"বিজয়ের মাস শুরু"
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৩:০২
এড. কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি
প্রিন্ট অ-অ+

বাঙালির জাতীয় জীবনের সবচেয়ে অহংকারের মাস 'ডিসেম্বর' শুরু হলো আজ৷ ব্রিটিশ শাসনের পর বাঙালিদের ভাগ্য তুলে দেওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের হাতে। তাদের ২৪ বছরের অত্যাচারের শেষে বহু ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছিলাম একটি লাল-সবুজ পতাকা। এই লাল-সবুজের বিজয় গাঁথা লিখতে ঝরেছে বহু প্রাণ। সেই প্রাণের বিনিময়ে আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা ছিনিয়ে এনেছিলো বিজয়।


বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভ করে। সেই বিজয় এমনিতেই আসেনি। বিজয় অর্জনের জন্য চাই বিসর্জন। ৩০ লক্ষ শহিদ ও ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে এসেছিলো আমাদের সেই বিজয়। এই মাসটি যেভাবে আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের পূর্ব-পুরুষদের ত্যাগ-বিসর্জন, তেমনি আমাদের গর্বিত করে তোলে।


ব্রিটিশ শাসন থেকে ১৯৪৭ সালে মুক্ত হয়ে বাঙালি জাতি ভেবেছিল আমরা স্বাধীনতা পেলাম। এবার আমরা আমাদের অধিকার পাবো। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই আমাদের ভুল ভাঙে। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরাও আমাদের একইভাবে শোষণ করতে শুরু করে। তাদের প্রথম আঘাত আসে আমাদের সংস্কৃতির উপর। বাঙালি হাজার বছরের ঐতিহ্যের সংস্কৃতিকে ওরা ধ্বংস করতে চায়। কারণ ওরা জানতো, কোন জাতিকে শাসন করতে হলে সেই জাতিকে শিক্ষিত হতে দেওয়া যাবে না। সংস্কৃতির উপর আঘাত হিসাবে তারা প্রথম বেছে নেয় আমাদের প্রিয় ভাষাকে। তারা আমাদের অফিস আদালতে একমাত্র উর্দু ভাষার প্রচলন শুরু করতে চায়। তারা একাধিক সমাবেশে ঘোষণা করে- একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। বাঙালিরা সেটা মেনে নেয়নি। শুরু হয় আন্দোলন। দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে এবং রক্তের বিনিময়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীকে তাদের মত বদলাতে বাধ্য করা হয়।


এরপর বিভিন্ন ভাবে পাকিস্তানি গোষ্ঠী আমাদের উপর নির্যাতন শুরু করে। বঞ্চিত করে আমাদের অধিকার থেকে। সরকারি চাকরিতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে মাত্র ৬% লোককে সুযোগ দেওয়া হতো। সেনাবাহিনীতে মাত্র ৩% সুযোগ পেতো বাঙালিদের মধ্যে। অফিসার পদে ছিলো আরো কম সংখ্যক। উৎপাদন হতো পূর্ব পাকিস্তানে, কিন্তু কলকারখানা প্রতিষ্ঠা করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। আমাদের টাকাতে উন্নত হতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তান আর আমরা পিছিয়ে যেতে থাকি প্রতিদিন। শিক্ষার সুযোগও ছিলো অনেক কম। এভাবে বঞ্চিত হতে হতে বাঙালি জাতির মধ্যে ক্রোধের আগুন জন্ম নেয়। কিন্তু সেই আগুনে পশ্চিম পাকিস্তানকে জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো ছিলো একজন। পাহাড়-সম ব্যক্তিত্বের অধিকারী বাঙালিদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা আন্দোলন থেকে যিনি বাঙালিদের ভরসার নাম। যার কথায় বাঙালিরা সব করতে প্রস্তুত।


১৯৭০ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় লাভের পরেও পাকিস্তানি শাসকেরা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গড়িমসি শুরু করে। তখন বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারে যুদ্ধের বিকল্প আর কিছু নেই। তাই তিনি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে " এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম" ঘোষণার মধ্য দিয়েই মূলত স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। সবাইকে প্রস্তুতি নিতে বলেন। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে তৈরি থাকতে বলেন সেই ঐতিহাসিক ভাষণে। বঙ্গবন্ধুর একটি তর্জনীর ইশারায় সেদিন কেঁপে গিয়েছিলো পাকিস্তানি সরকারের ভিত। তার কিছুদিন পর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।ঢাকা সহ বিভিন্ন শহরে সারারাত চলে হত্যাযজ্ঞ। বঙ্গবন্ধুকে সেই রাতেই গ্রেফতার করা হয়,তার আগেই তিনি আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা করে যান। যা সেদিন রাতে ও পরের ২/৩ দিন বিভিন্ন রেডিওতে বিভিন্ন মানুষের দ্বারা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে পঠিত হয়।


৯ মাস চলে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। নিরস্ত্র বাঙালি ভারত থেকে ট্রেনিং নেয়। যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানিদের কাছে ছিলো অত্যাধুনিক অস্ত্র। আর বাঙালিদের মধ্যে ছিলো বিশ্বাস-স্বপ্ন। ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল স্বাধীন হতে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে থাকে।


তারপর আসে হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত ১৬ ডিসেম্বর। বাঙালিদের বিজয়ের দিন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতার সূর্য স্তিমিত হয়েছিলো। ১৬ ডিসেম্বর আবার উদিত হয় স্বাধীন সূর্য। যেখানে দাঁড়িয়ে জাতির পিতা ডাক দিয়েছিলো স্বাধীনতার সেখানেই লজ্জাজনকভাবে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি বাহিনী।


ডিসেম্বর মাস বাঙালিদের কাছে যেমন গর্বের ঠিক তেমনি বেদনার। প্রিয়জন হারানোর বেদনা, মা হারানোর বেদনা, বাবা হারানোর বেদনা, সন্তান হারানোর বেদনা, বোন হারানোর বেদনা, ভাই হারানোর বেদনা বয়ে চলেছে এই মাসটি।


আমাদের বিজয়ের লক্ষ্য ছিলো আমাদের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকা। আমাদের অর্থনৈতিক বিজয়, আমাদের অধিকারের বিজয়। আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু দুঃখ-কষ্ট ও লজ্জা পাই এটা ভেবে এখনো আমাদের দেশে এমন অনেকেই আছে যারা পাকিস্তানের প্রতি দূর্বলতা অনুভব করে। একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল এখনো পাকিস্তানিদের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী। তারা চায় আমাদের পিছিয়ে নিতে। কিন্তু বিজয়ের এই মাসে আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা আমাদের জন্য যে ত্যাগ করেছে তা আমরা বৃথা হতে দিতে পারিনা। আমরা পিছিয়ে যেতে দেব না আমাদের দেশকে। আমাদের দেশ আমরা এমন কোন সরকারের হাতে তুলে দেব না যারা বার বার সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে আমাদের পিছিয়ে দেবে এটা আমাদের অঙ্গিকার। আমরা এগিয়ে যাব। বিজয়ের মাসে আমাদের পূর্ব-পুরুষদের প্রতি আমাদের অঙ্গিকার আমরা বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবোই....


লেখক: এড.কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি, সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ যুবমহিলা লীগ.


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com