সুপার শপ : দেশে ও বিদেশে
প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৮, ২০:৪২
সুপার শপ : দেশে ও বিদেশে
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলাদেশে আসার পর থেকে মানুষের মুখে মুখে দেশের বড় বড় সুপারশপের কথা শুনেছি। কিন্তু কেন যেন এসব সুপার শপে যাওয়ার আগ্রহ কখনো হয়নি। যদিও আসা-যাওয়ার পথে কয়েকটি সুসজ্জিত শপ চোখে পড়ে, তারপরেও।


কিছুদিন আগে অনেকটা কৌতুহলবশত একটি নামকরা সুপারশপে গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য যতটুক না শপিং, তার চেয়ে বেশি শপ দর্শন। শপটিকে বাইরে থেকে যেমন দৃষ্টিনন্দন ও সজ্জিত মনে হয়েছিল, ভেতরে ঢোকার পর তেমনটা মনে হয়নি। নামে সুপারশপ হলেও দোকানের সাইজ মোটেও ‘সুপার’ নয়। অনেকটা বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মতো। শপটিতে নেই কোনো ট্রলি ও পার্কিং সুবিধা।


একটি বিদেশী অলিভ অয়েলের টিনের কৌটা হাতে নিয়ে দেখি সুপার শপের লোগোতে দাম ১৮০ টাকা। একটু নাড়াচড়া করতেই কৌটার নিচে বাংলাদেশী আমদানীকারকের লোগোতে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য দেয়া আছে ১৫৫ টাকা। অর্থাৎ এরা ২৫ টাকা বেশি নিচ্ছে!


সুপারশপে ঘুরতে ঘুরতে আর কিছু পণ্যের দামেও গরমিল চোখে পড়ল। একটি বিদেশী বডি স্প্রের মূল্য দেয়া আছে ৩৪০ টাকা, অথচ বাইরের দোকানগুলোতে এর দাম ২৬০-২৮০ টাকার মধ্যে। কাঁচা শাক-সব্জি, মাছ-মাংসের দামও তুলনামূলকভাবে বেশি মনে হল।


বিশ-পঁচিশ মিনিট ঘোরাঘুরির পর কেনাকাটা না করেই বাইরে চলে আসি। ফেরার পথে অনেকটা কৌতুহলবশত গলির মুখের পরিচিত এক মুদি দোকানে সুপার শপে দেখা একই অলিভ অয়েলের দাম জানতে চাইলে দোকানী জানালেন, ১৫০ টাকা। দরদাম করতেই দাম নেমে এল ১৩০ টাকায়! দোকানি বললেন, আপনি পরিচিত মানুষ তাই স্পেশাল ডিসকাউন্ট!


তাহলে সুপারশপটি একটি অলিভ অয়েলের কৌটায় ক্রেতাদের পকেট কেটে ৫০ টাকা বেশি নিচ্ছে? বাড়তি হিসাবে আছে মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট!) ঝামেলা। যদিও সাইনবোর্ডে সুপার শপটির স্লোগান লেখা ছিল ‘ন্যায্য মূল্যে শ্রেষ্ঠ পণ্য’। এই হলো ন্যায্য মূল্য!


এবার বলি বিদেশের অভিজ্ঞতা। মনে আছে লন্ডনে যাওয়ার দুই-তিনদিন পর আমার এক আত্মীয়ের সাথে টেস্কো (tesco) সুপারস্টোরে গিয়েছিলাম। দেখে তো চোখ ছানাবড়া। বি-শা-ল বড় শপ। একটি শপ এতো বড় হতে পারে, না দেখলে হয়ত কখনো কল্পনায়ও আসত না। সুপারস্টোরের সামনে বিশাল বড় কার পার্ক, এক সাথে এক-দেড় হাজার গাড়ি অনায়াসে পার্কিং করা যায়। শপের ভেতরে মানুষের প্রয়োজনীয় এমন কোনো আইটেম নেই যা থাকে না। শুধু মানুষ কেন? পশুপাখির খাদ্য থেকে শুরু করে বাড়ি, গাড়ি, গাছপালার প্রয়োজনীয় সব উপাদান, কিছুই বাদ যায় না এসব সুপারশপে।



