"বাঙালির শোকের মাস আগস্ট"
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২২, ০৮:৫৪
কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি
প্রিন্ট অ-অ+

আবারো ফিরে এলো বাঙালি জাতির শোকের মাস আগস্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক এক অধ্যায় এই মাস। ১৯৭৫ সালের এই মাসে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারহত্যা করেছিলো নরপিশাচরা।


১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট অতিপ্রত্যুষে ঘাতকের বুলেটের আঘাতে মৃত্যু হয় আমাদের জাতির পিতার। সেদিন আমরা কাঁদতে পারিনি। ঘাতকের উদ্ধত সঙ্গিন আমাদের কাঁদতে দেয়নি। কিন্তু কেঁদেছিলো বাংলার আকাশ-বাতাস। কীনিষ্ঠুর ছিল সেই রাত! গত ৪৭ টি বছর ধরে আমরা সেই নিষ্ঠুরতা বয়ে বেড়াচ্ছি বুকে আগুন চাপা দিয়ে।


বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র- শেখ কামাল, শেখ জামাল ও ১০ বছরের শিশুপুত্র শেখ রাসেল,বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ আবু নাসের, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল, সেজ বোনের স্বামী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগিনা শেখ ফজলুল হক মনি ও তার স্ত্রী বেগম আরজু মনি সহ মোট ২৬ জন সেইদিন হত্যাকান্ডের স্বীকার হন।


জাতির পিতাকেরক্ষা করতে এসে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে নিহত হন।


১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সাথে একমাত্র তুলনা হতে পারে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত গণহত্যার। যে মানুষটা তার সর্বস্ব দিয়ে একটি জাতিকে স্বাধীনতা দান করলো সেই স্বাধীন দেশে, তাঁরই টাকায় কেনা গুলিতে জীবন দিতে হলো তাঁকে। ১৫ আগস্ট ছিলো মূলত '৭১ এর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে পরাজিত শক্তির ইন্ধনে সংগঠিত একটি হত্যাকান্ড। বঙ্গবন্ধু যে আদর্শ ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো বাঙালিদের মধ্যে তা তৎকালীন অনেকের-ই ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়াতো।


সবসময় শোষিতের পক্ষে থাকা বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন ক্ষুধা ও দারিদ্র‍্যমুক্ত অসাম্প্রাদায়িক একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে। মূলত বঙ্গবন্ধুর এই আদর্শকেই হত্যা করা ছিললক্ষ্য। তাইতো ছোট্ট রাসেলও সেদিন ছাড় পায়নি ঘাতকের বুলেটের আঘাত থেকে। ওদের একটি বার হাত কাঁপেনি ছোট্ট ওই বুকে গুলি চালাতে! সেদিন দেশের বাইরে থাকার দরুন বেঁচে গিয়েছিলবঙ্গবন্ধু কন্যা আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।


যে নেতা তাঁর জীবনের ১৪ টি বছর কাঁটিয়েছে জেলে শুধুমাত্র তার দেশের মানুষের জন্য। সেই দেশের সাথে, জনগণের সাথে বঙ্গবন্ধুর ছিলো আত্মার সম্পর্ক। তিনি তার দেশের মানুষকে অনেক ভালোবাসতেন, বিশ্বাস করতেন। তিনি কখনো চিন্তা করতে পারেননি যারা নিজেদের বাঙালি হিসাবে পরিচয় দেয় তারা কখনো তাঁর বুকে গুলি চালাতে পারে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে তিনি রিপোর্ট পেয়েছিলেন তার আদর্শকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে কিন্তু তিনি তা বিশ্বাস করেননি। কিন্তু পাকিস্তানি আর্মিতে থাকা, ওই চিন্তাধারায় বিশ্বাসী অফিসাররা যে এদেশের শোষিতদের নেতাকে যে বাঁচতে দিবেনা তা তিনি বুঝতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের কথা বলতো, কৃষকদের কথা বলতো, দিনমজুরদের কথা বলতো। এরাই ছিলো তাঁর আপনজন।


বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, "ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও জনগণের কাছ থেকে তার স্বপ্ন ও আদর্শের মৃত্যু ঘটাতে পারেনি। ১৭ কোটি বাঙালির অন্তরে গ্রোথিত রয়েছে তাঁর ত্যাগ ও তিতিক্ষার সংগ্রামী জীবনাদর্শ।"


১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি পরবর্তীতে নিজেকে পরিচিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু হিসাবে। তার সংগ্রামমুখর জীবন তাকে বাঙালিদের সবচেয়ে ভরসার জায়গায় পরিণত করেছিলেন। স্কুল জীবন থেকেই তার রাজনীতিতে হাতে-খড়ি। পরবর্তীতে ছাত্রবস্থায় কলকাতায় তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি রাজনীতিতে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের শিষ্য ছিলেন। ভারত-পাকিস্তান আলাদা হবার পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের শাসনে থাকা সম্ভব নয়।


পরবর্তীতে '৫২-এর ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট, শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ৬ দফা দাবি, '৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, '৭০ এর নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধে সবসময় তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। তার নেতৃত্বেই ৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামীলীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ্যতা লাভ করে ও ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জয় লাভ করে। তাঁর ঘটনাবহুল জীবন একটি ইতিহাস।


১৯৭০ এর নির্বাচনে জয় লাভের পরেও পাকিস্তানিরা যখন বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গড়িমসি শুরু করে এবং বিভিন্ন কার্যক্রমে বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন যুদ্ধ অনিবার্য। তাই তিনি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উত্তাল সমুদ্রে বজ্রদৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই ঘোষণায় উদ্দীপ্ত হয়েই বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সকলে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে। ছিনিয়ে আনে একটি পতাকে ও একটি মানচিত্র। যে নেতা তাঁর জীবনটাই দান করলো এই দেশ, এই জাতির জন্য সেই জাতির কিছু কুলাঙ্গার সন্তান নিজের পিতাকে হত্যা করলো।


আজ সেই ভয়াল-বীভৎস আগস্ট। আজ আমাদের কাঁদার দিন।আজ আমাদের শোকের দিন। আমরা সেদিন প্রকৃতির মতো কাঁদতে পারিনি। ওরা চেয়েছিলবঙ্গবন্ধুকে মুছে দিতে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি রক্তের ফোঁটায় মিশে আছে একটি শব্দ "বাংলাদেশ"। বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু যে পাথর চাপা শোক আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি তা থেকে এখনো মুক্তি পাইনি আমরা। কয়েকজন ঘাতকের শাস্তি হলেও এখনো বিভিন্ন দেশে লুকিয়ে আছে কয়েকজন। ওদের এই বাংলার মাটিতে এনে বিচার করতে হবে, তবেই আমাদের মাথায় যে কলঙ্কতিলক লেগেছে তা থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পাবো।


এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে পিতা মুজিবের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এগিয়ে যাবে, গড়ে তুলবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ - এই আমাদের প্রত্যাশা।


জয় বাংলা,
জয় বঙ্গবন্ধু।


লেখক:কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি, সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগ।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com