স্মৃতির পাতায় শহীদ নুর হোসেনের আত্মাহুতির দিন
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২১, ২৩:৫৫
স্মৃতির পাতায় শহীদ নুর হোসেনের আত্মাহুতির দিন
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

চেরনোবিলের তেজস্ক্রিয় দূষণের ভয়ে তখন ঢাকায় সবাই দুধ-চা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। ১০ই নভেম্বরের সেই সকালে আমরা মাত্র লেবু চা খেয়ে একটা ঝুপড়ি চা দোকান থেকে বেরুচ্ছি। আমি চায়ের বিল দিতে দিতেই দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল। পুলিশ চারিদিক থেকে হানা দিয়ে ধরপাকড় শুরু করে দিয়েছে। আর মূহুর্তেই যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে আমার কাজিন এবং বন্ধু মোয়াজ্জেম (আলতু)।কোথাও তার কোন নিশানা দেখতে পেলাম না।


আগের কয়েকটা রাত আমাদের বার বার ঠিকানা বদলাতে হচ্ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে সবাইকে হল ছাড়ার নোটিশ দিয়ে দিয়েছে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার। আমি সূর্যসেন হল ছেড়ে এসে উঠলাম এস এম হলের ১২ নম্বর রুমে মোয়াজ্জেমের ঠিকানায়। কিন্তু ৯ তারিখ সেখানে থাকাটাও আর নিরাপদ মনে হলো না। আমরা দুজন চলে গেলাম আলিয়া মাদ্রাসার হোস্টেলে এক পরিচিত বড় ভাইয়ের রুমে। পরদিন ঢাকা অবরোধের ডাক দেয়া হয়েছে এরশাদের পতনের দাবিতে। শহর জুড়ে থমথমে অবস্থা, ব্যাপক ধরপাকড় চলছে।


দশ তারিখের সকালবেলায় নাস্তা সেরে আমি বললাম, এবার সচিবালয়ের দিকে যাব। কিন্তু মোয়াজ্জেম যেতে রাজী নয়। এই আন্দোলন নিয়ে মোয়াজ্জেমের ঘোরতর সন্দেহ। সে এক কট্টর বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের কর্মী, যারা মনে করে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমেই ক্ষমতা দখল করতে হবে। তিন জোটের আন্দোলন তাদের কাছে ‘বুর্জোয়া দলগুলোর ক্ষমতা দখলের কামড়াকামড়ি’ ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু আমি ছাত্রলীগের কর্মী, এই আন্দোলনের পুরোভাগে আমরা। আমি সচিবালায় ঘেরাও করতে যেতে নাছোড়বান্দা বলে শেষ পর্যন্ত ও আমার সাথী হলো।


পুরানা পল্টন সিপিবি অফিসের পাশের গলির ঝুপড়ি দোকানের সামনে যখন দুজন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম, তারপর আমি মিশে গেলাম মিছিলের স্রোতে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউর পাশে একটি মিছিলে ছিল নুর হোসেনও। তার শরীরে গণতন্ত্র মুক্তি পাক লেখা শ্লোগান। সারাদিন ঢাকা শহর উত্তপ্ত। গুলি চালিয়েছে পুলিশ। নুর হোসেনকে হত্যার জন্যই সরাসরি গুলি করেছিল তারা। সন্ধ্যায় হোস্টেলে ফিরেও মোয়াজ্জেমের দেখা নেই। নেই তার এস এম হলের ঠিকানায়ও। রাত বাড়ার পর দুশ্চিন্তা বাড়লো। পরদিন হন্য হয়ে খুঁজতে শুরু করলাম থানায় থানায়। মতিঝিল, রমনা, ডেমরা- কোথাও বাদ নেই। কী জবাব দেব ওর বাবা-মাকে।


মনে তখন নানা রকম আশংকা কাজ করছে। ও কি বেঁচে আছে। একজন বললো, জেলখানায় খবর নিন। হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করে জেলে ভরা হয়েছে। সেখানে কীভাবে খোঁজ নেব? শেষ পর্যন্ত একটা সূত্র পাওয়া গেল। একজন লোক খবর দিল, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের চার খাতায় এই নামে একজন আছে। তিন দিন পর জেল গেটে গিয়ে দেখা পেলাম তার। এরপর ওর জামিনের জন্য কয়েকদিন আদালতে ছোটাছুটি। জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিল আরও দশদিন পর।


১৯৮৭র ১০ই নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক দিন। আমরা ছিলাম সেই ঐতিহাসিক দিনের সাক্ষী। ঘটনাচক্রে ৩৪ বছর পর আবার এই ঐতিহাসিক দিনেই মোয়াজ্জেমের সঙ্গে দেখা চট্টগ্রামে। ও এখন লণ্ডনে বিবিসির সাংবাদিক। বহুদিন পর সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে কিছু অন্তরঙ্গ সময় কাটলো দুজনের।


(শাহজাদা মহিউদ্দিনের ফেসবুক থেকে, সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম দক্ষিণ আওয়ামী লীগ)


বিবার্তা/আবদাল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com