শেলফে থরে থরে সাজানো আছে হাজার হাজার আইটেম। শপটির একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত দেখা যায় না। ক্রেতারা যাতে প্রয়োজনীয় সব আইটেম সহজে পেতে পারে সেজন্য আছে সদাহাস্যোজ্বল সেলসম্যান। এক সাথে শত শত মানুষ এসব সুপারস্টোরে অনায়াসে শপিং করতে পারে। পেমেন্টের সময় ক্রেতাদের যাতে অপেক্ষা করতে না হয় সেজন্য আছে অন্তত ত্রিশ-পয়ত্রিশটি পেমেন্ট পয়েন্ট। ক্যাশ কাউন্টারে কাজ করা কর্মীরা খুবই দক্ষ, স্মার্ট, হেল্পফুল, ভদ্র।


বেশিরভাগ সুপারস্টোরই ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। সুপারস্টোরগুলো এত কম্পিটেটিভ্ যে, তারা সর্বনিম্ন দামে সবচেয়ে ভালো পণ্যটি ক্রেতাদের কাছে সবার আগে পৌঁছে দিতে চায়। ফলে সাধারণ ক্রেতারা লাভবান হয়।


আমার সবচেয়ে অবাক লেগেছে সুপারস্টোরগুলোর পণ্যের দাম দেখে। সুপারশপ থেকে ক্রেতারা ছোট ছোট দোকানগুলোর চেয়ে অন্তত ১৫-২০% কম দামে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারে। উইকএন্ডে (শনি ও রবিবার) এসব সুপারস্টোরে প্রচন্ড ভীড় থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা এসে সপ্তাহের বাজার গাড়ি ভরে নিয়ে যায়। যাদের নিজস্ব গাড়ি নেই তাদের জন্য থাকে পাবলিক বাসের সুবিধা।


সুপারস্টোরগুলোতে পণ্যের গুণগত মানে কোনো ছাড় নাই। ভেজাল ও মেয়াদউত্তীর্ণ পণ্য এসব সুপারস্টোরে পাওয়া কল্পনাতীত। আর সব সময় কোনো না কোনো পণ্যের মূল্য ছাড় থাকে।



বাংলাদেশের ২০০৯ সালের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৪০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি কোনো আইন বা বিধির নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে কোনো পণ্য, ঔষধ বা সেবা বিক্রয় বা বিক্রয়ের প্রস্তাব করলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’


অতএব আইনগতভাবে বেশি দাম নেয়া এসব সুপারশপের মালিকরা দণ্ডিত হওয়ার কথা। অনেক সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত শুধু অর্থদণ্ড করেই দায়িত্ব শেষ করে। পণ্যের গায়ে যে দাম থাকে তা-ই একটি পণ্যের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য। তাই ভ্যাট হিসেবে আমাদের দেশে সুপার শপগুলো ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত যে টাকা নেয় তা আইনবহির্ভূত ও অনৈতিক। কারণ প্রত্যক্ষ কর ক্রেতা দেয় না, বিক্রেতাকেই দিতে হয়। যা পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃত। ইদানিং দামী খাবারের দোকানগুলোও ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করছে, যা অপরাধ।


সময়ের পরিক্রমায় সুপারশপের প্রয়োজনীয়তা আমাদের দেশে এখন অপরিহার্য। যে কোনো নতুন ব্যবসা/সেবার শুরুতে একটু বিশৃঙ্খল পরিবেশ থাকে। এজন্য বাংলাদেশে শুরু হওয়া সুপারশপের ক্ষেত্রেও তা হচ্ছে। আমার বিশ্বাস, অল্প কয়েক বছরের মধ্য সুপারশপগুলো আরো পেশাদারী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাস্টমার সার্ভিস দেবে। অনিয়মগুলো দূর হবে। এজন্য প্রয়োজন সরকারের সঠিক নীতিমালা ও নজরদারি। সুপার শপগুলোর মালিকদের আরো বেশি ক্রেতাবান্ধব মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। আইন করে মানুষকে ভাল করা যায় না। দরকার ব্যবসায়িক সততা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। সুপারশপের পরিধি যত বড় হবে মানুষের কর্মসংস্থানও পাল্লা দিয়ে বাড়বে। এতে বেকারত্ব কমবে। দেশের অর্থনীতিতে গতি আসবে।


কাওসার চৌধুরীর ব্লগ থেকে


বিবার্তা/হুমায়ুন/সোহান

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com