নিলাম ছাড়াই সরকারি ভবন বিক্রি, টাকা দিতে হয়েছে শিক্ষা অফিসেও!
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৫৯
নিলাম ছাড়াই সরকারি ভবন বিক্রি, টাকা দিতে হয়েছে শিক্ষা অফিসেও!
বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি
প্রিন্ট অঅ-অ+

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার রাখালতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক কক্ষ বিশিষ্ট শিক্ষকদের একটি পুরাতন লাইব্রেরি ভবন নিলাম ছাড়াই বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। তবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বলছেন রেজুলেশন করে বিক্রি করা হয়েছে।


এদিকে ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে বিদ্যালয়ে মেরামতের জন্য আসা ২ লাখ টাকার জিনিসপত্র কেনার কোন ভাউচার নেই বলে জানান প্রধান শিক্ষিকা। সেগুলো নাকি রেজুলেশন করে খরচ করা হয়েছে। একটি ভাউচারে দেখা যায় ৫২ হাজার ৭শ ৫ টাকা মালামাল কিনা হয়েছে। রেজুলেশন ওইসব ক্রয়ের খরচ দেখানো হয়েছে ৭২ হাজার ৫শ টাকা।


বিদ্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের লাইব্রেরি ওয়াল করা টিনশেড একটি কক্ষ নিলাম ছাড়াই রেজুলেশন করে ১৯ হাজার ১৫০ টাকা বিক্রি করা হয়। ওই কক্ষ ভাঙেতে শ্রমিক বাবদ খরচ দেখানো হয় ১২ হাজার ৭৫০ টাকা।


স্থানীয়রা জানান, ওই কক্ষটিতে ১১ থেকে ১২ হাজার ইট ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়া লোহার অ্যাঙ্গেল ও টিন রয়েছে। তখন লাইব্রেরিটির বাজার মূল্য ছিল লক্ষাধিক টাকা।


২০২৩-২৪ অর্থ বছরে বিদ্যালয়টির মেরামতের জন্য ২ লাখ টাকা সরকারি বরাদ্দ দেয়া হয়। ভ্যাট বাদে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা উত্তোলন করেন প্রধান শিক্ষিকা।


বোয়ালমারী বাজারের মেসার্স কুন্ডু স্টোর থেকে ২০২৪ সালের ২০ মার্চ ৫২ হাজার ৭শ ৫ টাকার রংসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ক্রয় করা হয়। ভাউচারে এই টাকা উল্লেখ থাকলেও রেজুলেশনে ৭২ হাজার ৫০০ টাকা কেনার খরচ উঠানো হয়।


স্কুলের পাশে গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আসমা বেগম (২৭) বলেন, তার ছেলে হুসাইন (৮) ও মেয়ে সোহনা (৬) ওই স্কুলে পড়তো। দুষ্টুমি করার কারণে প্রধান শিক্ষিকা আমাদের কাছে নালিশ করতো। বাচ্চাদের স্কুল থেকে নিয়ে যেতে বলতো। পরে বাধ্য হয়ে গত বছর আমার বাচ্চা দু’টিকে স্কুল থেকে নিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি করেছি। মাদ্রাসা থেকে ফেরার পথে রাস্তার পাশে থাকা গাছের গুড়ির আঘাতে হুসাইন মারা যায়। চলতি বছরের প্রথম দিকে মেয়েটিকে স্কুলে ভর্তি করতে গেলে প্রধান শিক্ষিকা বলেন, গুচ্ছগ্রামের বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করা যাবে না। ভর্তি হলে বই পাবে না, খাবার পাবে না। বর্তমানে আমার মেয়েটির পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে। সে বাড়িতেই থাকে।


গুচ্ছগ্রামের রিক্তা বেগম (২৫) বলেন, তার ছেলে আজিম মোল্যাকে (৮) স্কুলে ভর্তি করতে গেলে প্রধান শিক্ষিকা বলেন, গুচ্ছগ্রামের কোন বাচ্চাকে এই স্কুলে ভর্তি করা যাবে না। পরে পাশের আলফাডাঙ্গা উপজেলার বারাংকুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আমার বাচ্চাকে ভর্তি করি।


বিদ্যালয় সাবেক সহকারী শিক্ষক আবুল বাশার ও নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও ২জন সহকারী শিক্ষক বলেন, প্রধান শিক্ষক সকলের সাথে খারাপ আচরণ করেন। শিশু ক্লাসে কেউ ভর্তি হতে আসলে সে বলে ভর্তি হলে বই পাবে না, খাবার পাবে না। যার কারণে শিশু ক্লাসে মাত্র ৬ জন শিক্ষার্থী। এ ছাড়াও মানসিকভাবে টর্চার করে শিক্ষকদের।


বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা সারমিন জাহানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিদ্যালের ভবন টেন্ডার দেওয়া হয়নি। রেজুলেশন করে ২০১৮ সালে ১৯ হাজার ১শ ৫০ টাকা বিক্রি করেছিলাম।


নিলাম ছাড়া সরকারি ভবন কীভাবে বিক্রি করলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্কুলের চার পাশে বাউন্ডারি হচ্ছিল, এজন্য তাড়াহুড়া করে রেজিলেশন করে বিক্রি করেছিলাম।


মাইনার মেরামতের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দের খরচের বিষয় তিনি বলেন, ২ লাখ টাকার ভ্যাট বাদ দিয়ে পেয়েছি ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে উপজেলা শিক্ষা অফিসে দিয়েছি ২০ হাজার টাকা। মেরামতে আসা টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা শিক্ষা অফিসে সব স্কুল থেকে দেয়া লাগে।


রং, বালু, সিমেন্ট, টাইলস, লিবার খরচ করে আরও ৫ হাজার টাকার মতো দেনা হয়েছি। ওই ৫ হাজার টাকা পরের বরাদ্দ থেকে সমন্বয় করা হয়েছে।


জিনিসপত্র ও লিবার খরচের ভাউচারের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, খরচের কোন ভাউচার নেই। খরচের অর্থ রেজুলেশনের খাতায় লিখে রেখেছি। ওই রেজুলেশনের খাতা ফটোকপি করে শিক্ষা অফিসে জমা দিয়েছি। অন্যান্য সকল অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।


প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, নিলাম ছাড়া ভবন বিক্রি ও বরাদ্দে আসা ২ লাখ টাকার হিসাব নয়-ছয়সহ নানা অভিযোগ শুনেছি। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বরাদ্দে আসা টাকা শিক্ষা অফিসে দেওয়ার কোন নিয়ম নেই। শিশু ক্লাসের ভর্তির বিষয়টিও খতিয়ে দেখবো।


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম রকিবুল হাসান বলেন, নিলাম ছাড়া ভবন বিক্রি ও মেরামতের বরাদ্দের টাকার বিষয়টি খোঁজ খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


বিবার্তা/মিলু/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com