ঢাবিতে বঙ্গমাতার নামে গবেষণা সেন্টার, উপেক্ষিত প্রস্তাবকারী!
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২২, ২১:৪২
ঢাবিতে বঙ্গমাতার নামে গবেষণা সেন্টার, উপেক্ষিত প্রস্তাবকারী!
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতায় বঙ্গবন্ধুর ছয়দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন ও পরবর্তীতে ৭ মার্চের ভাষণসহ সর্বোপরি তাঁর ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনে অপরিসীম ত্যাগের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে তাঁর নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। পরবর্তীতে এই প্রস্তাব গৃহীত হয়। গবেষণা সেন্টারটির উদ্বোধনও হয়েছে। শুধু সুকৌশলে প্রস্তাবকারীর নামটি এড়িয়ে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট মহলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃজনশীল কোন প্রস্তাব গৃহীত হয়ে বাস্তবায়ন হলে প্রস্তাবকারীর নামও সম্পৃক্ত থাকে। এক্ষেত্রে তা করা হয়নি, উল্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন প্রশাসন এই উদ্যোগকে ভিসির আহ্বান বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।


৭ আগস্ট, রবিবার বেলা ১১টার দিকে ‘বঙ্গমাতা: এ প্যারাগন অব উইমেন লিডারশিপ অ্যান্ড ন্যাশন-বিল্ডিং ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে এই গবেষণা সেন্টারেরও উদ্বোধনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা সেন্টার ফর জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী।


এরআগে ২০২০ সালের ২৩ জুলাই, বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের বার্ষিক অধিবেশনে বঙ্গমাতা গবেষণা সেন্টারের প্রস্তাব করেন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। ওই সিনেটের কার্যবিবরণীতে ১৩৩ ও ১৩৪ পৃষ্ঠায় এই বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ আছে।


এতে দেখা যায়, ওই সিনেট অধিবেশনে অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, আমাদের যে ৫৬টি গবেষণা সেন্টার আছে, তারও অনুদান বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আজকে এ. আর. এম. মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল ভাই আরেকটা কথা বলেছেন যে, ইনস্টিটিউট করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর পিস এন্ড লিবার্টি, অবশ্যই মাননীয় উপাচার্য এটাতে দৃষ্টি দিবেন। আমরা নিজেরা বরাদ্দ দিতে চাই, তাহলে আমরা কেমন করে গৌরবান্বিত বোধ করবো যে, বঙ্গবন্ধুর নামে যে একটি রিসার্চ ইনস্টিটিউট হবে, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিশ্চয়ই এগিয়ে যাবে এবং সেখানে থাকবেন। আমি এটার সাথেও একটু বলতে চাই, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি আরেকটি কথা বলতে চাই বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কথা।


যেটি আমাদের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ বলেছেন। তাঁর যে অবদান বঙ্গবন্ধু-কে বঙ্গবন্ধু তৈরি করার পেছনে এবং বলবো যে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সেভাবে পাননি, কেননা সেটা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। খুব অল্প বয়সে তাঁর বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু তাঁর যে বুদ্ধিমত্তা এবং তার যে দূরদর্শিতা ছিল ছয় দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভূত্থান, সত্তরের নির্বাচন পরবর্তীতে ৭ মার্চের ভাষণ তৈরি ইত্যাদি বিশ্লেষণ করি তখন আমি এর প্রেক্ষাপটে একটি প্রস্তাব আজকে রাখতে চাচ্ছি ৮ আগষ্ট বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন এবং খুবই দুঃখজনক একই মাসে ১৫ আগষ্ট তিনি শাহাদাতবরণ করেছেন।


তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ আছে, অনেক কিছুই আছে, আমরা নারীদেরকে নিয়ে প্রচুর গবেষণা করি। এখানে প্রায় পাঁচশত নারী শিক্ষক আছেন এবং ৩০ শতাংশ এর উপরে কিন্তু ছাত্রী আছেন। তো সেখানে আমাদের নারীদের জন্যে একটা স্পেস দরকার এবং সেখানে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব-এর নামে আমি একটা সেন্টার করার জন্যে প্রস্তাব রাখছি। যেটা আমরা নারী ক্ষমতায়নের বিষয়গুলি নিয়ে আমরা কাজ করবো, গবেষণা করবো। এ প্রস্তাবটি রেখেই আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি।


