ধর্ষণ মামলার পরেও বেপরোয়া ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল!
প্রকাশ : ১০ মে ২০২২, ২১:০১
ধর্ষণ মামলার পরেও বেপরোয়া ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল!
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

গাইবান্ধা জেলা পলাশবাড়ী উপজেলার ৪নং বরিশাল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলাও করেছেন ভুক্তভোগী নারী। এসবের পরও ক্ষান্ত হননি অভিযুক্ত রফিকুল। প্রতিনিয়ত তিনি ভুক্তভোগী নারীকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিকভাবে বিষয়টি রফায় অস্বীকৃতি জানালে ভুক্তভোগীর বাড়িতে বিবাদীর নির্দেশে হামলাও করা হয়েছে। এসব ঘটনায় থানায় একাধিক জিডি হয়েছে।


ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিক চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম এলাকায় ব্ল্যাক রফিক নামে পরিচিত। পলাশবাড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও বরিশাল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি রফিকুল বাংলাদেশ টুডে পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ৪নং বরিশাল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয়েছেন তিনি। এলাকাবাসী বলছেন, একজন নেতার পরোক্ষ প্রভাব ও আন্তরিক সহযোগিতায় তিনি নৌকার বিদ্রোহী হয়েও বিজয়ী হয়েছেন।


জানা যায়, অভিযুক্ত রফিকুল রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পলাশবাড়ী উপজেলা তাঁতী লীগের নেত্রী মোছা. নাছিমা আক্তারের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ব্যক্তিগত জীবনে নাছিমা তালাকপ্রাপ্ত হওয়ায় তাদের সম্পর্ককে বিয়ের লোভনীয় প্রলোভনের পর্যায়ে নিয়ে যায় রফিক। সম্পর্ক আরো গভীর হলে নাছিমাকে বিয়ের আশ্বাসে ধর্ষণও করেন তিনি। এরপর ভুক্তভোগী তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে রফিকুল বেকে বসে। ঘটনা জানাজানির পর দলের নেতাকর্মীসহ স্থানীয়রা সামাজিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করলেও রফিকুল তাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে ঘটনা ধামাচাপা দিতে ক্ষমতার প্রভাবে খাটিয়ে রফিকুল ওই নারীকে হুমকি দেয়। ভুক্তভোগী নারী তিন সন্তানের জনক সাংবাদিক রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে গত বছরের ৬ অক্টোবর পলাশবাড়ীর থানায় ধর্ষণ মামলা করেছেন।


মামলার কপি বিবার্তা২৪ডটনেটের হাতে এসেছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ আছে, এই ঘটনায় ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর পলাশবাড়ী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধিত/২০০৩ এর ৯(১) ধারায় মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী নাছিমা। মামলার জি. আর-২৬০/২০২১ (পলাশবাড়ী)। এই মামলার হওয়ার পর আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম। ফলে একই ঘটনায় গাইবান্ধার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গত এপ্রিল মাসে অভিযোগ দায়ের করেন ভুক্তভোগী।


অভিযোগ তিনি উল্লেখ করেন, ‘এপ্রিল মাসে তাকে রাস্তার উপর একাকী দেখিতে পাইয়া প্রতিপক্ষগণ হাতে লাঠিসহ প্রভৃতি লইয়া প্রার্থীকে উদ্দেশ্য করিয়া গালিগালাজ করিতে থাকিলে প্রার্থী তাহাতে বাধা নিষেধ করিলে প্রতিপক্ষগণ আরো ক্ষিপ্ত হইয়া প্রার্থীকে মারধর করার জন্য উদ্যত হইলে অবস্থা বেগতিক দেখিয়া তিনি ডাক চিৎকার করিলে সাক্ষীগণসহ আশপাশের লোকজন আগাইয়া আসিলে বাদী প্রাণে রক্ষা পায়।’


