
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাকের ঘটনায় বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তাকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ােি) গভীর রাতে মতিঝিল এজিবি কলোনি থেকে তাকে আটক করা হয়। তার মোবাইল ও ল্যাপটপ জব্দ করা হয়েছে।
গ্রেফতারকৃতর নাম মোহাম্মদ ছরওয়ার আলম। তিনি বঙ্গভবনের রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ছরওয়ার আলমকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য আমরা নিয়ে এসেছি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শনিবার বিকেলে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডলে প্রকাশিত একটি পোস্টে নারীদের বিষয়ে ‘আপত্তিকর মন্তব্য’ পোস্ট দেওয়া হয়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রথমে অ্যাকাউন্ট হ্যাকের দাবি করা হলেও পরে দলটি জানিয়েছে, ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল সংঘবদ্ধ চক্র। এ ঘটনায় দলটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি ও সংবাদ সম্মেলন করেছে। তবে নির্বাচনের ময়দানে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী বিএনপি সমালোচনার পর আইডি হ্যাকের দাবি করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এ ছাড়া জামায়াতের আমিরের পোস্টে কর্মজীবী নারীদের অবমাননা করা হয়েছে অভিযোগ করে এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলসহ বিভিন্ন বাম দল ও সংগঠন।
জামায়াতের আমিরের এক্স হ্যান্ডলের পোস্টের শুরুতে বলা হয়, নারী ইস্যুতে জামায়াতের অবস্থান বিভ্রান্তিকর বা দুঃখিত হওয়ার মতো নয়, বরং নীতিগত। এতে উল্লেখ করা হয়, নারীদের নেতৃত্বে আসা উচিত নয়। জামায়াতে এটা অসম্ভব। আল্লাহ এটার অনুমতি দেননি। সেখানে বলা হয়, আধুনিকতার নামে নারীদের ঘর থেকে বের করে আনার ফলে তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েন। এরপর ওই বাক্যেই কর্মজীবী নারীদের সম্পর্কে অত্যন্ত আপত্তিজনক মন্তব্য করা হয়।
এ বিষয়ে রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম তথ্যচিত্র তুলে ধরে বলেন, শনিবার বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নারীদের সম্পর্কে আপত্তিকর পোস্ট দেয় হ্যাকাররা। ওই সময়ে জামায়াত আমির কেরানীগঞ্জের কোনাখোলা মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তৃতা করছিলেন। এর লাইভ ভিডিও রয়েছে। ফলে জামায়াত আমিরের পক্ষে পোস্ট করা সম্ভব ছিল না। পোস্টের বিষয়টি ৪টা ৫৩ মিনিটে নজরে আসে জামায়াতের তথ্যপ্রযুক্তি টিমের। বিকেল ৫টা ৯ মিনিটে জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড বদল করা হয়। ৫টা ২২ মিনিটে এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যাকের বিষয়টি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের পক্ষে তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মাহমুদুল আলম বলেন, জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট নয়, হ্যাক হয়েছিল ডিভাইস। সেই ডিভাইসে এক্স অ্যাকাউন্ট লগইন ছিল। ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাধ্যমে হ্যাকাররা এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট দেয়। বিষয়টি নজরে এলে ডিভাইসে এক্সের সেশন সমাপ্ত করে ৫টা ৯ মিনিটে জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড বদল করা হয়। মানে, জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়নি। তাহলে অ্যাকাউন্ট হ্যাকের দাবি কেন করা হয়েছিল– এমন প্রশ্নে সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রথমে আমরা মনে করেছিলাম অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে। পরে আমাদের সাইবার টিম দেখেছে ডিভাইস হ্যাক হয়েছে।
ডিভাইস কীভাবে হ্যাক হলো– এমন প্রশ্নে মাহমুদুল আলম তথ্যচিত্র তুলে ধরে দেখান, গত ১০ জানুয়ারি বঙ্গভবনের ব্যবহৃত সরকারি ইমেইল ঠিকানা [email protected] থেকে জামায়াত আমিরের ইমেইল [email protected]এ মেইল আসে। এতে লেখা ছিল ‘নির্বাচন-সংক্রান্ত জরুরি তথ্য’। সরকারি ইমেইল হওয়ায় জামায়াত আমিরের একটি ডিভাইস থেকে মেইলের অ্যাটাচমেন্ট খোলা হয়। এই ‘ফিশিং অ্যাটাচমেন্টে’ ক্লিকের কারণে ওই ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ হ্যাকারদের কাছে চলে যায়। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ জামায়াতের কাছেও একই ইমেইল ঠিকানা থেকে মেইল যায়। অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাছেও ফিশিং মেইল পাঠানো হয়। বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমের ইমেইল ঠিকানাটি ব্যবহার করা হয়। এই ইমেইল ব্যবহার করে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট গত ১২ জানুয়ারি হ্যাক করার চেষ্টা করা হয়।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, ডিভাইস হ্যাকার ৪টা ৩৭ মিনিটে নারীর প্রতি অবমাননাকর পোস্টটি দিয়ে এক মিনিট পর স্ক্রিনশট রাখে। জামায়াত ৫টা ২২ মিনিটে হ্যাকের কথা জানিয়ে বিবৃতি দেয়। স্ক্রিনশট ভাইরাল করা হয় রাত ১২টার দিকে। অ্যাকাউন্ট হ্যাক না হলে সেটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হলো কেমন করে– এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, যে ডিভাইস হ্যাক হয়েছে, সেখানে জামায়াতের আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট লগইন ছিল। সামাজিক মাধ্যমে যার ইমেইল দিয়ে এক্স অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করা হয়েছে, সেই মেইলের তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে।
বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না।
এদিকে বঙ্গভবনের নামে ই-মেইল ব্যবহার করে কীভাবে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের ডিভাইস হ্যাক করা হয় তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জানানোর দাবি জানিয়েছে দলটি। মঙ্গলবার বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ দাবি জানায় জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল। বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, গত ৩১ জানুয়ারি বিকেল ৪টার পর ডা. শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল সাইবার আক্রমণের শিকার হয়। ওইদিন বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে আপত্তিকর টুইট করা হয়। বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর বিকেল ৫টা ৯ মিনিটে পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের মাধ্যমে জামায়াতের আইটি টিম হ্যান্ডেলটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে। পরে বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে হ্যাক হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে একটি জরুরি ঘোষণা দেওয়া হয়। সেই রাতে থানায় জিডি হলেও এখন দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়নি।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, জামায়াতের করা ডিজিটাল ফরেনসিকে দেখা গেছে, বঙ্গভবনের নামে একটি ই-মেইল থেকে ফিশিং মেইল পাঠানো হয়েছিল, যার মাধ্যমে ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয় বা হ্যাক করা হয়। প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় সরাসরি বঙ্গভবনে অভিযোগ জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আদিল চৌধুরীকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, তদন্ত চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিরাজুল বলেন, জামায়াত কালক্ষেপণ নয়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্তের অগ্রগতি ও প্রতিবেদন সরকারিভাবে প্রকাশ চায়।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]