যে ভুলে সাইবার অপরাধে শিশুরা
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯, ১২:২৬
যে ভুলে সাইবার অপরাধে শিশুরা
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কৌতূহলের বশে এমন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা।


শিশু-কিশোরদের একটি অংশ প্রেম ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশি সক্রিয় থাকে। একপর্যায়ে তারা নিজেদের অন্তরঙ্গ ছবি, ভিডিও দেয়া-নেয়াও শুরু করে। কিন্তু এখানে ঘটে যায় বিপদ।


নানাভাবে ওইসব ছবি বা ভিডিও চলে যায় সাইবার অপরাধীদের হাতে। তারা এটিকে ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করছে। আবার সম্পর্কের অবনতি ঘটলে সংশ্লিষ্ট ছেলে-মেয়েরাও নিজেদের দেয়া ছবি-ভিডিও ঘিরে ব্লাকমেইল করছে। হুমকি দিচ্ছে। ওই ছবি-ভিডিও ভাইরাল করছে।


আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় শিশুরা কমবেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। তবে অনেকেই নিজেকে সুরক্ষিত রেখে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানে না। অনলাইনে যৌন নির্যাতন বা যৌন শোষণ সম্পর্কেও তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই।


ফলে অনেক সময় নিজের অজান্তেই কিছু ভুল হয়ে যায়। যেমন- অনলাইনে যৌনসম্পর্কিত বই পড়া, কাউকে ভয় দেখানো, হুমকি দেয়া, আইডি হ্যাকড করা, ভাইরাস ছড়ানো, ফাঁদে ফেলা, পর্নোগ্রাফি তৈরি করা ইত্যাদি। অনেক সময় পছন্দের বিষয় খুঁজতে গিয়ে নিষিদ্ধ সাইট সামনে চলে আসে। কৌতূহলবশত এসব নিষিদ্ধ সাইটে প্রবেশ করে শিশুরা। পরে এগুলোতে তারা আসক্ত হয়ে পড়ে।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন প্রায় ৪০০ শিশু-কিশোর সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা এ বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের জানাতেও ভয় পায়।


সাইবার অপরাধ দমনে সংশ্লিষ্টরা জানান, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ও ট্যাব দিয়ে শিশুরা ইন্টারনেটে বিভিন্ন গেম খেলে থাকে। সে সুযোগে শিশুদের টার্গেট করে সাইবার অপরাধীরা। সেখানে নানা প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে শিশুদের। কোমলমতি শিশুরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক সেজে অ্যাকাউন্ট খুলছে। এতে শিশুরা সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। অনেকে সরাসরি অপরাধের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে।


তারা মনে করেন, এসব সাইবার অপরাধ থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে হলে বাংলাদেশে অনলাইন চাইল্ড প্রোটেকশন প্ল্যান গাইডলাইন চালু করা প্রয়োজন।


ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজমের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের উপ-কমিশনার মো. আলিমুজ্জামান জানান, সাইবার জগতে শিশু অপরাধীর চেয়ে শিশু ভুক্তভোগীর সংখ্যা বেশি। টেকনোলোজির অবাধ ব্যবহারের কারণে অনেক সময় শিশুরা নিজেদের ইচ্ছায় অথবা সঙ্গদোষ বা ইন্টারনেট আসক্তি থেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।


তিনি বলেন, আমরা অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসছি। তবে অপরাধীর বয়স ১৮ বছরের নিচে হলে (শিশু) সেক্ষেত্রে নমনীয়তার সঙ্গে বিষয়টি দেখা হচ্ছে। অনেক সময় শিশু অপরাধীদের ক্ষেত্রে মুচলেকা নিয়ে
সতর্ক করে দেয়া হয়।


এই কর্মকর্তা মনে করেন, এ ধরনের অপরাধ থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে পরিবারকে এগিয়ে আসার বিকল্প নেই। শিশুরা ইন্টারনেটে বসে কোন সাইটে যাচ্ছে, কী করছে-সেটি পরিবারকে নজরদারি করতে হবে।


সম্প্রতি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) একটি জরিপে দেখা যায়- ৮ থেকে ১৮ বছরের শিশুদের শতকরা ৩৫ দশমিক সাতজনের নিজস্ব মোবাইল ফোন রয়েছে। এদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৯ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ১৮ এর মধ্যে। ২৫ দশমিক ২ শতাংশ শিশুর বয়স ১১ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। ৭ দশমিক ৯ শতাংশ শিশুর বয়স ৮ থেকে ১০-এর মধ্যে।


জরিপে আরও দেখা গেছে, ছেলে শিশুদের ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং মেয়ে শিশুদের ১৬ দশমিক ৯ শতাংশের নিজস্ব মোবাইল ফোন রয়েছে। ছেলে শিশুদের ৬২ শতাংশ এবং মেয়ে শিশুদের ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ছেলে শিশুদের ৫২ শতাংশ এবং মেয়ে শিশুদের ১৫ শতাংশের নিজস্ব ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে।


আসকের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজ জানান, এ অপরাধ কমাতে সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সবাইকে জানাতে হবে। সরকারের নজরদারিও বাড়ানো প্রয়োজন। বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ সাইটগুলো চিহ্নিত করে নিজেদের সুরক্ষার কৌশল জানতে পারবে।


তিনি বলেন, অবশ্য সরকার ইতোমধ্যে অনেকগুলো পর্নোসাইট বন্ধ করেছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের এসব পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে।


বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালের মে পর্যন্ত সারা দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৬ কোটি ৮ লাখ ২৯ হাজার। মোবাইল ফোন ও একই সময় পর্যন্ত ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৪৫ হাজার ছাড়িয়েছে।


এর মধ্যে ৭০ ভাগই ঝুঁকিতে আছে। ব্যবহারকারীদের মধ্যে ২০ ভাগ কোনো না কোনোভাবে সাইবার অপরাধে জড়িত। মাত্র ১০ ভাগ ব্যবহারকারী সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন।


বিবার্তা/রবি/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com