
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদে তার জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া তথ্যে একাধিক অসংগতি পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান এ তথ্য জানান।
অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন জানান, তারা কেন তুরাগ নদ-সংলগ্ন বাজার বস্তি মাঠে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে একেক সময় একেক তথ্য দিচ্ছেন দীপ। ওই মাঠে যাওয়ার কারণ ছাড়াও তাদের সঙ্গে কোনো নারী কিংবা অন্য কেউ ছিলেন কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য দিচ্ছেন না তিনি।
এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে মাদক ও নারী সংশ্লিষ্টতার বিষয় সামনে রেখেও তদন্ত করছে পিবিআই। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নাকি দুর্ঘটনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, দীপের দেওয়া কোনো তথ্যই যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করা হচ্ছে না। পাশাপাশি তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপের কললিস্ট ও বার্তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারীরা দীপের কাছে জানতে চান, তারা তুরাগ নদ-সংশ্লিষ্ট বাজার বস্তি মাঠে কেন গিয়েছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তরে দীপ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। একপর্যায়ে তিনি তদন্তকারীদের বলেন, তিনি ওই মাঠে যাননি। তাহসিফ তাকে বলেছিলেন, তিনি ওই মাঠে যাবেন।
এরপর তদন্তকারীরা দীপকে পাল্টা প্রশ্ন করেন, তিনি যদি ওই মাঠে না গিয়ে থাকেন, তাহলে মোটরসাইকেলটি মাঠের কোন জায়গায় ছিল, তা কীভাবে জানেন? এই প্রশ্নের জবাবে দীপ আবারও বক্তব্য পরিবর্তন করেন। তখন তিনি বলেন, তিনি মাঠে গিয়েছিলেন। তাহসিফ তাকে মোটরসাইকেলে করে ওই মাঠে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আগে থেকে ওই মাঠ চিনতেন না।
তবে মাঠে কেন গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে এখনো সঠিক কোনো উত্তর দিচ্ছেন না দীপ। এছাড়া তাদের সঙ্গে কোনো নারী বা আরও কোনো লোকজন ছিলো কি না, সে বিষয়েও তথ্য না দিয়ে একই কথা বারবার বলছেন তিনি। এতে তদন্তকারীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে দীপ খুবই ঠান্ডা মাথায় ও শান্ত স্বভাবে তদন্তকারীদের সব প্রশ্নের উত্তর নিজের মতো করে দিচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এক কর্মকর্তা বলেন, টঙ্গী মাজার বস্তি-সংলগ্ন ওই মাঠে মাদক সেবন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই স্থানে এর আগেও একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করেছে। তাহসিফ ও দীপ মাদকসংক্রান্ত বিষয়ে সেখানে গিয়ে থাকতে পারেন, এমন কিছু ক্লু পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া ওই সময় তাদের সঙ্গে আরও লোকজন ছিলেন কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে। তবে মাদক সেবনের জন্য ঢাকা থেকে বের হয়ে তারা টঙ্গীর ওই মাঠে কেন যাবেন, তা নিয়ে দীপকে একাধিকবার প্রশ্ন করা হলেও তিনি বিভিন্ন উত্তর দিচ্ছেন। এসব উত্তর যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করা আরেক কর্মকর্তা বলেন, তাহসিফের সঙ্গে ওই রাতে একজন নারীও ছিলেন। তাকে নিয়ে বেশ কয়েকটি জায়গায় যান তিনি। ওই নারী শেষ পর্যন্ত ওই মাঠে গিয়েছিলেন কি না, নাকি মাঠে যাওয়ার আগে তাকে তার বাসায় দিয়ে এসেছিলেন, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। এ ছাড়া মাদকের বিষয়টি জোর দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। কারণ, তাহসিফের মাদক সংশ্লিষ্টতার কিছু ক্লু পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর নিজ বাসা থেকে বের হয়ে তাহসিফ কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, তা প্রযুক্তির সহায়তায় জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। এ ছাড়া তার ফোনের কললিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপের কললিস্ট ও বার্তা ফরেনসিক পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত ২৭ অক্টোবর দীপের সঙ্গে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তাহসিফের ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে ১০ থেকে ১২ বার কথা হয়। এসব কলের কোনোটি কয়েক সেকেন্ডের, আবার কিছু কলের দৈর্ঘ্য কয়েক মিনিট ছিল। এছাড়া ওই দিন রাতে তাহসিফের ফোনে আরও একাধিক নম্বর থেকে কল আসে এবং তিনিও বিভিন্ন নম্বরে কল করেন। এসব কল ও যোগাযোগের তথ্য ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করছে পিবিআই।
মামলা না হওয়ার বিষয়েও কথা বলেছেন পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, নিহতের পরিবার মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। মামলা হলে সব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত করা হবে। এছাড়া পুলিশ বাদী হয়ে মামলা হলে নিহতের পরিবারের মামলা করার বিষয়ে বর্তমান অবস্থানও তদন্ত করা হবে। নিহতের পরিবার কেন মামলা করছে না, সে বিষয়েও তদন্ত করা হবে।
এদিকে শুক্রবার রাতে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের কার্যালয়ে দীপের বাবা, ছোট ভাই ও মামাকে দেখা যায়। দীপের বিষয়ে তার বাবা কোনো কথা বলতে চাননি। তবে দীপের মামা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পড়াশোনাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাহসিফ ও দীপের পরিচয় হয়। সেই পরিচয় থেকেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়। তাহসিফ দীপের মোহাম্মদপুরের বাসায় যাতায়াত করতেন। ওই বাসায় দীপের ভাই ও পরিবারের অন্য সদস্যরাও থাকতেন। তাদের সঙ্গেও তার পরিচয় ছিল।
তাহসিফের জানাজা ও দাফনে দীপ বা তার পরিবারের কেউ অংশ নিয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, দীপ বা তার পরিবারের কেউ যাননি।
বন্ধুত্ব ও পারিবারিক পরিচয় থাকার পরও দীপ বা তার পরিবারের কেউ জানাজা ও দাফনে যাননি কেন, এমন প্রশ্ন করা হলে দীপের মামা কোনো উত্তর দেননি।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনার সার্বিক তদন্তের বিষয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ‘তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মাদকসংক্রান্ত বিষয় ও নারীসংক্রান্ত বিষয়। এছাড়া এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নাকি দুর্ঘটনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখনো প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা যায়নি। আমরা বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করছি। এছাড়া দীপ আমাদের যা বলছে, সব কথাই আমরা বিশ্বাস করছি না। আমরা তার দেওয়া তথ্য যাচাই করছি।’
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]