পাঁচবিবি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর: ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারক
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২২, ২৩:৪০
পাঁচবিবি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর: ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারক
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

সিঁড়ির দেয়ালে দেয়ালে ‍দৃষ্টিনন্দন পেইন্টিং। আর তাতে ফুটে উঠেছে ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন আর গ্রাম-বাংলার অপরূপ দৃশ্য। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে সিঁড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় উঠলে চোখে পড়বে আরো নানা দৃশ্য। কোনো দৃশ্যে রয়েছে বাংলাদেশের মুক্তির আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস, আবার কোন দৃশ্যে গ্রাম বাংলার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। এখানেই শেষ নয়, এইসব পেন্টিংয়ে তুলে ধরা হয়েছে স্থানীয় ইতিহাসও। এ যেন এক ঘরে এক টুকরো বাংলাদেশ। যেখানে প্রদর্শিত হচ্ছে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর অপরূপ গ্রাম বাংলার নৈসর্গিক মেলবন্ধন।



বলছি, জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবিতে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও সংগ্রহশালার কথা। পৌর কার্যালয়ে স্থাপিত ব্যতিক্রম এই জাদুঘরটি কেড়েছে স্থানীয় বাসিন্দারের মন।



স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরতে প্রায় ৩১ লাখ টাকা ব্যয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও সংগ্রহশালাটি নির্মাণ করা হয়। গত ১০ মে জাদুঘরটির উদ্বোধন করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের কিউরেটর নজরুল ইসলাম। পাঁচবিবি পৌরসভা ভবনের তৃতীয় তলায় এই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও সংগ্রহশালাটি সদ্য সাবেক পৌর মেয়র মো. হাবিবুর রহমানের পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছে।



সরেজমিনে এই জাদুঘর ঘুরে জানা যায়, জয়পুরহাটের একজন বিশিষ্ট পীরে কামেলের পাঁচজন স্ত্রী ছিলেন। সেই পাঁচজনের সবাই খোদাভীরু ও ধার্মিক ছিলেন। তারা ‍মৃত্যুবরণ করলে যেখানে তাদেরকে সমাহিত করা হয়- সেইখানে গড়ে ওঠে পাঁচবিবির দরগা। এরপর থেকে এই জনপদের নাম হয় পাঁচবিবি। এর আগ পর্যন্ত এই এলাকাটি খাসবাগুড়ি নামেই পরিচিত ছিল। এমন বর্ণনা ও ছবিতে উত্তরের জনপদ জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলা নামকরণের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে এই জাদুঘরে।


মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও সংগ্রহশালাটি ঘুরে দেখা যায়, নবম শতাব্দী থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পাঁচবিবির ক্রমবিকাশ, বাঙালির আত্ম-পরিচয় এবং লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে। এর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু কর্নার, মুক্তিযুদ্ধ কর্নার, ভাষা শহীদ ও বীরশ্রেষ্ঠ কর্নার ছাড়াও দেশ বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের ছবির পাশাপাশি তাদের উল্লেখযোগ্য কর্ম ও পরিচিতিও তুলে ধরা হয়েছে।



সংরক্ষণশালায় পাঁচবিবির বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নাম, ছবিসহ রাখার পাশাপাশি জয়পুরহাটের জেলার সদর উপজেলা, আক্কেলপুর, ক্ষেতলাল ও কালাই উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকাও রাখা হয়েছে। রয়েছে ভাষা শহিদ, সেক্টর কমান্ডার, বীরশ্রেষ্ঠদের ছবিসহ পরিচয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী বিদেশি বন্ধুদের ছবিও রাখা আছে আরেকটি সেলফে।


শুধু তাই নয়, জাদুঘরের একপাশে রয়েছে গ্রাম বাংলার নানা ঐতিহ্য। তারমধ্যে বাঁশের তৈরি গোমাই, পাথর ঘাটার পাথর, হারিকেন, পানি সেচের সিয়ানি, গরুর গাড়ির চাকার ঢোল,বাঁশের তৈরি মাছ ধরার খলয়,কৃষকের মাথায় দেয়া মাথল,বাঁশের তৈরি শিকা, সুপারি পাতার টানা গাড়ি, জোয়াল-লাঙ্গল,ঢেঁকি, একতারা, ময়লা ফেলার পাত্র প্রভৃতি।



এদিকে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া মাটির তৈরি পেয়ালা, কল্কি, ধুপকাঠি দানি, শানকি, প্রদীপ, পাতিল, বদনা ইত্যাদি সংরক্ষণ করা হয়েছে। আছে পিতলের তৈরি জগ, ঘটিম কুপি, পেয়ালা, থালা, পাবাটা, বাটি ইত্যাদি। সংরক্ষিত আছে প্রসাধন রাখার বাক্স, ফল, কলমদানি, ট্রেসহ বিভিন্ন আমলের মুদ্রাও। বাদ যায়নি গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া খেলাগুলোর কথা। ছবির সাথে নাম জুড়ে দিয়ে শৈল্পিক নান্দনিকতায় এগুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কানামাছি,কলা পাতার ঝুপরি,হাডুডু, দাঁড়িয়াবান্ধা, ডাংগুলি, মার্বেল খেলা প্রভৃতি।


জাদুঘর সংশ্লিষ্টরা বলছেন,পাঁচবিবি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও সংগ্রহশালায় বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যও তুলে ধরা হয়েছে। একইসাথে স্থানীয় ইতিহাসও স্থান পেয়েছে এতে। ফলে দূর-দুরান্ত থেকে মানুষ আসেন জাদুঘর দেখতে।


এ বিষয়ে পাঁচবিবি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম মিছির উদ্দিন বিবার্তাকে বলেন, পৌরসভার তৃতীয় তলা নতুন প্রজন্মের কাছে পাঁচবিবির ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও সংগ্রহশালা করেছেন সাবেক মেয়র হাবিব। তার পরিকল্পনায় এটি বাস্তবায়িত হয়েছে। এছাড়াও তিনি পাঁচবিবি পার্কে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ গুণী ব্যক্তিদের ভাস্কর্য স্থাপন, পাঁচবিবি পৌরসভার প্রায় সব কয়টি সড়কের নামকরণ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে করেছেন। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি পাঁচবিবিতে নতুন প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বেড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করেছেন।



পাঁচবিবি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও সংগ্রহশালার সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদি হাসান বিবার্তাকে বলেন, সাবেক মেয়র হাবিব ভাইয়ের সার্বিক নির্দেশনায় এই জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে। আর এটি স্থাপন করতে গিয়ে অনেক কষ্টও করতে হয়েছে আমাদের। নানা জিনিস নানা জায়গা থেকে সংগ্রহ করে পাঁচবিবির ইতিহাস-ঐতিহ্যের নানা দিক এখানে তুলে ধরা হয়েছে। একইসাথে স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে। ফলে তরুণ প্রজন্ম এখান থেকে ইতিহাসের পাঠ নিতে পারছে।


তিনি বলেন, আমাদের এলাকার উচ্চ শিক্ষিত অনেক শিক্ষার্থীও তাদের চাকরির ভাইবার আগে এই জাদুঘরে ঘুরে যায়। এতে করে তারা নিজ এলাকার ইতিহাস জানতে পারছে, যা তাদের ভাইবায় জন্য সহায়ক হয়।


বিবার্তা/সোহেল-রাসেল/রোমেল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com