তিনি অভিযোগ আরো বলেন, ‘প্রতিপক্ষগণ প্রার্থীকে মারধর করিতে না পারিয়া তর্জন-গর্জন করিয়া এই বলে হুমকি প্রদর্শন করে, ‘প্রার্থীর দায়েরকৃত মামলা উঠাইয়া না লইলে অন্য যে কোন দিন সুযোগে মত তাকে মারধর করিবেই, করিবে।’ `রাস্তা-ঘাটে, শহরে-বন্দরে বাদীসহ তাহার পরিবার ও আত্মীয় স্বজনকে যেখানেই পাইবে প্রতিপক্ষগণ তাহাদের ভাড়াটে মাস্তান লেলিয়ে দিয়ে মারধর করার হুমকি দেয়। তারা আরো হুমকি প্রদর্শন করে যে, নিজেরাই কোন কাল্পনিক ঘটনা ঘটাইয়া বা রটাইয়া তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করিয়া হয়রানী ও আর্থিক ক্ষতি করিবে। এমতাবস্থায় প্রতিপক্ষগণ যেরূপ উগ্রমূর্তি রূপ ধারণ করিয়াছে তাহাতে যেকোন মুহূর্তে প্রতিপক্ষগণ কর্তৃক বাদীপক্ষের শান্তিভংগের সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান রহিয়াছে এবং স্বাভাবিক জীবন যাপনে চরম ব্যাঘাত ঘটিতেছে।’


দাবি জানিয়ে নাসিমা লিখেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে উক্ত নালিশ গ্রহণ করত. প্রতিপক্ষগণের বিরুদ্ধে ফৌ.কা.বি.১০৭/১১৭ (সি) ধারা মতে প্রসেডিং ড্রন-আপ করত. প্রতিপক্ষগণকে জেল হাজতে আটক রাখিয়া কঠিন জামিন মুচলেকায় আবদ্ধ করার আদেশ দানে মর্জি হয়।


অভিযুক্ত রফিকুলের কাহিনী এখানেই শেষ নয়। গত ৩ মে রাতে বিবাদীর নির্দেশে মামলার বাদী নাছিমার বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়। পরে এ ঘটনায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবর অভিযোগপত্র দায়ের করেন ভুক্তভোগী।


এতে তিনি লিখেন, ‘আমি ১নং বিবাদীর ( রফিকুল ইসলাম) বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করার কারণে আমার সহিত শত্রুতা পােষণ করিয়া আসিতেছে। এমতাবস্থায় বিবাদীগণ পূর্ব শত্রুতার জের ধরিয়া গত ইং ০৩/০৫/২০২২ তারিখ রাত্রি আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিটে সময় ১নং বিবাদীর হুকুমে সকল বিবাদীগণ আমার বসত বাড়ির ভিতরে গিয়া আমার বসত বাড়ির টিনের বেড়া ও ঘরের ভিতরে থাকা আসবাবপত্রগুলো কোপাইয়া ভাংচুর করিয়া আনুমানিক ৫০ হাজার টাকা ক্ষতি সাধন করে। পরবর্তীতে তারা আমাদের হত্যা করিয়া লাশ গুম করিবে মর্মে হুমকি প্রদান করিয়া চলিয়া যায়। কাজে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত পূর্বক বিবাদীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে আপনার একান্ত মর্জি হয়।’


ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী নাছিমা আক্তার বিবার্তাকে বলেন, রফিকুল ইসলাম আমাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার সাথে এসব করেছে। কিন্তু পরবর্তীতে সে সবকিছুকে অস্বীকার করে ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে চাইলো। তাই আমি বাধ্য হয়ে মামলা করেছি।


ভুক্তভোগী নাছিমা বলেন, এখনো আমাকে মামলা করার কারণে বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এমনকি আমার বাড়িতে হামলা করা হয়েছে। আমি চাই যেহেতু বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় আছে, সেহেতু আইনি প্রক্রিয়ায় এটার সমাধান করতে। কিন্তু হুমকি- ধামকিতে আমার ভয় হয়। তারপরেও আমি ঘটনার ন্যায় বিচার চাই।


অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম মোবাইলে বিবার্তাকে বলেন, আপনি ঢাকায় থাকেন আর মক্কায় থাকেন, সরেজমিনে এসে ঘটনার তদন্ত করে যান। আমি নিজেও ৩০ বছর ধরে সাংবাদিকতা করি বলেই তিনি সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন।


বিবার্তা/রোমেল/এসএফ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com