কলকাতা কি 'সাহিত্যের শহর' হতে পারে?
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০১৮, ১৭:৩০
কলকাতা কি 'সাহিত্যের শহর' হতে পারে?
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

বিভিন্ন মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের ২৭টি শহরকে সিটি অফ লিটারেচার বা সাহিত্যের শহর হিসেবে বেছে নিয়েছে ইউনেস্কো। এই তালিকায় ঠাঁই হয়নি কলকাতার। অথচ এই শহর কোটি কোটি মানুষের ভাষা বাংলায় সাহিত্যচর্চার পীঠস্থান।


২০০৪ সাল থেকে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ইউনেস্কো নানা ক্ষেত্রে সৃজনশীল কাজের জন্য বিখ্যাত শহরের তালিকা তৈরি করতে শুরু করে। সেই পরম্পরাতেই ২০১৭ সালে 'সাহিত্যের শহরের' তালিকা প্রস্তুত করে ইউনেস্কো। এই তালিকায় ২৭টি শহরের নাম রয়েছে। এই শহরগুলো ছয়টি মহাদেশের ২৩টি দেশে। তালিকায় যেমন ইংল্যান্ডের নরউইচ, জার্মানির হাইডেলবার্গ, চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগ, স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ, অ্যামেরিকার আইওয়া সিটির নাম রয়েছে, তেমনি ঠাঁই পেয়েছে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের নাম। অথচ তালিকায় এমন কিছু শহরের নাম নেই, যেখানে ব্যাপকভাবে সাহিত্যের চর্চা হয়। শুধু তা-ই নয়, সেই শহরের অধিকাংশ মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, তা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মাতৃভাষা।


এ প্রসঙ্গে আসে বাংলা ভাষা ও কলকাতা শহরের কথা। ২৬ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। সেই ভাষায় সাহিত্যচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত কলকাতা, যে কলকাতা উপমহাদেশের প্রথম নোবেলবিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ও কর্মভূমি। বিশ্বকবি তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির জন্য নোবেল পেয়েছেন। সাহিত্যচর্চার সেই ধারা আজও বহমান। তবু কেন কলকাতা ইউনেস্কোর তালিকায় জায়গা পেলো না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গের বাংলাসাহিত্য ও প্রকাশনা জগতের শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা।


কবি সুবোধ সরকার ইউনেস্কোর এই সিদ্ধান্তে স্তম্ভিত, দুঃখিত ও বিষণ্ণ। এই তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে শুধু সাহিত্যপ্রেম নয়, প্রকাশনা থেকে অনুবাদের কাজ, গ্রন্থাগার থেকে পুস্তকবিপণি - এমন বিভিন্ন মাপকাঠি রাখা হয়েছে। এসবে গুরুত্ব না দিয়ে কিভাবে তালিকা হলো - প্রশ্ন রেখে সুবোধ সরকার বলেন, ‘‘এই শহরে খোলা আকাশের নিচে বৃহত্তম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। ১০ দিন ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষ আসে বইমেলায়। পৃথিবীতে কোথাও এটা হয় না। শুধু এই কারণেই কলকাতাকে সাহিত্যের শহরের স্বীকৃতি দেয়া যেতো।''


শুধু বইমেলা নয়, কলকাতার পক্ষে আরো যুক্তি দাঁড় করান সুবোধ সরকার। বলেন, ‘‘যে শহরে তিন হাজার লিটল ম্যাগাজিন বেরোয়, সেই শহরকে তো ফেলে দেওয়া যায় না! কলকাতায় ১০-১৫টা সাহিত্যসভা হয় রোজ। এ থেকেই বোঝা যায় আমাদের শহর সাহিত্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ঘর করে।''


সাহিত্যের গুণমানের ওপর ভিত্তি করে এই তালিকা তৈরি হয়নি। ইউনেস্কো এ সংক্রান্ত একটি মাপকাঠি তৈরি করেছে। সেই মাপকাঠিতে দেখা হয়েছে একটি শহর থেকে কী ধরনের বা কত রকমের বই প্রকাশিত হয়, গ্রন্থাগার বা বইয়ের দোকানের সংখ্যা কত, বড়মাপের কোনো সাহিত্যের আসর হয় কিনা, অনুবাদের কাজ কতটা গুরুত্বের সঙ্গে করা হয়, গণমাধ্যম কীভাবে সাহিত্যকে তুলে ধরে ইত্যাদি। এ মাপকাঠিতে কি কলকাতা সত্যিই পিছিয়ে রয়েছে?


