৫ সন্তানকে মানুষ করেও আজগরির ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২২, ১১:০১
৫ সন্তানকে মানুষ করেও আজগরির ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

'পোলা-মাইয়ারে ছোড থেইকা অনেক কষ্ট কইরা মানুষ করছি। কত রাইত গেছে এক গেলাস পানি খাইয়া কাটাইছি। নিজে না খাইয়া তাগো খাওয়াইছি। তাগো যাতে কোন অসুবিদা না হয়, সব সময় খেয়াল রাখছি। এখন তারা বড় হইছে। কামাই কইরা খাইতে পারে। অহন আর আমারে তাগো দরকার নাই। বাসা থাইকা বাইর কইরা দিছে।'


নিজের জীবনের কথাগুলো এভাবেই বলছিলেন রাজধানীর উত্তরায় ‘আপন ভুবন’ বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা অসহায়, আশ্রয়হীন মা আজগরি বেগম। সন্তানদের তিল তিল করে মানুষ করে তুলেছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে শেষ বয়সে তার ভালো থাকার কথা। সেখানে তার ঠিকানা হয়েছে ‘আপন ভুবন’ বৃদ্ধাশ্রম।


কথায় কথায় জানা গেলো, আজগরি বেগম (৯০) থাকতেন পুরান ঢাকায়। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই। চার মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে ছিল তার টানাটানির সংসার। ছেলে-মেয়েরা এখন সবাই বড়।


আজগরি বেগম বলেন, স্বামী মারা গেলে অনেক চিন্তায় পইরা যাই। এত্তগুলা পোলাপান নিয়া ঢাকা শহরে কী কইরা সংসার চালাই? পরে বাসায় বাসায় কাম কইরা যা কামাই করতাম তা দিয়া পোলা-মাইয়াগো মানুষ করছি। অল্প টাকা কামাইতাম। তা দিয়া তাগো মুখে যা পারতাম তাই তুইলা দিতাম। নিজে অনেক সময় না খাইয়া থাকতাম। এইভাবে তারা আস্তে আস্তে বড় হইছে।


ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে তার সাথে অশোভন আচরণ শুরু করে। সন্তানদের এমন ব্যবহারে মনের কষ্টে আজগরি বেগম বলেন, যে পোলা-মাইয়ারে নিজে না খাইয়া, না পইরা তাগো মানুষ করছি, বড় হইয়া তারা আমারে কথায় কথায় অপমান করতে শুরু করে। থাকা-খাওয়ার খোঁটা দেয়। এভাবে দিন চলতে থাকে। আমি অসুস্থ হইলে তাগো কাছে আমি ঝামেলা হইয়া যাই।



মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কঠোর শ্রম দিয়ে যা রোজগার করতেন তা দিয়ে কোনরকমে সন্তানদের বড় করেছেন তিনি। সেই মা-কেই সন্তানরা বড় হয়ে নানা ভাবে মানসিক অত্যাচর শুরু করে। এক মুঠো ভাতের জন্যও অনেক প্রতীক্ষায় থাকতে হত। অসুস্থ হলে চিকিৎসা তো দূরের কথা বরং কথা শুনতে হত। অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করতো। শেষ বয়সে যেখানে স্নেহ-মায়া-মমতা ভালোবাসায় পূর্ণ সংসারে শান্তি আর আনন্দে থাকার কথা, সেখানে আদরের সন্তানরা তাকে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেয়। শুরু হয় তার ঠিকানাবিহীন মানবেতর জীবন। পুরাতন ঢাকার অলিগলিতে আর ফুটপাতই হয় তার ঘর-সংসার।


আজগরি বেগম বলেন, নিজের পোলা-মাইয়ারা যখন বাসা থাইকা বাইর কইরা দিল, তখন এত্ত বড় ঢাকায় আমার আর আপন কেউ থাকল না। কই যামু, কার কাছে যামু? দুনিয়ায় তো আমার কেউ নাই। তহন ফুটপাতে থাকতাম, ঘুমাইতাম। দোকানে দোকানে চাইয়া যা পাইতাম, তাই খাইতাম। শরীল ভালা লাগলে খাবার কপালে জুটত। অসুস্থ হইলে আর খাওয়া হইত না। এমনেই দিন যাইতেছিল। না খাইয়া থাকতে থাকতে শরীলে আর কুলাইতো না। এক সময় অসুস্থ হইয়া পড়ি।


এই আশ্রমে আসলেন কীভাবে? জবাবে তিনি জানান, কী কইরা এহানে আইছি এটা মনে করতে পারতাছি না। এইডা কইতে পারবো আমারে যারা এহানে আনছে তারা।