যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি প্রতিরোধে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৮:৩২
যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি প্রতিরোধে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
কুবি প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

'নারীর কথা শুনবে বিশ্ব, কমলা রঙ্গে নতুন দৃশ্য'। নারীরা আজ আর পিছিয়ে নেই। সামনে এগিয়ে নিয়েছে তাদের দৃঢ় মনোবল আর প্রতিবাদী মনোভাব। রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায় অষ্টদশ শতকে সতীদাহ প্রথা লোপ না পেলে আজ অবধি কতশত নারীরা জ্বলন্ত আগুনে আত্মাহুতি দিতে হত।


আবার প্রাচীন আরবে মেয়েদের জীবন্ত কবর দেয়ার মত প্রথা রদ না হলে পৃথিবী এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে রূপায়িত হত। তবে তা আজ ইতিহাস। সমাজ বদলেছে। নারীরা হয়ে উঠেছে সমাজের কর্ণধার। পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারী। দেশের স্পিকার নারী। শিক্ষামন্ত্রী নারী। এমন শত প্রভাবশালীদের তালিকায়ও নারীরা মাথা উচু করে স্থান করে নিয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে প্রজন্ম সমতার বাস্তব চিত্র। তবুও কি নারীরা পূর্ণ স্বাধীন? আজও কি নারীরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যুবক দলের কালো হাত থেকে মুক্ত? কিংবা শ্রেণি শিক্ষকের মমতাময়ী হাত কি কখনও ধর্ষকের ভয়ংকর রূপ দেখায়? এ সকল প্রশ্নের উত্তর উঠে আসে দেশের দৈনিক পত্রিকাগুলোর সমস্ত পাতা জুড়ে। কোথাও প্রাথমিকের ছোট্ট শিশু, কোথাও বাড়ির গৃহকর্মী, কোথাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা ছাত্রী।


বড় বড় শিরোনামে এসব খবর প্রকাশিত হলেও তার প্রতিকার হচ্ছে কিংবা হচ্ছে না সে খবর আবার আমাদের মনের অজান্তেই হারিয়ে যায়। কিংবা জীবন ব্যাস্ততায় আমরা তা তলিয়ে দেখার সময় পাই না।


এমন প্রেক্ষাপটে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠার এক যুগের মাথায়ও ছিল না কোন দৃশ্যমান উদ্যোগ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ৬ষ্ঠ উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পর তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রথমে একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সালে ইউএন উইমেনের কর্তৃক একটি টেকনিক্যাল কমিটির অনুমোদন দিয়ে নারীদের প্রতি যৌন নিপীড়ন এবং হয়রানির বিরুদ্ধে শক্ত ভূমিকা রাখেন। যে কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস এবং কো-চেয়ারম্যান ইউএন উইমেন এর প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট মিসেস গিউলিয়া পিলুসি। তারা যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি প্রতিরোধে নানান কর্মসূচি পালন করছেন।


কর্মশালা ও কমিটি গঠন


কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ’ বিষয়ক কর্মশালা করা হয়েছিল। ইউএন-উইমেন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে ৩০ সেপ্টেম্বর সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের ভার্চুয়াল রুমে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় ইউএন-উইমেনের প্রতিনিধিরা ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ’বিষয়ক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। কর্মশালা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধকল্পে’তিনটি কমিটি ঘোষণা করা হয়।



বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এমরান কবির চৌধুরীকে চেয়ারম্যান, ইউএন-উইমেনের প্রতিনিধি শুকো ইশাকাওয়াকে কো-চেয়রম্যান, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহেরকে সদস্য সচিব এবং বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কামরুন নাহারকে সদস্য করে উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়।


লোক প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌসকে চেয়ারম্যান এবং ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. তাসনিমা আক্তারকে ফোকাল পয়েন্ট করে ৯ সদস্য বিশিষ্ট টেকনিক্যাল কমিটি করা হয়। ৯ সদস্য বিশিষ্ট এই টেকনিক্যাল কমিটিতে অন্যান্য সদস্য হিসাবে আছেন নরী পক্ষের প্রোগরাম ম্যানেজার রওসন আরা, ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক মানতাশা তাবাসসুম, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের প্রভাষক ফাহাদ জিয়া, প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিশাত আনজুম, ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারজানা ইসলাম ,কাউসার আহমেদ বান্না।


অন্য একটি কমিটিতে বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কামরুন নাহারকে আহ্বায়ক এবং ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক মানতাশা তাবাসসুমকে সদস্য সচিব করে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধকল্পে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি ‘অভিযোগ কমিটি’ গঠন করা হয়।


সেমিনার ও হেয়ার মি টু কর্মসূচি


যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে 'নারীর কথা শুনবে বিশ্ব,কমলা রঙ্গে নতুন দৃশ্য' শিরোনামে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।


কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউএন উইমেন বাংলাদেশ এবং বাংলা কমিউনিকেশন্স লিমিটেড এর যৌথ আয়োজনে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সারা দিনব্যাপি “Orange the World: #HereMeToo” শীর্ষক এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঁঠালতলায় (৯ ডিসেম্বর) সকালে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।



