শিক্ষকতায় অনাগ্রহী শিক্ষার্থীরা, কী বলছেন শিক্ষাবিদরা?
প্রকাশ : ২২ মে ২০২২, ১০:৩২
শিক্ষকতায় অনাগ্রহী শিক্ষার্থীরা, কী বলছেন শিক্ষাবিদরা?
প্রতীকী ছবি
মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

মনীষীর বিখ্যাত উক্তি, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। অর্থাৎ মেরুদণ্ড ছাড়া মানুষ যেমন দাঁড়াতে কিংবা চলতে পারে না, ঠিক তেমনি শিক্ষা ছাড়া একটি জাতি উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে পারে না। এই কারণে শিক্ষকতাকে বলা হয় মহান পেশা। আর শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। এই কারিগররা জাতির মেরুদণ্ড গড়তে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। অথচ এই মহান পেশায় এখন আসতে চাইছেন না মেধাব শিক্ষার্থীরা। শিক্ষাবিদরা বলছেন, সুযোগ সুবিধার অভাবসহ নানা কারণে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চাইছেন না। তবে শিক্ষায় সুযোগ-সুবিধা আরো বাড়ানো হলে শিক্ষার্থীরা এ পেশায় আসবেন বলে দৃঢ় বিশ্বাস তাদের।


গত ৩০ মার্চ ৪০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করেছে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। এই বিসিএসে ১ হাজার ৯৬৩ জন বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে। এই পরীক্ষায় আবেদন জমা পড়েছিল ৪ লাখ ১২ হাজার। কিন্তু ১ শতাংশেরও কম শিক্ষার্থীর প্রথম পছন্দ হিসেবে সাধারণ শিক্ষায় আবেদন করেছেন। প্রতিটি বিসিএস-এর পরিসংখ্যান প্রায় একইরকম। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের আগ্রহের তালিকায় পছন্দের শেষের দিকে থাকে শিক্ষকতা। মহান এ পেশার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার পেছনে বিবিধ কারণও দাঁড় করাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মিলাদ হোসেন। জানতে চাইলে তিনি বিবার্তাকে বলেন- এটা এখন একেবারে সত্যিই যে, শিক্ষকতা পেশার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কম। বিসিএসেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী চয়েজের তালিকায় একেবারে শেষের দিকে শিক্ষা ক্যাডার দিয়ে থাকে। আমি নিজেও একই কাজ করেছি।


শিক্ষা ক্যাডারের প্রতি অনীহার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, শিক্ষা ক্যাডারের চেয়ে অন্যান্য ক্যাডারের সুযোগ-সুবিধা বেশি, এটা একটা কারণ। আরেকটা কারণ হচ্ছে, অন্যান্য ক্যাডারদেরকে সামাজিকভাবে যেভাবে মূল্যায়ন করা হয়, আজকাল সমাজে শিক্ষকতা পেশাকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফাত হোসাইন রাজু বিবার্তাকে বলেন, শিক্ষকতাকে বলা হয় মহান পেশা। কিন্তু এ মহান পেশার মানুষদের আমরা সেভাবে মূল্যায়ন করছি কি? ফলে মেধাবী তরুণরা এ পেশায় আসতে অনীহা প্রকাশ করবে, এটাই স্বাভাবিক।


৪০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে বাংলা বিভাগের প্রভাষক পদের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন রাহাদ ইসলাম। জানতে চাইলে তিনি বিবার্তাকে বলেন, আমি ৪০তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। ৪১তম বিসিএসেরও লিখিত পরীক্ষা দিয়েছি। অন্য ভালো ক্যাডারে সুযোগ পেলে অবশ্যই শিক্ষা ক্যাডারের চাকরি ছেড়ে দেবো।


শিক্ষা ক্যাডারের প্রতি অনীহার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেখুন বাস্তবতাকে তো আর অস্বীকার করা যায় না। যেদিকে সুযোগ বেশি আর সম্মানও বেশি সেদিকে মানুষ যাবে, এটাই তো স্বাভাবিক।


