সংসদ নির্বাচন; ঘরে-বাইরে নজর আ.লীগের
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২২, ১৮:৫৮
সংসদ নির্বাচন; ঘরে-বাইরে নজর আ.লীগের
সোহেল আহমদ
প্রিন্ট অ-অ+

২০২৩ সালের ডিসেম্বর অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতা আসতে ইতোমধ্যে জোর তৎপরতা শুরু করেছে ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগ। দল গোছানোর পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি।


দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য সকল পরিস্থিতি মোকাবিলায় নানামুখী কৌশলও নিচ্ছে দলটি। বিশেষ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যেসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে, সেইসব বিষয়কে সামনে রেখে কাজ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ।


দলের নেতারা বলছেন, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসতে চায় আওয়ামী লীগ। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনে দল গোছানো থেকে শুরু করে যেসব প্রস্তুতি নেয়া দরকার তার সবই নেয়া হচ্ছে।


দলীয় সূত্র মতে, আগামী জুলাইয়ের মধ্যে তৃণমূলের মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠন শেষ করে ডিসেম্বর জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করতে চায় দলটি। এছাড়া নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে চায় আওয়ামী লীগ। এদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়নে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এসব সফরকে গুরুত্বপূর্ণ বলছেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা।


ঘর গোছাতে ব্যস্ত আওয়ামী লীগ


মহামারি করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর গত বছরের ১৯ নভেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় দলের সভাপতি শেখ হাসিনা দলা গোছানোর পাশাপাশি সংসদ নির্বাচন প্রস্তুতি শুরু জন্য নেতাদের নির্দেশনা দেন। এরপর চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসময় দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা তিন মাসের মধ্যে দলের তৃণমূলের সম্মেলন শেষ করার নির্দেশনা দেন। এরপর থেকে তৃণমূল গোছাতে জোর তৎপরতা শুরু করেন দলটির নেতারা। সাংগঠনিক কাজে গতি ফেরায় সর্বশেষ ৭ মে অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা।


সভায় দলের সাংগঠনিক তৎপরতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া যুব মহিলা লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সম্মেলন আয়োজন করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। এছাড়া আসন্ন আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষ্যে দলের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র সংশোধন এবং জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষ্যে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের তথ্য হালনাগাদ করার দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হয়।


জুলাইয়ের আগে তৃণমূলের সম্মেলন শেষ করার টার্গেট নিয়ে কাজ শুরু করেছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সম্মেলন অক্টোবর মাসের মধ্যে শেষ করতে চায় দলটি। আর ডিসেম্বরে জাতীয় কাউন্সিল শেষ করে পুরোপুরি নির্বাচনমুখী হতে চায় আ.লীগ।


বিএনপিকে নির্বাচনে চায় আওয়ামী লীগ


গত ৮ মে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, পরবর্তী নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের কথা তো পরিষ্কার, আওয়ামী লীগ সরকার পদত্যাগ না করলে এবং নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে নির্বাচনের কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। এ নিয়ে আমরা কোনো কথাই বলতে চাই না। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে আমরা নির্বাচনে তো যাবোই না।


নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে বিএনপির এমন অনঢ় অবস্থান তুলে ধরলেও দলটিকে নির্বাচনে আনতে সরকারও নানামুখী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে শেষ পর্যন্ত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহন করবে। গত ৭ মে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে দলটির কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শেখ হাসিনা বিরোধী দলের জন্য পরিবেশ তৈরির কথা বলেন। এছাড়া বিএনপিকে নির্বাচনে আনার ব্যাপারে আলোচনা করেন। গত ১০ মে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সভার শুরুতে বিএনপিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আমরা ফ্রি, ফেয়ার ইলেকশন করবো।


বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য অনুরোধ কেন করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা নির্বাচনে আসুক, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হোক- জনগণ চায়। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা তাদের অধিকার।


জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এমপি বিবার্তাকে বলেন, আমরা বারবার বলছি, আগামী নির্বাচন সকল দলের অংশগ্রহনে হবে এবং বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশ নিবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। আমরা সব দলের অংশগ্রহনে নির্বাচন করব। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু করা দরকার, সেগুলো করা হবে।


দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোটের কেউ না এলেও যথা সময়ে নির্বাচনের আয়োজন করার প্রস্ততি নিবে আওয়ামী লীগ। কেউ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করলে তাও মোকাবিলা করবে দলটি। এ বিষয়ে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা দিক-নির্দেশনাও দিয়েছেন।


নজর বাইরে:


গত বছরের ১০ ডিসেম্বর ‘গুরুতর মানবাধিকার লংঘনমূলক কাজে জড়িত থাকার’ অভিযোগ এনে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) এবং এর ছয়জন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের এধরণের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ভাটা পড়ে। সামনে নির্বাচন, এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তলানিতে থাকুক এমনটা চায় না আওয়ামী লীগ। সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এপ্রিলের শুরুর দিকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উদযাপন উপলক্ষ্যে ওয়াশিংটন সফরে করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এমপি। এসময় তার সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এমপি, নাহিম রাজ্জাক এমপি ও পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন।


এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এমপি বিবার্তাকে বলেন, আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে গিয়েছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে এটাকে আরো উন্নত করা। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের যে কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে সেটাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আমাদের লক্ষ্য। নির্বাচনের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।


পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্বশেষ সফরেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সিনেটরদের র‌্যাবের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মোমেন বলেন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের অংশ নেয়ার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। এসময় বিএনপিকে নির্বাচনমুখী করতে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যও চান তিনি। যদিও পরে দেশ ফিরে মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, সেটি ছিল কথার কথা। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ছিল না।


এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সংসদীয় দল। গত ৭ মে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদীয় দলের চারজনকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের জন্য ঠিক করে দেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফারুক খানের নেতৃত্বে এ টিম গঠন করা হয়েছে। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন- নুরুল ইসলাম নাহিদ, নাহিম রাজ্জাক ও কাজী নাবিল আহমেদ। জানা গেছে, সফরে আওয়ামী লীগের এই সংসদীয় দল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদারে কাজ করবে। এছাড়া র‌্যাবের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তুলে নেয়া এবং নতুন করে যাতে আর কেউ নিষেধাজ্ঞার মুখে না পড়ে সে বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেয়া হবে।


আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান বিবার্তাকে বলেন, র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছেন। আমরা বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে যোগাযোগ করে বোঝানোর চেষ্টা করছি হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের ব্যাপারে বাংলাদেশ সম্পর্কে যেভাবে বলা হচ্ছে ততটা ঠিক নয়। পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। বাঙালি জাতি একত্রিত হয়ে স্বাধীনতা, বাংলা ভাষা রক্ষা করেছে। একইভাবে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের অগ্রগতিকেও অব্যাহত রাখবো।


গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সংলাপে অংশ নিতে ভারত সফর করেছেন সরকার ও আ.লীগের ৩৭ সদস্যের প্রতিনিধি দল। জানা যায়, তিন দিনের সফরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পর্যালোচনা ও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক আরো জোরদার করা নিয়ে আলোচনা হয়।


বিবার্তা/সোহেল/রোমেল/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com