এর আগে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল সড়ক প্রদক্ষিণ করা হয়। নারী সহিংসতা রোধে এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়" নারীর কথা শুনবে বিশ্ব, কমলা রঙ্গে নতুন দৃশ্য"।


কর্মসূচিতে ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি সালমা আহমেদ এর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. মোঃ আবু তাহের, শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এন.এম. রবিউল আওয়াল চৌধুরী, প্রক্টর ড. কাজী মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন, শাখা ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। দুটি পর্বের কর্মসূচিতে প্রথম পর্বে অনুষ্ঠিত হয় সেমিনার ও খেলাধুলা এবং দ্বিতীয় পর্বে থাকবে নারী সচেতনতা মূলক নাট্য উৎসব।


প্রথম পর্বের আলোচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিরা নারীকে পুরুষের সমকক্ষ অর্জন করে সহিংসতা রোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ ছাড়া ও সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর নারী সহিংসতা অনেকটাই কমবে বলে মত প্রকাশ করেন। আলোচনা শেষে ভলিবল খেলার আয়োজন করা হয় এবং খেলায় নারী পুরুষ একসাথে অংশগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় পর্বে নারী-নিপীড়ন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা নিয়ে পরিবেশিত হবে থিয়েটার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার, জলসিঁড়ি থিয়েটার এবং আমরা মুক্তমঞ্চ এর পরিবেশনায় পৃথক চারটি মঞ্চনাটক।



যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ সেল


বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের এক ছাত্রীকে প্রকাশ্যে টাকার বিনিময়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ আমলে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সম্পর্কিত বিচারালয় যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধকল্পে ‘অভিযোগ কমিটি’ (যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ সেল) পুনর্গঠন করা হয়েছে। এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর বরাবর এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগ প্রদানের ১৬ দিন পর সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে এ সেল পুনর্গঠন করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (চলতি দায়িত্ব) ড. মো. আবু তাহের। ইতোপূর্বে বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার আগে এই সেলটি নামমাত্র থাকলেও কার্যত ছিল অচল। নবগঠিত এই সেলের পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে রয়েছেন- রেজিস্ট্রার, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (আহ্বায়ক); প্রভোস্ট, নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হল, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (সদস্য); দিলনাশিঁ মোহসেন, প্রধান নির্বাহী, দুঃস্থ মা ও শিশু কল্যাণ ফাউন্ডেশন, কুমিল্লা (সদস্য); পাপড়ী বসু, সভাপতি, নারী দীপিতা, কুমিল্লা (সদস্য) ও প্রক্টর, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (সদস্য-সচিব)।


ক্যাম্পেইন


বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউএন উইমেনের উদ্যোগে দিনব্যাপী নারী উদ্যোক্তা মেলা, প্রদর্শনী বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং খেলাধুলার মাধ্যমে প্রজন্ম সমতা বিষয়ক ক্যাম্পেইন করা হয়েছিল। (১৫ ডিসেম্বর) রবিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে আলোচনা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী এ ক্যাম্পেইনের শুরু হয়। নৃবিজ্ঞান বিভাগের রিকি, ইংরেজি বিভাগের আনিকা তাহসীন রাফা এবং ইউএন উইমেনের নুবাইরার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী। আরও উপস্থিত ছিলেন- ইউএন উইমেনের প্রোগ্রাম স্পেশালিষ্ট জুয়েলিয়া প্যালোসি, নারীপক্ষের সমন্বয়ক তামান্না খান, অস্ট্রেলিয়ার আইনজীবী ভিক্টোরিয়া, ইউএন উইমেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন বিষয়ক টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান জান্নাতুল ফেরদৌস, ফোকাল পয়েন্ট ড. তাসনিমা আক্তার, ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক মানতাশা তাবাসসুম এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা নুসরাত জাহান।


অভিযোগ বাক্স গঠন


এছাড়াও গঠিত অভিযোগ কমিটি নারী শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সহোযোগিতা প্রদানের লক্ষ্যে প্রশাসনিক ভবনের নিচে একটি অভিযোগ বাক্স স্থাপন করেন। যেখানে নির্দ্বিধায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট যে কোন নারী অভিযোগ করতে পারেন।



অভিনব এসব কার্যক্রমকে স্বাগত জানায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং শিক্ষক শিক্ষার্থীরা। সক্রিয়তার প্রশংসা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনে প্রকাশিত সুভেনিয়রে কার্যক্রমের ছবি প্রকাশ করা হয়। এছাড়াও এসব কার্যক্রম দেশের জাতীয় দৈনিক, আঞ্চলিক ও অনলাইন পোর্টালে গুরুত্বসহকরে স্থান পায়। সর্বোপরি যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে এই কার্যক্রমকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে টেকনিক্যাল কমিটি। এছাড়াও এ কমিটির ২০২২ সালের মধ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে জোর প্রচেষ্টা চলিয়ে যাচ্ছে এবং নারীর প্রতি সকল প্রকার নিপীড়ন বন্ধ করতে তারা বদ্ধপরিকর।


বিবার্তা/জাই

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com