পদ্মা সেতুর দ্বার উন্মোচনে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটবে সাতক্ষীরায়
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২২, ২০:১৭
পদ্মা সেতুর দ্বার উন্মোচনে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটবে সাতক্ষীরায়
সেলিম হোসেন, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

স্বপ্নের পদ্মা সেতুর দ্বার উন্মোচন হতে যাচ্ছে আগামী ২৫ জুন। বহুল প্রতিক্ষীত পদ্মা সেতু চালু হওয়ার মধ্যে দিয়ে সারাদেশের সাথে সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা অভূতপূর্ব উন্নতি হবে। বিশেষ করে সর্বদক্ষিণের সুন্দরবনের কোল ঘেষা জেলা সাতক্ষীরায় অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটবে। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন নিয়ে সাতক্ষীরায় চলছে সাজ সাজ রব।


সাতক্ষীরা বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের একটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী জেলা। কৃষিতে সমৃদ্ধ এ জেলার উৎপাদিত পণ্য জেলার অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো ও বিদেশে রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতিতে রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বর্তমানে সাতক্ষীরার আম জেলার চাহিদা মিটিয়ে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। পদ্মা সেতু হওয়ার ফলে এসব পণ্য স্বল্প সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাবে। এর প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগ করবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন কোটির বেশি মানুষ। এছাড়াও দেশের দ্বিতীয় চিংড়ি উৎপাদনকারী জেলা সাতক্ষীরা। চিংড়ি উৎপাদনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই জেলায় অন্যান্য মাছও প্রচুর পরিমাণে চাষ হয়। সুন্দরবনক ঘিরে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা রয়েছে এখানে। এই জেলায় রয়েছে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম ভোমরা স্থলবন্দর। এসব সম্ভাবনা ঘিরে নতুন নতুন স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে সাতক্ষীরাবাসী।



চিংড়ি চাষী রবিউল ইসলাম বিবার্তাকে বলেন, চিংড়ি একটি পচনশীল পণ্য। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এটি পরিবহন করতে হয়। ঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে পণ্যের উপযুক্ত দাম পাওয়া যায় না। অনেক সময় আমাদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। পদ্মা সেতু চালু হলে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সঙ্গে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে। এতে আমার চিংড়ি চাষীরাসহ জেলার সব পেশার মানুষ উপকৃত হবে।


সাতক্ষীরা বড় বাজারের মেসার্স কাওসার ফিস এর স্বত্বাধিকারী আব্দুল গফফার বিবার্তা প্রতিনিধিকে বলেন, এখন সাতক্ষীরা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাছ নিয়ে যেতে হলে ফেরির জন্য দীর্ঘ সময় সিরিয়ালে থাকতে হয়, সেখানেই কেটে যেত দিন-রাত। পদ্মা সেতু হওয়ার ফলে আর সিরিয়ালে থাকতে হবে না। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে মাছ নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।



সাতক্ষীরা চিংড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা বিবার্তাকে বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলে সাতক্ষীরার চিংড়ি শিল্পের বাজার সম্প্রসারণ হবে। চিংড়ির গুণগত মান ঠিক রেখে বিদেশে রফতানি করা যাবে। এতে জেলার তো অবশ্যই, দেশেরও সার্বিক উন্নতি হবে।


অপরদিকে, পরিবহন সেক্টরে সাতক্ষীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। সাতক্ষীরা থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ৩৫টি পরিবহন ছেড়ে যায়। আর এই সবগুলোই ফেরি পার হতে হয়। সাতক্ষীরা থেকে রাজধানীতে পণ্য আনতে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ঘাট বা মানিকগঞ্জের আরিচা ঘাট পার হতে হয়। এতে অন্তত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়। আর যানজটের সৃষ্টি হলে সময় বেড়ে আরও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। শুধু তাই নয়, ঘাটে গিয়েই ফেরিতে ওঠার নিশ্চয়তা নেই। সময় মত ফেরি না পাওয়ায় এই নদীর পাড়েই কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ঝড়, বর্ষা, নদীর প্রবল স্রোত কিংবা ঘন কুয়াশায় পদ্মার পাড়েই কেটে যায় দিন-রাত। এতে পচনশীল দ্রব্য নষ্ট হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন হলে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টাতেই সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় পণ্য পৌঁছে যাবে।


সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক নজরুল ইসলাম বিবার্তাকে বলেন, অর্থনৈতিকভাবে সাতক্ষীরা এগিয়ে যাবে। এখানে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। বেকারত্ব দূর হবে। বিশেষ করে সকালে সাতক্ষীরা থেকে বেরিয়ে আবার রাতে সাতক্ষীরায় ফিরে আসা সম্ভব হবে। পদ্মা সেতু শুধু সাতক্ষীরাবাসী নয় সারা দেশের জন্য একটি বিরাট অর্জন।


এই বিষয়ে ঢাকাগামী যাত্রী আসাদুল ইসলাম বিবার্তাকে বলেন, বর্তমানে আমাদের সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় যেতে ফেরি অথবা লঞ্চ পার হয়ে ঢাকায় পৌঁছে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। কিন্তু পদ্মা সেতু পার হয়ে আমরা যখন ঢাকায় যাব, তখন ৫ থেকে ৬ ঘন্টার মধ্যে ঢাকায় পৌঁছে যাবো।


এ কে ট্রাভেলস পরিবহন এর কাউন্টার ম্যানেজার হিরনের সাথে কথা হয় বিবার্তা প্রতিনিধির, তিনি বলেন, সাতক্ষীরা থেকে মাত্র পাঁচ ঘণ্টায় পরিবহন ঢাকায় পৌঁছে যাবে। যেটা বর্তমানে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা সময় লাগে। সাতক্ষীরা থেকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ টা পরিবহন ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। পদ্মা সেতু হওয়ার ফলে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।


হানিফ পরিবহনের সাতক্ষীরা ম্যানেজার আমিরুল ইসলাম মুকুল বিবার্তাকে বলেন, সাতক্ষীরা থেকে প্রায় পরিবহন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছেড়ে যায়। পদ্মা সেতু দিয়ে মাত্র সাড়ে পাঁচ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যেই যাত্রীরা গন্তব্যে পৌঁছে যাবে।



ভোমরা স্থলবন্দর দেশের তৃতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর, যা ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠার ২৬ বছরের বিভিন্ন সময়ে অবকাঠামোগত নানা উন্নয়ন হয়েছে বন্দরটিতে। বর্তমানে এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৪ শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক ভারত থেকে প্রবেশ করে। আমদানি ও রপ্তানি কাজে জড়িত রয়েছেন ৫ শতাধিক ব্যবসায়ী। ভোমরা বন্দরে প্রতিদিন রাজস্ব আদায় হয় তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা। এই রাজস্ব আদায় বছর শেষে গিয়ে দাঁড়ায় ১১০০ কোটি টাকায়।


সাতক্ষীরা চেম্বর অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি নাসিম ফারুক খান মিঠু এই প্রতিনিধিকে বলেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা অভূতপূর্ব উন্নয়নের ফলে এই অঞ্চলের ব্যবসায়-বাণিজ্য বাড়বে। ভোমরা স্থলাবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে সরকার রাজস্ব পাবে কয়েকগুণ।


ভোমরা স্থলবন্দরের সিএন্ডএফ এজেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম খান বিবার্তাকে জানান, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে ভোমরা স্থলবন্দরে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবাধ কার্যক্রম শুরু হবে। ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের আশা পূরণ হবে, ভোগান্তি দূর হবে। ভোমরা বন্দরের কিছু উন্নয়ন কাজ বাকি রয়েছে। এখানে একটি কাস্টমস হাউস প্রয়োজন। সেটি হলে সকল পণ্য আমদানির সুযোগ সৃষ্টি হবে।



ভোমরা স্থলবন্দরের উপ-পরিচালক মনিরুল ইসলাম বিবার্তা প্রতিনিধিকে জানান, ভারতের কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের সাথে ভোমরা বন্দরের দূরত্ব বাংলাদেশের যেকোন বন্দর অপেক্ষা কম বিধায় পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এই বন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বর্তমানে বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৪০০ পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আর বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাচ্ছে ৫০-১০০ ট্রাক। এতে দৈনিক রাজস্ব আদায় হচ্ছে তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা। ভোমরা স্থলবন্দরের উন্নয়নে বর্তমানে ভোমরা বন্দরে ১৫ একর জমির উপরে কার্যক্রম চলছে। আরও ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হলে এই বন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম অনেকাংশে বেড়ে যাবে। এতে রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে।


সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বিবার্তাকে বলেন, ইতোমধ্যে সাতক্ষীরায় একটি অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা হতে যাচ্ছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে ব্যাপক উন্নতি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।


বিবার্তা/সেলিম হোসেন/রোমেল/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com