শিক্ষকতা পেশার প্রতি শিক্ষার্থীদের অনীহার বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান বিবার্তাকে বলেন, অনেকের কাছে শিক্ষকতা পেশা কম আকর্ষণের বিষয় হতে পারে। একেবারে না পারলে শিক্ষা, এ রকম একটা জায়গায় যাচ্ছে শিক্ষা ক্যাডার। বিসিএসেও শিক্ষার্থীরা চয়েজে শেষের দিকে শিক্ষকতাকে রাখার কথাও আসছে। এর পেছনে দুটো কারণ আছে। বিসিএসের অন্যান্য ক্যাডারের প্রতি আকর্ষণ, হয়ত ওই জায়গাগুলো অনেক লোভনীয়। এক্ষেত্রে ক্ষমতার চর্চাও একটা কারণ হতে পারে। তবে অনেকে সততার সাথেও কাজ করছে। তাছাড়া এর পেছনে আরো নানা কারণ থাকতে পারে।


তিনি বলেন, অনেক সময় অনেক ক্যাডারে কাজের পরিধি বেশি, নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের পরিধি বেশি। এছাড়া হয়ত সুযোগ সুবিধাও বেশি। শুধু তাই নয়, এসব ক্যাডারে চাকরি অবস্থায় দেশে-বিদেশে নানা ধরণের প্রশিক্ষণেরও সুযোগ আছে। এজন্য শিক্ষার্থীরা হয়ত শিক্ষা ক্যাডার বাদ দিয়ে অন্যগুলো পছন্দ করছে।


এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বিবার্তাকে বলেন, শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশা নিতে চায় না, এর পেছনে অনেক কারণ আছে। প্রথম কথা হলো, শিক্ষকতার মূল্যায়নটা সামাজিকভাবে আমরা সেভাবে করতে পারেনি। শিক্ষকদের বেতন ভাতাও আমরা কম দেই। অন্যান্য সেক্টর থেকে এই সেক্টরে শিক্ষকদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও কম। শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় ও সরকারি কলেজ পর্যায়ে কিছুটা সামঞ্জস্য আছে অন্যান্য পেশার সাথে।


তিনি বলেন, তাছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষকতা পেশার বেতন-ভাতা অনেক কম দেয়া হয়। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশার চেয়ে অন্যান্য পেশাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এমনকি কেরাণীর চাকরিসহ অনেক চাকরির স্থায়িত্ব বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা থাকায় এসবেরও গুরুত্ব বেড়ে যাচ্ছে। সরকারি অন্যান্য চাকরির গুরুত্ব সমাজে বেড়ে যাওয়াসহ সামাজিক নানা কারণে শিক্ষার্থীরা এখন আর শিক্ষকতা পেশায় আসতে চায় না।


শিক্ষকতা পেশার এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী কারা জানতে চাইলে আরেফিন সিদ্দিক বলেন, আসলে সত্যি বলতে, শিক্ষকতা পেশাকে সর্বোচ্চ সম্মানের পেশা করা উচিত ছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা এবং ব্যক্তিগতভাবেও তাদেরকে খুব মর্যাদা দিতেন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। পরবর্তীতে আমরা শিক্ষকদের সেভাবে মর্যাদা দিতে পারিনি, সেটা আমাদেরই ব্যর্থতা। শিক্ষক হিসেবে আমরা অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় যোগদান করে শিক্ষকতা পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছি। এই পেশার যে সম্মান-মর্যাদা, সেটাকে আমরা বিক্রি করে দিচ্ছি। এর পেছনে দুটি কারণ আছে বলে আমি মনে করি। প্রথমত, আমরা শিক্ষকরাও কিছুটা দায়ী আর সরকারের কিছু সিদ্ধান্তও এর জন্য দায়ী। প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করে বঙ্গবন্ধু শিক্ষার যে মান দাঁড় করিয়েছেন, পরবর্তীতে সেটা আমরা ধরে রাখতে পারিনি।


এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে ঢাবির সাবেক এই উপাচার্য বলেন, এটা থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং যারা এই পেশায় আসবে তাদেরকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে প্রথম শ্রেণির চাকরির মাধ্যমে শিক্ষকতায় আনতে হবে। তাদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সব সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিজীবী থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা যে বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পায় আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তা পায় না। তাহলে তারা শিক্ষকতা পেশায় কেন আসতে চাইবে?


বিবার্তা/রাসেল/রোমেল/কেআর

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com