
টাঙ্গাইলের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের সাঁকো ও কাদায় ডোবা কাঁচা সড়ক দিয়ে বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন অন্তত ৯ গ্রামের মানুষ। বর্ষা এলেই দুর্ভোগ চরমে ওঠে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগী ও ব্যবসায়ীদের। নড়বড়ে কাঠের সাঁকো পার হতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকতে হয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা পাকাকরণ ও স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই কাঁচা রাস্তাগুলো কাদায় পরিণত হয় এবং যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে মানুষ পায়ে হেঁটে কিংবা ঝুঁকি নিয়ে কাঠের সাঁকো পার হয়ে প্রয়োজনীয় কাজে যাতায়াত করেন।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত এলাকায় কাটারজানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাটারজানী উচ্চ বিদ্যালয় ও কাটারজানী বাজার অবস্থিত। এসব স্থানে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান সংযোগ সড়ক এখনো কাঁচা। লালমাটির রাস্তাটি সামান্য বৃষ্টিতেই পিচ্ছিল ও কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের চলাচলের পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহনেও চরম ভোগান্তি তৈরি হয়।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, জালাবাদা থেকে কাটারজানী বাজার পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার কাঁচা সড়কের মাঝখানে দোয়ারিয়া এলাকায় রয়েছে একটি কাঠের সাঁকো। স্থানীয়দের নিজস্ব অর্থায়ন ও স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত সাঁকোটি দীর্ঘদিনের পুরোনো হওয়ায় এখন নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন এই সাঁকোর ওপর দিয়ে শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চলাচল করেন।
কাটারজানী, পূর্ব কাটারজানী, পোনামারী, কেজাই, নয়াপাড়া, বন্দরিয়া, কাকড়াগুনি, সাধুপাড়া, জালাবাদা ও বেধুরিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন। বর্ষাকালে কাদা ও পানি জমে যাওয়ায় এসব এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
দোয়ারিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের সাঁকো পেরিয়েই প্রতিদিন কাটারজানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাটারজানী উচ্চ বিদ্যালয়ে যেতে হয় অনেক শিক্ষার্থীকে। সাঁকোটি পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করে।
শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা জানান, নড়বড়ে সাঁকো থেকে পড়ে কিংবা কাদামাটির রাস্তায় পিছলে গিয়ে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর পরও তাই দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হক বলেন, কাটারজানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র রয়েছে। নির্বাচনের সময় যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতে রাস্তা সাময়িকভাবে সংস্কার করা হলেও নির্বাচন শেষ হলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শুধু দোয়ারিয়ার কাঠের সাঁকোই নয়, কাটারজানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পোনামারী হয়ে ভাঙ্গুনী বাজার পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এবং হরিণধরা বাজার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার সড়কের বড় অংশই কাঁচা ও কর্দমাক্ত। বর্ষায় এসব সড়কে চলাচল করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, কাঁচা ও কর্দমাক্ত সড়কের কারণে কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে তাদের অতিরিক্ত পরিবহন খরচ গুনতে হয়। বর্ষাকালে অনেক সময় যানবাহন চলাচল করতে না পারায় উৎপাদিত পণ্য সময়মতো বাজারে নেওয়া সম্ভব হয় না। এতে কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যায়।
শোলাকুড়ী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি রাজ মাহমুদ বগা বলেন, কাটারজানী এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। কাঁচা রাস্তা ও জরাজীর্ণ সাঁকোর কারণে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে পারেন না। জালাবাদা-কাটারজানী বাজার সড়ক এবং পোনামারী-ভাঙ্গুনী বাজার হয়ে হরিণধরা বাজার পর্যন্ত সড়ক পাকাকরণসহ দোয়ারিয়ায় একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।
কাটারজানীর প্রবীণ বাসিন্দা আনিস মিয়া বলেন, একটি পাকা রাস্তা ও একটি ব্রিজের জন্য যুগ যুগ ধরে কষ্ট করছি। একটু বৃষ্টি হলেই আমরা প্রায় গৃহবন্দী হয়ে পড়ি। আমাদের এই কষ্টের যেন কোনো শেষ নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা ফরিদ মিয়া বলেন,পাকা রাস্তা না থাকায় আমরা অনেক আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় সন্তানদের স্কুলে যেতে দেখে। প্রতিদিন ভয় হয়, কখন সাঁকো থেকে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে।
দোয়ারিয়া গ্রামের হরমুজ আলী বলেন, সাঁকোটি যে কোনো সময় ভেঙে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত এখানে স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণ করা না হলে যেকোনো সময় প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।
কাটারজানী বাজারের চা বিক্রেতা ইন্নছ আলী বলেন,নির্বাচনের সময় গাড়ি চলাচলের জন্য রাস্তা সাময়িকভাবে মেরামত করা হয়েছিল। কিন্তু বছরের কয়েক মাস আমরা বাজারে ঠিকমতো পণ্য আনতে পারি না। গাড়ি না আসায় পণ্যের দামও বেড়ে যায়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য নজির উদ্দিন বলেন, দোয়ারিয়া এলাকায় ব্রিজ ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের দাবি অনেক পুরোনো। বিষয়টি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত প্রকল্প নেওয়া হলে অবহেলিত এই অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।
শোলাকুড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি লেবু মিয়া বলেন,এটি শুধু একটি সেতু বা রাস্তার দাবি নয়,এটি মানুষের নিরাপত্তা, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং কৃষকদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। আমরা দ্রুত স্থায়ী সমাধানের দাবি জানাই।
এলাকাবাসীর দাবি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে দোয়ারিয়া গ্রামে একটি টেকসই পাকা সেতু নির্মাণের পাশাপাশি জালাবাদা-কাটারজানী ও পোনামারী-হরিণধরা সড়ক দ্রুত পাকাকরণ করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিলে দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে পারেন প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ।
বিবার্তা/বাবু/এসএম
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]