শুরু করেছে। কোভিড পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য খাতে রোবটের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সুদূরে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকে শুরু করে টেলিমেডিসিনের ক্ষেত্রেও সহযোগী ভূমিকা রাখছে রোবট। রোবট এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ এবং স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠেছে।রোবট মানুষের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতাও অর্জন করেছে।


সম্প্রতি বিবার্তার সাথে কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. লাফিফা জামাল। দীর্ঘ আলাপে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রোবটিক্স সেক্টরের বর্তমান হালচাল, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ, এই সেক্টরের সমস্যা ও সমাধানসহ নানান বিষয়। দীর্ঘ আলাপের বিষয়গুলো বিবার্তার পাঠকদের জন্য আজ তার দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হলো।


বিবার্তা: রোবটিক্স সেক্টরের শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পর্যাপ্ত রিসোর্স রয়েছে কিনা?


অধ্যাপক ড. লাফিফা জামাল: দেখুন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে রোটিক্স নতুন একটা বিষয়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রোবটিক্স বিভাগ রয়েছে। এই সময়তে আমরা কিন্তু বলতে পারি না রোবটিক্স বিষয়ে আমাদের অনেক দক্ষ মানবশক্তি আছে। আমরা মাত্র শুরু করেছি। আস্তে আস্তে আমরা আরো সামনের দিকে এগিয়ে যাব। আরো ভালো করব। তখন দেখা যাবে যে আমাদের আরো দক্ষ মানবশক্তি বেরিয়ে আসছে।



বিবার্তা: চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশের রোবটপ্রেমীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি?


অধ্যাপক ড. লাফিফা জামাল: আমারা এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সময়ের মধ্যে আছি। এই সময়টাতে আমাদের যেকোন কাজ করতে হলে প্রযুক্তিরনির্ভর জ্ঞানে বিশেষভাবে দক্ষ হতে হবে। একটা সময় ছিল যখন এসএসসিতে ফাস্ট ডিভিশন পেলে তাকে অনেক কিছু মনে করা হতো। এখন ডিগ্রি বা মাস্টার্স পাস করলেও কোন কাজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা না থাকলে সহজে চাকরি মেলে না। সবাই চায় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা। আর একটা বিষয় হলো, আপনি যেকোনো বিষয়েই পড়াশোনা করেন না কেনো, একটা পর্যায়ে এসে কম করে আপনার প্রযুক্তির জ্ঞান দরকার আছে। আমরা আগে মনে করতাম শুধু কম্পিউটার বিজ্ঞানের স্টুডেন্টরাই প্রোগ্রামিং নিয়ে পড়বে, যারা রোবটিক্স নিয়ে পড়াশোনা করবে তারা শুধু প্রোগ্রামিং নিয়ে পড়বে। এখন দেখছি সেটা কিন্তু আর নেই। আমাদের সবার জন্যই এই প্রোগ্রামিং জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজন।


আমরা সব সময় বলি, অন্তত সবার যেনো একটি সফটস্কিল থাকে যে বিষয়ে আমরা অত্যন্ত দক্ষ। আমরা যদি সব কিছুই অল্প অল্প জানি, কোন কিছুই ভাল করে না জানি, তাহলে আমাদের পক্ষে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে টিকে থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়বে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন হবে প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান এবং কারিগরি দক্ষতা। বিশেষ করে রোবটিক্স, মেকাট্রনিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, আইওটি, ন্যানো টেকনোলোজি এবং বিগ ডাটার মত সব অ্যাডভান্সড প্রযুক্তির জ্ঞান। যারা এসব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করবে আর কাজে দক্ষ হবে তারা আগামীতে সুন্দর জীবন যাপন করবে।


বিবার্তা: রোবট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন ভবিষ্যতে মানুষের আয়ের পথ কেড়ে নিতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট। আসলে কী তাই?


অধ্যাপক ড. লাফিফা জামাল: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট সারা বিশ্বে ছয় দশকের বেশি সময় ধরে মানুষের কাজকে সহজ করে তুলছে। রোবট একদিকে যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করে তুলছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে মানুষের আয়ের পথ কেড়ে নিতে পারে এমনটা ধারণা করা হচ্ছে। আসলে কিন্তু তা নয়। রোবট দিয়ে উন্নত বিশ্বে নানান ধরনের কাজ করানো হয়ে থাকে। রোবট মূলত মানুষের ইচ্ছেমতো কাজ করে থাকে। কেননা রোবটাকে প্রোগ্রাম করে রাখা হয়। ওই প্রোগ্রামে সমস্যা হলে কাজের পথে বাধা সৃষ্টি হয়। তখন রোবটগুলো প্রোগ্রাম অনুযায়ী কাজ করতে পারে না। তবে রোবট এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ এবং স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠেছে। একাধিক রোবট মানুষের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতাও অর্জন করেছে।



রোবট দিয়ে এখন পারিবারিক নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ, অফিসের কাজ, কল-কারখানার কাজ এমনকি হাসপাতালের কাজও করানো হচ্ছে। তারা মানুষের পাশাপাশি কারখানার ভারী কাজ করা শুরু করেছে। কোভিড পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য খাতে রোবটের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। সুদূরে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকে শুরু করে টেলিমেডিসিনের ক্ষেত্রেও সহযোগী বন্ধুর ভূমিকা রাখছে রোবট। প্রযুক্তির জোরে রোবট কাজ করবে। এর জন্য বিপুল পরিমাণ মানুষ চাকরি হারালেও এর বিপরীতে সৃষ্টি হবে নতুন ধারার নানা কর্মক্ষেত্র।


চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই সময়টাতে এসে দেখছি চাকরির ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনগুলো হচ্ছে। আপনি হয়তো খেয়াল করলে দেখবেন অনেকগুলো চাকরির পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তার জায়গায় নতুন আরেকটি রাস্তা খুলে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কাগজের পত্রিকাগুলোর সার্কুলেশন কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে অনলাইন পত্রিকার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সবাই অনলাইনের দিকে ঝুঁকছে। পরিবর্তন হচ্ছে। সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে প্রযুক্তির ছোঁয়া চলে আসছে। আর আমরা সবাই সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আগামীতে এর প্রভাব আরো বেশি করে দেখা যাবে।


চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগের এসব চাকরির জন্য প্রয়োজন হবে প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান এবং কারিগরি দক্ষতা। বিশেষ করে ডাটা সায়েন্টিস্ট, আইওটি এক্সপার্ট, রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ারের মতো আগামী দিনের চাকরিগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী তরুণ জনগোষ্ঠী। আর এসব তরুণদের জন্য চাকরির অভাব হবে না।


বিবার্তা: বর্তমানে সারা পৃথিবী রোবট প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। আমাদের উদ্ভাবকরা কী ধরনের রোবট নিয়ে কাজ করছেন?


অধ্যাপক ড. লাফিফা জামাল: বিষয়টাকে আমি এভাবে বলতে চাই, তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির ফলে ইন্টারনেটে সার্চ করলে এমন কোন তথ্য নেই, যেটা জানা যাবে না। যা জানতে চান আপনি সবই সহজে পেয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে আগে কাজের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সফটওয়্যার ব্যবহার হতো। এখন মোবাইল অ্যাপের কল্যাণে ইন্টারন্টে চালু করলেই মোবাইলের স্ক্রীণে বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার চলে আসে। আপনি যে ধরণের কাজই করতে চান না কেনো, সব ধরনের অ্যাপই রয়েছে। পড়াশোনা করতে চান মোবাইলে অ্যাপ আছে। রূপচর্চা করতে চান সেটারও অ্যাপ আছে। তার মানে আপনার জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রেই আপনাকে একটা ভাল লাইফস্টাইল দেয়ার জন্য এই অ্যাপ রয়েছে। এটা কিন্তু শুধু পড়াশোনা বা প্রযুক্তি বিষয়ে সীমাবদ্ধ না। একইভাবে আপনি যদি রোবটের কথা বলেন সেটাও কিন্তু আস্তে আস্তে তাই হচ্ছে। আমাদের দেশে অবশ্য সেভাবে শুরু হয়নি।



আপনি দেশের বাইরে যান, দেখবেন বাসাবাড়িতে রুম ক্লিনার হিসেবে প্রচুর রোবট ব্যবহার হয়। খুব কমন একটা ব্র্যান্ডের নাম রুম্বা। রুম্বা রোবট ক্লিনার বাসায় কাজে সহায়তা করে। একইভাবে হিউম্যান রোবট আছে। এসব রোবট আপনার প্রাত্যহিক জীবনে কাজে সহায়তা করবে। আমাদের স্টুডেন্টরা স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে রোবট নিয়ে গবেষণা করছে। যেমন রোবটটা শিশুদের অ, আ, ক, খ, বর্ণমালা লেখা শিখাবে। ভাষা শেখায় সহযোগিতা করবে। এরকম আরো বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে স্টুডেন্টরা গবেষণা করছে। সেই সাথে রোবটও বানাচ্ছে। যেমন, চট্টগ্রামের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ইলেকট্রনিক্সে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অধ্যয়নরত জয় বড়ুয়া লাভলু পড়াশোনার পাশাপাশি অনেকগুলি রোবট বানিয়েছে। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় সে হোম ক্লিনিং রোবট বানিয়েছে। কৃষক সহায়তায় উদ্ভাবন করেছেন উভচর রোবট, রোবটিক থার্ড হ্যান্ড, ওয়্যারলেস হ্যান্ড, ইএমজি কন্ট্রোল রোবটিক হ্যান্ড, হেড মেসেজ ডিভাইজ, এলিন ওয়ান ফিউচার কার, রোপ ক্যামেরা, ওয়্যারলেস ক্যামেরা, কথা বলা রোবট, রোবটিক্স মুখ ইত্যাদি। এরকম সারাদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের রোবটা বানাচ্ছে।


বিবার্তা: দেশে রোবটিক্স সংস্কৃতিকে আরো ত্বরান্বিত করতে আপনার পরামর্শ কী থাকবে?


অধ্যাপক ড. লাফিফা জামাল: ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে রোবট একটা বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো আমাদের থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার কারণ হলো, তাদের রোবোটিক্স সেক্টর আমদের থেকে এগিয়ে আছে। আমাদের দেশেও এই সম্ভাবনা রয়েছে। এই দেশে অনেক মেধাবি তরুণ-তরুণী আছে। তারা রোবট নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। তাদের এই উৎসাহ ও আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে এই সেক্টরের কাজকে এগিয়ে নিতে হবে। রোবটিক্স বিষয়ক শিক্ষাকে আরো বেশি বেশি প্রচার করতে হবে। মানুষের কাছে রোবটের ব্যবহার, ক্ষমতা সম্পর্কে জানাতে হবে। সেইসাথে সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়েগুলোকে উদ্যোগ নিয়ে রোবটিক্স শিক্ষার বিষয়ে জোর দিতে হবে। আমাদের সামাজিক জীবন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই রোবট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এসব দিকে নজর দিতে হবে। পরিকল্পনা করে কাজ করলে একদিন চায়না, জাপান, কোরিয়ার মতো আমরাও এগিয়ে যাবো। (চলবে)


বিবার্তা/গমেজ/রোমেল/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com