কৃষকের হাতেই গড়া কলেজ, যেখানে শিক্ষা মানেই উদ্যোক্তা হওয়ার পাঠ
সানোয়ারের ব্যতিক্রমী উদ্যোগে মহিষমারা কলেজে বইয়ের পাশাপাশি হাতে-কলমে কৃষিশিক্ষা
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬, ২৩:২০
কৃষকের হাতেই গড়া কলেজ, যেখানে শিক্ষা মানেই উদ্যোক্তা হওয়ার পাঠ
ইমরুল হাসান বাবু (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
প্রিন্ট অঅ-অ+

প্রত্যন্ত গ্রামের একজন কৃষক। একসময় নিজের পড়াশোনার জন্য পাড়ি দিতে হতো দূর-দূরান্তে। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি চাকরির পেছনে না ছুটে বেছে নেন কৃষিকে। আর সেই কৃষিকাজ থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন নিজের স্বপ্ন। শুধু নিজে সফল হওয়াই নয়, গ্রামের মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে প্রতিষ্ঠা করেন একটি কলেজ। তাঁর স্বপ্ন শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরিপ্রার্থী হবে না, বরং নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।


তিনি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার মহিষমারা গ্রামের কৃষক মো. সানোয়ার হোসেন। কৃষিতে সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি তাঁর উদ্যোগে গড়ে উঠেছে মহিষমারা কলেজ। সবুজে ঘেরা প্রায় পাঁচ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ কলেজে প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কৃষিশিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। কলেজ ক্যাম্পাসই যেন হয়ে উঠেছে একটি জীবন্ত কৃষিশিক্ষা কেন্দ্র।


সানোয়ার হোসেন তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে একমাত্র ভাই।
১৯৯৩ সালে মধুপুর কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন তিনি। পড়াশোনা শেষ করেই কৃষিকাজে মনোনিবেশ করেন। বাবার কাছ থেকে পাওয়া কিছু জমিতে শুরু হয় তাঁর কৃষিযাত্রা। পরে আশপাশের মানুষের জমি লিজ নিয়ে ধীরে ধীরে খামার সম্প্রসারণ করেন। কঠোর পরিশ্রম, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ ও কৃষির প্রতি ভালোবাসায় একসময় তিনি হয়ে ওঠেন সফল কৃষক ও উদ্যোক্তা।


কৃষিতে সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর মনে সবসময়ই কাজ করত নিজ গ্রামের শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষা। নিজের ছাত্রজীবনের কষ্টের স্মৃতি তাঁকে বারবার তাড়িত করত। সেই ভাবনা থেকেই নিজ গ্রামের নাম অনুসারে প্রতিষ্ঠা করেন মহিষমারা কলেজ।


বর্তমানে কলেজটিতে প্রায় ৩'শ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কৃষিকাজে সম্পৃক্ত করা। কলেজের চারপাশে রয়েছে বিভিন্ন মৌসুমি সবজির ক্ষেত, আদা, হলুদ,কচু, বিভিন্ন জাতের আনারস, ড্রাগন ফল, বিদেশি কফি ও নানা ধরনের বনজ গাছের সমাহার।


শিক্ষার্থীদের শুধু ফসল ফলানো দেখানো হয় না; মাটি প্রস্তুত করা, বীজ বপন, চারা তৈরি ও রোপণ, পরিচর্যা এবং ফসল সংগ্রহ কৃষির পুরো প্রক্রিয়াই হাতে-কলমে শেখানো হয়। পাশাপাশি মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি পালন, গবাদিপশু পালন এবং জৈব সার উৎপাদনের বিষয়েও ব্যবহারিক ধারণা দেওয়া হয়। কলেজে রয়েছে কৃষি উন্মুক্ত লাইব্রেরি। কৃষি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও পরিবেশবিষয়ক বই সেখানে সংরক্ষিত আছে। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য রয়েছে খেলার মাঠ। একই ক্যাম্পাসে চলছে কৃষি গবেষণা, চারা উৎপাদন ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমও।


শিক্ষার্থীদের বাড়িতেও কৃষির চর্চা ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন ধরনের সবজির বীজ ও চারা বিতরণ করা হয়। তাদের নিজ বাড়ির আঙিনায় সবজি উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া হয়। মাসে একবার শিক্ষার্থীদের উৎপাদিত সবজি দিয়ে পুষ্টিকর সবজি খিচুড়ি রান্না করে খাওয়ানোর উদ্যোগও রয়েছে।


মহিষমারা গ্রামের শিক্ষার্থী শহিদুল ইসলাম বলেন,একসময় সানোয়ার হোসেনের প্রতিষ্ঠিত কলেজে পড়াশোনা করেছি। কলেজের কৃষি খামার ও হাতে-কলমে শিক্ষা আমাকে কৃষির প্রতি আগ্রহী করে তোলে। শুরুতে মাঠে কাজ করতে অনীহা থাকলেও ধীরে ধীরে কৃষির প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। এখন আমি নিজেই কৃষিকাজ ও বিভিন্ন ধরনের উদ্যোক্তা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।


তিনি জানান, মৌসুমি সবজি নিরাপদভাবে উৎপাদনের পাশাপাশি বিভিন্ন ফসল চাষ করছেন। জৈব সার তৈরির জন্য গরু পালন, ডিম ও মাংসের চাহিদা পূরণে হাঁস-মুরগি পালন এবং পুকুরে একই সঙ্গে হাঁস ও মাছ চাষ করছেন। বাড়ির পাশে গড়ে তুলেছেন গবাদিপশুর খামারও।


