শিক্ষক জাকিয়া সুলতানা মুক্তা, একজন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর
প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২২, ১১:৩০
শিক্ষক জাকিয়া সুলতানা মুক্তা, একজন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

ছোটবেলায় আমি শান্ত প্রকৃতির ছিলাম। চুপচাপ চিন্তা করতে পছন্দ করতাম। যারাই একটু আলাদা চিন্তা করতেন, তাদের নিরবে অনুসরণ করতাম। তাই পরিবার-সমাজ-দেশের যেকোনো অন্যায়-অতাচার, নির্যাতন, শোষণ-বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা এসব বিষয়গুলো আমাকে খুব ভাবাতো। চোখের সামনে কোনো অন্যায় দেখলে মনের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হতো। একটা সময়ে এসে সব জায়গাতে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শুরু করি। পরিণত বয়সে দেশের সংকটকালে ও অসম্প্রদায়িকতার পক্ষে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছি। এখনও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধে অংশগ্রহণ করছি।


এভাবেই নিজের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) সহকারী অধ্যাপক ও বাংলা বিভাগের সভাপতি জাকিয়া সুলতানা মুক্তা।


ছোটবেলার ভাবনা ছিল বড় হয়ে দার্শনিক হবো। দেশ ও মানুষের কল্যাণে যৌক্তিক দর্শন ছড়িয়ে দিতে কাজ করবো। সবসময় চিন্তার জগতে বিচরণ করবো। লেখালেখি, গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত থাকবো। সময়ের পালা বদলে এই চাওয়া বদলে যায়। কারণ আমি যা করতে চাই এদেশের বাস্তবতায় তা করতে গেলে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তখন এমনটাই ছিলো আমার চিন্তা। এখানে আমার সব চিন্তার প্রতিফলন ঘটানোও সম্ভব। আজ আমার সে ভাবনা- চিন্তা বাস্তবে রূপ নেয়ার পথে। অনেকটা উচ্ছাসের সাথেই বললেন আত্মপ্রত্যয়ী মুক্তা।



কথা প্রসঙ্গে জানা গেলো, গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে হলেও জাকিয়া সুলতানা মুক্তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। বাবা প্রকাশক ও বই ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। তারা দুই ভাই এক বোন। তিনজনের মধ্যে সবার বড় মুক্তা। মেঝো ভাই পড়াশোনা শেষ করে একটা বেসরকারি রিসার্চ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। ছোট ভাই পড়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে। মুক্তা মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে মাধ্যমিক ও বিসিআইসি কলেজ, মিরপুর থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।


স্কুল-কলেজে পড়াশোনাই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। অন্য কোনো দিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়ার সুযোগ ছিলো না। মুক্তা বলেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে আমাকে নানান সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই পড়াশোনা করতে হয়েছে। তাই স্কুল-কলেজ জীবনে ছাত্র রাজনীতির সাথে তেমনভাবে যুক্ত হইনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আদর্শিকভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে বিভাগের বড় আপু-ভাইয়াদের সাথে রাজনীতির পাঠ নেওয়া শুরু হয়। তবে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হইনি। মাঝে মধ্যে রাজপথের বিভিন্ন আন্দোলন অংশগ্রহণ করেছি। বিশেষ করে আমাদের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছিলেন, সে আন্দোলন-সংগ্রামে অন্য আর সবার মতন আমিও আমার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে যুক্ত থেকেছি। তবে খুব বেশি সক্রিয় না হওয়ায় রাজনৈতিক সংগঠনের কোনো পদে ছিলাম না। তবে সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগঠন সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলাম। যেমন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, সংবৃতা আবৃত্তি চর্চা ও বিকাশ কেন্দ্র, বিএনসিসি, আধুনিক ভাষা ইনিস্টিউটের ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম (জার্মান ও জাপানিজ ভাষা) ইত্যাদি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুনামের সাথে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছি। যদিও নানান প্রতিকূল পরিবেশের জন্য পড়াশোনাতেই বেশি মনোযোগ দিয়েছি।


পরিবারে বাবা একমাত্র উপার্জনক্ষম হওয়ায় পড়াশোনা করা অবস্থাতেই নিজের দায়িত্বের কিছুটা ভার নিজেকেই নিতে হয়েছিলো মুক্তাকে। তাইতো স্নাতক সম্পন্ন করার পরপরই ব্রিটিশ কাউন্সিলের ইন্টার্ন হিসেবে চাকরিতে যোগদান করতে হয়। পরে স্নাতকোত্তরে আরো ভালো ফলাফলের জন্য পরীক্ষার আগে স্বেচ্ছায় চাকরিটা ছেড়ে দিতে হয়। স্নাতকোত্তর শেষ । হঠাৎ বাবার ব্যবসায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে। এবার শুধু নিজের নয়, পরিবারের দায়িত্বও তার কাঁধে এসে পরে। একদিকে মনের মধ্যে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন, অন্যদিকে জীবন বাস্তবতা।