পরে এ বিষয়ে ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব’ নামে সেন্টার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। যা পরে গৃহীতও হয়। আর এ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পরে অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ২০২১ সালের ২৪ জুন, বৃহস্পতিবার সিনেটের বার্ষিক অধিবেশনে উপাচার্যকে ঘিরে বলেন, গত সিনেটে আমি প্রস্তাব করেছিলাম বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নামে একটি সেন্টার করার জন্য। সেটি আপনি গ্রহণ করেছেন, সেজন্য আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। ২০২১ সিনেটের কার্যবিবরণীতেও এই বিষয়টির উল্লেখ আছে।


এদিকে, অধ্যাপক সাদেকা হালিমের প্রস্তাবে ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব’- এর নামে গবেষণা সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সেটাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়।


এই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়,বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নামে গবেষণা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। অথচ এ আহ্বান অধ্যাপক সাদেকা হালিম ২০২০ সালের সিনেট অধিবেশনে করেছেন।


এদিকে, ৫ আগস্ট, শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ অধিদফতর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা সেন্টার ফর জেন্ডার এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ-এর উদ্যোগে 'বঙ্গমাতা এ প্যারাগন অব উইমেন লিডারশিপ এন্ড ন্যাশন-বিল্ডিং ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক ২ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন হওয়ার কথা জানানো হয়। যেই সম্মেলনে বঙ্গমাতা গবেষণা সেন্টারও উদ্বোধন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই বিজ্ঞপ্তির কোথাও অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের নাম দেখা যায়নি।


সূত্র জানায়, ঢাবি সিনেটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর পিস এন্ড লিবার্টি নিয়ে কথা বলায় এ. আর. এম. মঞ্জুরুল আহসান বুলবুলকে এই ইনস্টিটিউটের সাথে জড়িত রাখে। কিন্তু অধ্যাপক সাদেকা হালিম বঙ্গমাতা গবেষণা সেন্টার প্রস্তাবকারী হলেও এক্ষেত্রে তাকে উপেক্ষিত রাখা হয়।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বিবার্তাকে বলেন, দীর্ঘদিন আমি নারী বিষয় এবং এর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ কাজ করছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ যখন নাজমা চৌধুরী প্রতিষ্ঠা করেন, তখন আমিও এর ফাউন্ডিংয়ের সাথে জড়িত ছিলাম।


তিনি বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত উত্তরণ প্রকাশনায়ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে লেখালেখি করেছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, আমার দেখা নয়াচীন বই ৩টি পড়ে আমার যেটা মনে হয়েছে, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পর্দার আড়ালে থেকে যেভাবে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন, সেটা কোন অংশে কম ছিল না।


তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধুপুত্র শেখ কামাল সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন, সুলতানা কামালও এই বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। পরবর্তীতে আমি ডিন থাকাকালে সুলতানা কামালের নামে ভার্চুয়াল ক্লাস রুম চালু করার কাজ করেছি। আমার পরবর্তী ডিনকেও এই কাজ সমাপ্ত করার জন্য বলেছি।


ড. সাদেকা হালিম বলেন, নারীর ক্ষমতায়নসহ বঙ্গমাতা জাতির জন্য যা করে গেছেন, আমার মনে হয়েছে তাকে নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করা প্রয়োজন। এজন্য আমি ২০২০ সালে সিনেটের অধিবেশনে চিন্তা-ভাবনা করে সুচিন্তিতভাবে বঙ্গমাতা গবেষণা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব করেছি। পরবর্তীতে এই প্রস্তাব পাস করা হয়। এজন্য আমি ২০২১ সালের সিনেটে উপাচার্যকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। তিনিও আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।


তিনি বলেন, আজকে যে প্রস্তাবের কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারীর ইতিহাস সৃষ্টি হলো, কিন্তু প্রস্তাবকারীকে স্বীকৃতি দেয়া হলো না- এটা বড় দুঃখের, পরিতাপের এবং একইসাথে আশ্চর্যের বিষয়!


সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বিবার্তাকে বলেন, তুমি অসৎ উদ্দেশ্যে শিখানো কথা বলতেছো। আমাদের কাছে এই ধরণের তথ্য নেই।


তিনি বলেন, আমাদের কাছে বিভিন্ন ধরণের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। এরপর যেখানে যেটার ভূমিকা থাকে, সেখানে সেটার ভূমিকা রাখা হয়।


বিবার্তা/রাসেল/রোমেল/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com