জল-জঙ্গল-পাহাড় ঘেরা বাঁকুড়ার মুকুটমণিপুর
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ০৯:১৫
জল-জঙ্গল-পাহাড় ঘেরা বাঁকুড়ার মুকুটমণিপুর
পর্যটন ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য মুকুটমণিপুরকে অনেকেই ‘রাঢ়বঙ্গের রানি’ বলেন। বাঁকুড়ার একেবারে দক্ষিণে কংসাবতী ও কুমারী নদী যেখানে মিলেছে, সেখানেই মুকুটমণিপুর জলাধার। জলাধারের চারদিকে সবুজে ঢাকা ছোট ছোট পাহাড় আর টিলা।


পাশেই রয়েছে কংসাবতী বাঁধ। সরকারি তথ্য বলছে, এটি ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাটির বাঁধ। বাঁধটি দৈর্ঘ্যে ১১ কিলোমিটার। বিধানচন্দ্র রায়ের আমলে নির্মিত। ইচ্ছা হলে মুকুটমণিপুর জলাধারের পাড় ধরে হেঁটে অথবা ভ্যানে চড়ে সোজা চলে যেতে পারেন জলাধারের গায়ে থাকা পরেশনাথ পাহাড়েও। কথিত আছে, এক সময়ে বাঁকুড়ায় জৈন ধর্মের প্রভাব ছিল। আর জৈন ধর্মাবলম্বী মানুষদের তীর্থস্থান ছিল এই পরেশনাথ পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাথরে জৈন তীর্থঙ্করদের একাধিক মূর্তি সেই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়। ‘মুসাফিরানা ভিউ পয়েন্ট’-ও এখন পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মুসাফিরানা আসলে জলাধারের গায়ে থাকা ছোট্ট একটি পাহাড়। বিভিন্ন ভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে এই পাহাড়টি। পাহাড়ের গায়ে বাঁধানো সিঁড়ি রয়েছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে মুকুটমণিপুরের যাবতীয় নৈসর্গিক শোভা দেখা যায়। হাতে সময় থাকলে নৌকায় চড়ে মুকুটমণিপুরের গভীর জলে ভাসতে ভাসতে পৌঁছে যাওয়া যায় জলাধারের অন্য পাড়ে থাকা বন পুকুরিয়া হরিণ পার্কে। এই সব প্রচলিত জায়গা ছাড়াও হাতে একটু সময় থাকলে গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে দেখতে পারেন ঝিলিমিলি ও সুতানের ঘন শাল-পিয়ালের জঙ্গল। ইচ্ছা হলে উঁকি দেওয়া যায় জঙ্গলে ঘেরা ছোট ছোট আদিবাসী গ্রামেও।


এটি আদর্শ হারিয়ে যাওয়ার ঠিকানা যেখানে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাটির বাঁধটি মুকুট বা “মুকুট” এর মতো রহস্যময় টিলা দ্বারা বেষ্টিত। দুটি নদীর সঙ্গমে অবস্থিত, এটি সবুজ রঙের মোড়কযুক্ত “রাঙ্গামাটি” এর নেকলেস আকৃতির বাঁধের জন্য বিখ্যাত। নীল জলের নির্মল প্রকৃতি এবং দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যে ধন্য, মুকুটমণিপুর হল সবুজ বন এবং টিলা ঘেরা এক লুকানো সম্পদ মুকুটমণিপুর বাঁধটি ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাঁধ হিসাবে বিবেচিত হয়। ভিড় এবং বাণিজ্যিকীকরণ থেকে দূরে মুকুটমণিপুরের একটি অংশ এখনও উপজাতীয় সংস্কৃতির গন্ধে বাস করে এবং পর্যটকদের দর্শনীয় দর্শনীয় স্থান দেয়। এটি ফটোগ্রাফির জন্য স্বপ্নের গন্তব্য হিসাবেও বিবেচিত হয়। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, ‘বাঁকুড়ার রানী’ আপনার ব্যস্ত সময়সূচির একঘেয়েমি ভাঙার জন্য আপনাকে ছুটির এক নিখুঁত সময় অফার করছে। আপনি যদি ফটোগ্রাফি পছন্দ করেন তবে আপনার জন্য একটি স্বপ্নের গন্তব্য। এটি বাজি যে আপনি দুর্দান্ত ফ্রেমগুলি ক্যাপচার থেকে নিজেকে প্রতিহত করতে পারবেন না।


কংসাবতী বাঁধ
কংসাবতী বাঁধ, ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাটির বাঁধ তার বিশাল জলাশয়ের দিকে মনোনিবেশ চায় এবং এটি মোহময়ী প্রকৃতির সাথে যেন ফিসফিস করে কথা বলে। যখন বাঁধের জলে সোনার রশ্মি ফেলে তাকে রাঙিয়ে তোলে এবং যখন সূর্য অস্ত যাওয়ার কালে জলে নেমে আসে, আপনি নিজের কল্পনার জগতে অনুভব করবেন। সূর্যাস্তের ঐশ্বরিক সৌন্দর্য উপভোগ করুন এবং সোনালী সময়ের একাকীত্বকে স্পর্শ করুন।


মুসাফিরানা ভিউপয়েন্ট


মুসাফিরানার ভিউ পয়েন্ট থেকে মনোমুগ্ধকর মুনরাইজের সাক্ষী হন। জমকালো সবুজ এবং করুণ জলের অপার সৌন্দর্য আপনাকে অবশ্যই এখান থেকে শাটারটি ক্লিক করাতে বাধ্য করবে। বিস্তীর্ণ জলছবি থেকে পূর্ণ চাঁদ উঠছে এবং জলের উপরে ঝলমল করছে দেখুন। শীতল বাতাস, নক্ষত্রের নীচে জলের উপর রৌপ্য চাঁদের আলোর প্রতিচ্ছবি এবং প্রশান্ত পরিবেশ আপনাকে স্বর্গের মতো অনুভব করাবে। আপনি অবশ্যই এখান থেকে প্রকৃতির অত্যাশ্চর্য প্রাকৃতিক দৃশ্য পাবেন।