কলকাতার শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থা ‘দেজ পাবলিশিং'-এর কর্তা অপু দে মনে করেন, ''কলকাতার এই তলিকায় থাকা উচিত ছিল। শুধু সাহিত্য নয়, প্রকাশনার নিরিখেও কলকাতা অনেকের থেকেই এগিয়ে। বিপুল সংখ্যায় বই-পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হয়। এ সঙ্গে রয়েছে শারদীয়া সাহিত্যের প্রকাশ। তা-ও কেন ইউনেস্কো কলকাতাকে বঞ্চিত করল জানি না। তবে এতে বইপ্রেমীদের কিছু যায়-আসে না। কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া সবার কাছে দর্শনীয়। এর কোনো বিকল্প নেই।''


তবে অপু জানান, বাংলা ভাষায় মৌলিক রচনা প্রকাশের তুলনায় অনুবাদসাহিত্য কলকাতায় কম গুরুত্ব পায়। তাঁর ভাষায়, ‘‘আধুনিক সাহিত্যের অনুবাদ তুলনায় কম হয়, আসলে বাঙালিরা মূল ভাষাতেই সাহিত্য পড়তে পছন্দ করেন, অনুবাদে নয়৷।ঝুম্পা লাহিড়ি বা অমিতাভ ঘোষের অনুবাদের বদলে মূল বইটি পড়তে চান। সাহিত্যচর্চায় এগিয়ে না থাকলে এটা সম্ভব নয়।''


বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সম্পাদক রতন কুমার নন্দী কলকাতার প্রকাশনার ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘‘ঊনিশ শতকের গোড়া থেকে কলকাতায় সাহিত্যের বই প্রকাশের শুরু। তার ধারাবাহিকতাতেই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের উদ্ভব। শুধু বইপ্রকাশ নয়, এই নিয়ে সারা বছর আলোচনা চলে। আমরা পরিষদে বছরে ৩৪ থেকে ৩৬টি আলোচনাসভা করি। এশিয়াটিক সোসাইটি ও সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের সিরিয়াস চর্চা হয়৷।এছাড়া অগুনতি ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা সাহিত্যসভা করে৷''


আকাশবাণী কলকাতার প্রাক্তন সহ-অধিকর্তা সৌমেন বসু বলেন, ‘‘সাহিত্যের চর্চা আকাশবাণী বজায় রেখেছে। শ্রবণী-র মতো বেতার সাহিত্যপত্রিকা প্রচারিত হয়। কবিতা ও গল্পপাঠের আসর শোনা যায়। প্রতিশ্রুতিশীল সাহিত্যিকদের দিয়ে অনুষ্ঠান করানো হয়। সাহিত্যনির্ভর নাটকের বিপুল সম্ভার রয়েছে। অন্য ভাষার নাটক বাংলায় অনুবাদ করে প্রচার করা হয়। আকাশবাণীর আন্তর্জাতিক মৈত্রী চ্যানেলে ভারত ও বাংলাদেশের সাহিত্যিকরা নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করেন।''


তাই তাঁর বিস্ময়, ‘‘আমি জানি না ইউনেস্কো কোন মাপকাঠিতে কলকাতাকে বাদ দিলো। এখন কলকাতার সাহিত্যিকরা নিয়মিত বিদেশে যাচ্ছেন সাহিত্যসভায় যোগ দিতে - এটা ইউনেস্কোর জানা উচিত।''


অনেকেই মনে করেন, কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক দশকে যে গ্রন্থাগার আন্দোলন হয়েছে, তা অনন্যতার দাবি রাখে। কলকাতা থেকে জেলায় গড়ে উঠেছে অজস্র গ্রন্থাগার, যার একটা বড় অংশ সরকারের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় চলে। এই মুহূর্তে এ রাজ্যে প্রায় আড়াই হাজার গ্রন্থাগার রয়েছে। এটাই প্রমাণ করে, গ্রন্থাগারকে কেন্দ্র করে কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গে সাহিত্যের চর্চা কতটা প্রাণবন্ত।


কলকাতাবাসীদের এই চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে রামমোহন সরণির চালতাবাগানের পুজোর থিমেই এবার উঠে এসেছিল বিষয়টি। তাঁদের বক্তব্য, জেমস জয়েসের ডাবলিন যদি সাহিত্যের শহর হতে পারে, তবে কবিগুরুর কলকাতা নয় কেন? ইউনেস্কোর দৃষ্টি আকর্ষণই ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য।


শুধু তথ্য-পরিসংখ্যান নয়, সাহিত্যের সঙ্গে এই প্রাণের যোগকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন কবি সুবোধ সরকার। তাঁর ভাষায়, ‘‘এই তথ্যের বাইরে মন-মনন বলে একটা কথা আছে৷ যে কারণে কলকাতা সারা দেশে সাহিত্য- সংস্কৃতির আইকন। তাই কলকাতার নাম ইউনেস্কোর তালিকায় আসাই উচিত।'' সূত্র : ডয়চে ভেলে


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com