স্থানীয় বাসিন্দা হুরমুজ আলী বলেন, আমার ছেলে-মেয়ে এই কলেজে পড়েনি। তবে কলেজে যাতায়াতের সুবাদে সেখানকার কৃষিকাজ দেখেছি। পরে সেই ধারণা কাজে লাগিয়ে বাড়ির আঙিনায় সবজি, পেয়ারা ও পেঁপে চাষ শুরু করেছি। এতে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা অনেকটাই পূরণ হচ্ছে।


মহিষমারা গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, সানোয়ার হোসেন যদি পড়াশোনা শেষ করে শুধু চাকরির পেছনে ছুটতেন, তাহলে আমাদের গ্রামে আজ এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠত না। তিনি নিজে কৃষক পরিবারের সন্তান হয়েও কৃষিকে পেশা হিসেবে নিয়ে সফল হয়েছেন। তাঁর উদ্যোগ এখন আমাদের গ্রামের জন্য উদাহরণ।


স্থানীয় সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের চাকরিনির্ভর করে তোলে। অথচ শিক্ষা হওয়া উচিত জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার মাধ্যম। মহিষমারা কলেজ সেই জায়গায় ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।


স্থানীয় যুবক আব্দুল কাদেরের মতে, কলেজটি এলাকায় কৃষিভিত্তিক শিক্ষা ও উদ্যোক্তা তৈরির নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ইতোমধ্যে কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।


কলেজটির শিক্ষার্থী রুবেল বলেন, কৃষিভিত্তিক শিক্ষা আমাদের নতুন সম্ভাবনার পথ দেখিয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে আমরাও উদ্যোক্তা হতে চাই এবং অন্যদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে চাই।


কৃষক হিসেবে সানোয়ার হোসেন এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পুরস্কারসহ বেশ কিছু জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন। কৃষিতে সফলতার পরও তিনি থেমে থাকেননি। বরং নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।


সানোয়ার হোসেন বিবার্তাকে বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে অনেক সময় চাকরির দিকে ঠেলে দেয়। একজন শিক্ষিত মানুষ অন্যের অধীনে চাকরি করাকেই সফলতা মনে করে। কিন্তু মানুষের ভেতরে যে সুপ্ত প্রতিভা ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার ক্ষমতা রয়েছে, সেটি বিকশিত করা দরকার। সেই চিন্তা থেকেই আমি কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেছি।


তিনি বলেন,আমার লক্ষ্য শুধু শিক্ষিত মানুষ তৈরি করা নয়, এমন মানুষ তৈরি করা, যারা নিজেরাই কিছু করতে পারবে, অন্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে। কৃষিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কৃষি করেও সফল হওয়া যায় আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।


সানোয়ার আরও বলেন,একসময় আমার কৃষিকাজ নিয়ে অনেকে উপহাস করতেন। তারা ভাবতেন, এত পড়াশোনা করে কৃষিকাজ কেন করছি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম কৃষিতেই বড় সম্ভাবনা আছে। আজ তাদের দেখিয়ে দিতে পেরেছি সফল মানুষও কৃষি করতে পারে এবং কৃষিকাজ করেও সম্মানের সঙ্গে উদ্যোক্তা হওয়া যায়।


টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো.শোয়েব মাহমুদ বলেন,মধুপুরের সানোয়ার হোসেন অন্যতম একজন উদ্যোক্তা কৃষক। কৃষি বিভাগ থেকে তাকে কফি প্রদর্শনী, আনারস প্রণোদনাসহ বিভিন্ন সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তিনি নিরাপদ আনারস উৎপাদন নিয়েও কাজ করছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কলেজের শিক্ষার্থীদের তিনি হাতে-কলমে কৃষিকাজ শেখাচ্ছেন। তাঁকে দেখে অনেকেই বাণিজ্যিক কৃষিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।


সরেজমিনে দেখা যায়, মহিষমারা কলেজের পুরো পরিবেশই যেন শিক্ষার্থীদের কৃষির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য সাজানো। একদিকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, অন্যদিকে মাঠে কৃষিশিক্ষা। কোথাও সবজির ক্ষেত, কোথাও আনারস ও ড্রাগন ফলের বাগান, আবার কোথাও কফি ও বনজ গাছ। শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধভাবে নির্ধারিত রুটিন অনুযায়ী মাঠে কাজ করছে।


স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মহিষমারা কলেজের এই মডেল দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়ুক। তাদের মতে, বইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি হাতে-কলমে কর্মমুখী শিক্ষা দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করে শুধু চাকরির অপেক্ষায় থাকবে না, নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে।


প্রত্যন্ত গ্রামের একজন কৃষকের ব্যক্তিগত স্বপ্ন থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজ একটি বৃহত্তর সামাজিক স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সানোয়ার হোসেনের বিশ্বাস তরুণদের হাতে যদি জ্ঞান, প্রযুক্তি ও কাজের সুযোগ তুলে দেওয়া যায়, তাহলে কৃষিই হতে পারে আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। আর মহিষমারা কলেজ সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নেরই এক ব্যতিক্রমী প্রয়াস।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com