পরেশনাথ শিব মন্দির


পরেশনাথ শিব মন্দির মহাদেবের একটি উন্মুক্ত মন্দির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কাছে একটি পবিত্র স্থান। বাঁধটি নির্মাণের সময়, পৃথিবী খনন করে প্রতিমা-টি পাওয়া গিয়েছিল এবং এটি জৈন সংস্কৃতির প্রমাণ হিসাবে বিবেচিত হয়। আপনি সেখানে অনেক পাথরের প্রতিমা দেখতে পাবেন এবং লোকেরা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করে যে, যে কয়েকটি মূর্তি আছে তার মধ্যে অনেকগুলিই জৈন দেবতাদের। বহু মানুষ এখানে আসেন ‘মহা শিবরাত্রি’ উত্সব উদযাপন করতে। আপনি এখান থেকে মনোমুগ্ধকর সূর্যাস্তের সেরা দৃশ্য পাবেন। অস্তমিত হওয়া সূর্য ধীরে ধীরে দিগন্তের নীচে ডুবে যেতে শুরু করে। জ্বলন্ত বলটি যখন অর্ধেক জলে নেমে আসে, বাঁধের মধ্যে এর প্রতিবিম্ব এটি সম্পূর্ণ দেখতে তৈরি করে তোলে এবং একটি অত্যাশ্চর্য দৃশ্য তৈরি করে। কমলা রঙের সাথে মেঘগুলি জ্বলজ্বল করে এবং পাখিরা কিচিরমিচির শব্দ করে আকাশ জুড়ে বাসার দিকে উড়ে যায়। একটি মুহূর্ত পান সারা জীবনের জন্য।


হরিণ পার্ক


বনপুকুরিয়া হরিণ পার্কটি পারিবারিক পরিসরের জন্যও উপযুক্ত জায়গা। আপনি এখানে প্রকৃতির কলতান অনুভব করবেন এবং হরিণ নিশ্চিতভাবে অবাক চোখে আপনাকে স্বাগত জানাতে আসবে। বনপুকুরিয়ার দিকে, এমন একটি রাস্তা রয়েছে যেখানে গাছগুলি রাস্তার উপরে তোরণ তৈরি করে রেখেছে। অদ্ভুত সবুজ সূর্য-রশ্মি শাখাগুলির ছাউনি দিয়ে আসে এবং রাস্তায় হালকা এবং ছায়ার একটি দুর্দান্ত চিত্র তৈরি করে। বনপুকুরিয়া গ্রামে একটি পিকনিকের ব্যবস্থা করুন এবং পুরোপুরি উপভোগ করুন। বনপুকুরিয়া গ্রাম ঘুরে দেখুন এবং উপজাতিদের কুঁড়ে ঘরে তাদের তৈরী চিত্রগুলি দেখুন।


নোয়াডিহি সানসেট পয়েন্ট


নোয়াডিহি, বড়ঘুটুর পরবর্তী একটি জায়গা। এই জায়গাটি পেতে আপনাকে পিয়ারলেস রিসর্টের রাস্তাটি অনুসরণ করতে হবে তারপরে বড়ঘুটুতে বাঁক নিয়ে যেতে হবে। বড়ঘুটু পেরিয়ে আপনি নোয়াডিহি পৌঁছে যাবেন। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার একটি আবাসন তৈরি করছে যা এখনও নির্মাণাধীন রয়েছে। এই চূড়ান্ত নীরবতার জায়গা আপনার অন্তরকে রিচার্জ করার জন্য প্রস্তুত। আপনি সুন্দর সূর্যাস্তের অভিজ্ঞতা সহ বেশ কয়েকটি পাখির কিচিরমিচির শুনতে পাবেন।


অম্বিকা মন্দির


অম্বিকানগর গ্রামে অবস্থিত অম্বিকানগর মন্দিরটিতে ৭০০ বছর ধরে দেবী দুর্গাকে মা অম্বিকা হিসাবে পূজা করা হচ্ছে। ভীড় এবং গোলমাল থেকে অনেক দূরে, স্থানীয় মানুষ সমৃদ্ধ সংবেদনশীলতা এবং প্রকৃতির আপ্যায়ন অবশ্যই আপনাকে সুখের মধ্যে নিমজ্জিত করবে।


কোথায় থাকবেন?


রাত্রিবাসের জন্য মুকুটমণিপুর জলাধারের কাছেই সরকারি ও বেসরকারি একাধিক আবাসস্থল রয়েছে। ভাড়া দেড় হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। আগে থেকে বুক করে যাওয়াই ভাল। এখন অধিকাংশ হোটেল অনলাইনে বুক করা যায়। কিছু বেসরকারি হোটেলে তাঁবুতেও রাত্রিবাসের সুযোগ রয়েছে।


কী ভাবে যাবেন?


কলকাতা থেকে মুকুটমণিপুর প্রায় ২৩০ কিলোমিটার। হাওড়া থেকে পুরুলিয়াগামী ট্রেন ধরে বাঁকুড়া স্টেশনে নেমে গাড়ি ভাড়া করে মুকুটমণিপুর যাওয়া যায়। দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহও সংস্থার বাস ধরেও সরাসরি কলকাতা থেকে মুকুটমণিপুর যাওয়া যায়। এ ছাড়া, কলকাতা থেকে গাড়ি বা বাসে চড়ে আসানসোল, দুর্গাপুর কিংবা পানাগড় হয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় মুকুটমণিপুরে।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com