আবৃত্তিশিল্পী হাসান আরিফের স্মরণসভা
প্রকাশ : ২২ মে ২০২২, ১১:০৯
আবৃত্তিশিল্পী হাসান আরিফের স্মরণসভা
এস এম রিয়াদ রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রপথিক ছিলেন আবৃত্তিশিল্পী হাসান আরিফ। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক। তার শূন্যস্থান সহজেই পূরণীয় নয়। এই ক্ষতি আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে। হাসান আরিফকে নিয়ে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের নাগরিক স্মরণসভায় এভাবেই স্মরণ করলেন আলোচকরা। শনিবার (২১ মে) বিকেলে স্মরণসভার আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।


সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন প্রয়াত হাসান আরিফ।


করোনা পরবর্তী জটিলতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১ এপ্রিল তিনি না ফেরার দেশে চলে যান।


সভার শুরুতে শহিদ মিনারে আবৃত্তিশিল্পী হাসান আরিফের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বাংলাদেশের সকল সাংস্কৃতিক কর্মীদের পক্ষে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস, নাট্যকার মামুনুর রশীদ, সাংস্কৃতিকজন নাসির উদ্দীন ইউছুফ বাচ্চু, সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সাংস্কৃতজন লিয়াকত আলী লাকীসহ পেশাজীবী, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা।


শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে হাসান আরিফের স্মরণে সবাই দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন।


স্মরণসভায় হাসান আরিফকে নিবেদিত সঙ্গীত 'তোমারো পতাকা যারে দাও, তারে বহিবারে দাও শক্ত'পরিবেশন করে জোটের সঙ্গীতশিল্পীরা। এ ছাড়াও হাসান আরিফ নির্দেশিত আবৃত্তি প্রযোজনা 'মহাবিজয়ের মহানায়ক' আসাদুজ্জামান নূরের নেতৃত্বে পরিবেশন করেন জোটের আবৃত্তিশিল্পীগণ। হাসান আরিফের অকাল প্রয়াণে শোকগাঁথা পাঠ করেন বরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী ভাস্কর বন্দোপাধ্যায়।


জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছের সভাপতিত্বে সভার সঞ্চালনা করেন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আবৃত্তিশিল্পী আহ্কামউল্লাহ্।


আলোচনায় গোলাম কুদ্দুছ বলেন, 'হাসান আরিফের চিন্তাকে আমরা ছড়িয়ে দিতে কাজ করে যাব। তার অকাল মৃত্যুতে আমরা সবাই ব্যথিত। তিনি একজন দক্ষ সংগঠক, আবৃত্তি নির্দেশক ও শিক্ষক ছিলেন।



নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে গণজাগরণ মঞ্চসহ দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলোতে সামনে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন হাসান আরিফ।


তিনি আরও বলেন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে শহীদ মিনারে বহু সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের শেষ বিদায়ের আয়োজনে অগ্রভাগে ছিলেন হাসান আরিফ; সেই শহীদ মিনার এবার হল তার বিদায়ের মঞ্চ ও স্মরণ সভা।


আলোচনায় নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, আমরা কি শুধু তার দক্ষতার জন্য স্মরণ করছি, নিশ্চইয় না। হাসান আরিফের একটি ব্যাখ্যা ছিল, একটা দর্শন সে দাঁড় করাতে পারত। আর যে মানুষের ব্যাখ্যা আছে, তাকে আমরা মন থেকে স্মরণ করি। কিন্তু আমাদের সমাজে যাদের ব্যাখ্যা আছে তাদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। রাজনীতির সাথে আমাদের একটা বিস্তর তফাত রয়ে গেছে এবং সেই বিস্তর তফাতের কারণেই মানুষের সমাজে ব্যাখ্যা কমে যাচ্ছে, দর্শনও কমে যাচ্ছে।


তিনি আরও বলেন, আমি অত্যান্ত বেদনার সঙ্গে হাসান আরিফের এই প্রস্থানকে স্মরণ করি। কারণ সে আমাদের বন্ধুত্বে পরিণিত হয়েছিল, মানুষের বন্ধুতে পরিণিত হয়েছিল। তার একটি বাস্তবমূখি ব্যাখ্যার জন্য। সেই রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সাংস্কৃতির সাথে মিলে শক্তিশালী হয়েছিল। তাই হাসান আরিফের সব কর্মকে তার ব্যাখ্যার দিকে নিয়ে যেতে হবে।


আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, আবৃত্তিশিল্পী হাসান আরিফ শুধু সাংস্কৃতিক ব্যক্তি ছিলেন না। খুব কাছ থেকে দেখেছি তাকে। আমরা যাঁরা স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে একসঙ্গে পথ চলেছি, তাঁরা নিশ্চয়ই আমার মতো একটা বেদনা অনুভব করছেন। তারুণ্যের ওপর আমার প্রচণ্ড আস্থা। আমি নিশ্চিত, আমাদের তরুণেরা সব প্রলোভনকে উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের কল্যাণে তাদের নিজ নিজ শিল্পচর্চা করবে।


সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সঞ্চালক আহকামউল্লাহ বলেন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শহিদ মিনারে নানান অনুষ্ঠানে হাসান আরিফের স্বাগত বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে যে স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যেত, সেটাই সভার সুর বেঁধে দিত। তার উদাত্ত কণ্ঠের আহ্বানে সাড়া না দেয়ার সাধ্য কার ছিল? এখন সে আর বলবে না কিছু, আসবে না কখনো শহিদ মিনারে বা আমাদের সামনে।


হাসান আরিফের বোন রাবেয়া রওশন তুলি বলেন, আমার ভাই আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে এটা আমি ভাবতেই পারি না। আমি ছোট সময় এই শহীদ মিনারে আমার মায়ের সাথে ঘুরতে আসতাম। তারপর ভাইয়ের সাথে এসেছি অনেক। কিন্তু আজ আমার ভাই হাসান আরিফ এর স্মরণ সভায় আসতে হবে আমি তা ভাবতেও পারিনি।


তিনি আরও বলেন, নিশ্চয় হাসান আরিফ এই শহীদ মিনারের আশপাশে থেকে দেখছে কে তার জন্য কি বলছে। সে হয়তো মায়ের সাথে আছে। আমার ভাই চলে গেলেও আমি হাজারো ভাই পেয়েছি। আমাদের পরিবারের যদি কাউকে কোনো কাজে দরকার হয়,আমাদের খবর দিলেই আমরা চলে আসব যে কোনো প্রয়োজনে।