কাশ্মীর ভ্রমণ: গুলমার্কে ট্রেডমার্ক! (৩য় পর্ব)
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২২, ২০:১৫
কাশ্মীর ভ্রমণ: গুলমার্কে ট্রেডমার্ক! (৩য় পর্ব)
প্রফেসর ড. মো. নাসির উদ্দীন মিতুল
প্রিন্ট অ-অ+

মিনি সুইজারল্যান্ড ভ্রমণ শেষে ঘোড়া ছেড়ে গাড়ি ধরি। উদ্দেশ্য চন্দনওয়ারী, বেতাব ভ্যালি, অরুন ভ্যালি ও আপেল গার্ডেন ভ্রমণ। এখানেও পেহেলগাম ডেভেলপমেন্ট অথোরিটির বাজে পলিসি পর্যটককে অবাক করবে। শ্রীনগর থেকে উচ্চ মূল্যে সঙ্গে নিয়ে আসা ভাড়া করা গাড়ি এখানে চলবে না। গাড়ি রেখে মিনি সুইজারল্যান্ড দেখার জন্য আপনাকে যেমনি ঘোড়া ভাড়া করতে হয়েছিল ঠিক তেমনি এবার ওদের বিশাল গাড়ির বহর থেকে আপনাকে আলাদা গাড়ি ভাড়া করতে হবে। অনেক ধরনের গাড়ির মধ্যে যাত্রীর সংখ্যা ও ইচ্ছেনুযায়ী নির্ধারিত প্রি-পেইড রেটে গাড়ি ভাড়া করতে হবে। আমরা ২ হাজার ২০০ রুপি দিয়ে একটি ছোট্ট সেডান কার ভাড়া নিয়ে প্রথমে বেতাব ভ্যালী দেখতে যাই।


কোথাও বৃষ্টি ছিল না। ঝলমলে রোদে আমরা যাত্রা শুরু করি। অথচ বেতাব ভ্যালিতে পৌঁছে বৃষ্টির কবলে পড়ি। মিনিট বিশেক যেতেই ড্রাইভার চিনিয়ে দিলেন, এটি বেতাব ভ্যালি। আবার টিকেট! আবার টাকা! যন্ত্রণা দিচ্ছিল বৃষ্টি। সাথে প্রচণ্ড ঠান্ডা। একেবারে হাড় জমে যাওয়া বাতাস আর কনকনে ঠান্ডা। ছাতা কিংবা রেইনকোর্ট সঙ্গে ছিল না। বিপত্তিটা ঘটে সেখানেই। এরই মাঝে ট্যুর গাইড এসে বলে গেলো, ৮০ দশকের বিখ্যাত হিন্দি ছবি ‘বেতাব’ এর শুটিং এখানেই হয়। পেহেলগামবাসী তাই এর নাম দিয়েছে ‘বেতাব ভ্যালি’। সিনেমাটি দেখেছি ক্লাস সিক্সে পড়া অবস্থায়। তখন ভিসিআরের যুগ। সানি দেউল ও অমৃতা সিং অভিনীত এ সিনেমাটি তখন খুব দর্শকনন্দিত হয়েছিল।


বিশাল পাহাড়, লেক, হ্রদ, পাহাড়ি ঝর্ণাসমেত অপূর্ব এক প্রকৃতির মাঝে আমি যেন মুকুটবিহীন সম্রাট। ছোট ছোট কালভার্ট আর তার নীচ দিয়ে বয়ে চলা ঝর্ণার স্রোতধারাকে আমার ‘আবে হায়াত’ মনে হচ্ছিল। সবগুলো ঝর্ণা পাহাড়ের এক একপ্রান্ত বেয়ে অবশেষে মোহনায় মিলে গেছে। এই মোহনাই হচ্ছে ‘লিডার রিভার’। বেতাব ভ্যালি আর মিনি সুইজারাল্যান্ডের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে একটি পাহাড়ের চূড়ায় আর অন্যটি সমতলে। তবে পর্যটকদের জন্য পাহাড়ের চূড়া থেকেও বেতাব ভ্যালি দেখার ব্যবস্থা আছে। দারুণ লাগে। বিখ্যাত শিল্পীর আঁকা ছবিও এখানে হার মানবে। বার বার আপনার মনে হবে এ যেন স্বর্গীয় কোন এক কল্পলোক। থেকে যেতে ইচ্ছে করবে বাকী জীবন। মনে হবে লিওনার্দো কিংবা পাভেলোরা এখানে এলে হারিয়ে যেতেন প্রকৃতির এই অপরূপ স্নিগ্ধ সুন্দর শোভা দেখে।


এভাবে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে চলি চন্দনওয়ারীর দিকে। পাহাড়ের বুক বেয়ে কেবল ওপরে উঠছি আর উঠছি। প্রতি ৩০০ মিটার পরে এক একটি বাঁক। রাস্তার নীচে তাকালে যেন ভয়ে জীবন যায়! নিয়ন্ত্রণ হারালে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবো। ছোটবেলায় লক্ষন দাসের সার্কাসে যারা গ্লোবে মোটরসাইকেল রেস দেখেছেন, এ পথে যেতে যেতে আপনার সেই স্মৃতি পুনর্জীবিত হবে। এটা কনফার্ম। পাক্কা ৩০ মিনিট এভাবে গ্লোব রেসের পর ড্রাইভার চন্দনওয়ারীর এক্কেবারে টপে উঠে পার্কিং করলে আমরা নেমে গরম চা-পিয়াজু খাই। ফটোসেশন করে খুব একটা সুবিধা পাইনি কারণ বাইরে তখন বৃষ্টি হচ্ছিল।


কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে সোজা লিডার রিভার চলে আসি। উফ! এর সৌন্দর্য্য আমার পক্ষে বর্ণনা করা অসম্ভব। প্রবাহমান পাথর-নুরী আর বিশুদ্ধ ধবল-সাদা জলের ঝলকানিতে আপনার চোখে নেশা লেগে যাবে। আপনি ছুঁতে উদ্যত হবেন। হাত দিয়ে স্পর্শ করার জন্য পাগল হয়ে এর পানে ছুটে যাবেন। মন চাইবে কোনো একটি বড় পাথরের ওপর ঠায় কিছুক্ষণ বসে স্বর্গসুখ অনুভব করতে। পায়ের নীচ দিয়ে কলকলিয়ে পানির প্রবাহ বইছে। মাদকতায় ভরা এর কল-কল শব্দটা মনযোগ দিয়ে শুনুন। উপলব্ধিতে নিন। ভুলে যান সবকিছু। চোখ বন্ধ করুন। আমি স্বর্গসুখের গল্প শুনেছি। দেখিনি। এ যেন সাক্ষাৎ সেই স্বর্গ সুখ। পাঁচমিনিট, দশমিনিট, একঘণ্টা এখানে যথেষ্ট নয়। থেকে যেতে ইচ্ছে করবে অনন্তকাল। ধর্ম শাস্ত্রে ভালো কাজের পুরস্কার স্বরুপ যে স্বর্গের কথা বলা হয়েছে, তার বোধ হয় সেম্পল দেখার কাজটি এখানেই হয়ে গেলো।


প্রসঙ্গক্রমে, ইসলাম ধর্মে শুনেছি মুত্তাকীদের জন্য রয়েছে এমন জান্নাত যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত। তাতে থাকবে নির্মল পানির নহর, দুধের নহর যার স্বাদ অপরিবর্তনীয় এবং সেখানে তাদের জন্য থাকবে বিবিধ ফলমূল [সূরা মুহাম্মাদ: ১৫] ।


আহা! এ যেন মিলে গেছে হুবহু। লিভার রিডারের দুপাশে পাহাড় আর ঝর্ণা সর্বত্র। কাছ ঘেষেই আপেল, আখরোট আর ফিগের মত দূর্লভ স্বাস্থ্যসম্মত সারিবদ্ধ সব ফলের গাছ। ধর্ম শাস্ত্রের কথার সাথে এ মিল পুরো ভ্রমণটাকে চমকপ্রদ করে দেয়। রাত হয়ে এসেছে। শ্রীনগর ফিরে যাচ্ছি। মসলার রাজ্য বলে খ্যাত সেফ্রন থেকে যৎসামান্য মসলা কিনে হোটেলে ফিরে আসি। কাশ্মীরের প্রসিদ্ধ ‘কয়রা’ (এক ধরনের চা যাতে মিশ্রিত থাকে বেশ কয়েক ধরনের সুস্বাদু মসলা) খেতে ভুলিনি কিন্তু।


হোটেলের ম্যানেজার তাগাদা দিয়ে পাসপোর্ট চেয়ে নিলেন। গ্যান্ডোলার টিকেট অনলাইনে কাটবেন। সঙ্গে থাকা পাসপোর্ট তাঁকে দিয়ে তড়িঘড়ি করে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন গুলমার্গ ঘুরতে যাবো। খুব সকালে উঠতে হবে। ‘গুলমার্ক’ নামটা শুনলেই শাহরুখ খানের ‘জাব তাক হে জান’ ছবির কথা মনে পড়ে। সিনেমাটির শুটিং স্পট এটি। একসময় আমি খুব সিনেমা দেখতাম। তালিকায় কোনও বাদ বিচার ছিল না। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজী, চাইনিজ সব ধরনের সিনেমা দেখতাম। তবে এখন আর তা হয়ে উঠে না। মেয়ের হাতে রিমোর্ট থাকায় আগ্রহ মরে গেছে। মাঝে মধ্যে টিভিতে ভালো ছবি হলে দেখি। বলতে দ্বিধা নেই, আমার মেয়ে শাহরুখ খানের অন্ধ ভক্ত। শাহরুখ খান বলতে সে অজ্ঞান। জিদ ধরেছিল তাঁকে দেখতে সে ‘মান্নাতে’ যাবেই। আমার পুরো আইটিনারি চেঞ্জ করে কাশ্মীর বাদ দিয়ে বোম্বে যাওয়ার পক্ষে তার অবস্থান ছিল অনড়। ভাগ্যিস, তার মা তাঁকে পরের ট্রিপে নিয়ে যাবার অঙ্গীকার করে এ যাত্রায় নিস্তার পেলেন।


গুলমার্ক। বরফ পড়ছে হালকা। পাহাড়ের গায়ে সাদা চাদরের আলামত সবে শুরু। আরেক সপ্তাহ পড়ে এলে হয়তো এখানে ঢুকতে গরম ড্রেস ভাড়া করা প্রয়োজন পড়তো। কিন্তু মাসটি অক্টোবর। তাই বরফ পড়া শুরু হয়নি। ফেরদৌসের এ্যানোভা সমতল ভূমি শেষ করে এগিয়ে যাচ্ছে গুলমার্গের স্পটের দিকে। সাপের মত গাড়িটি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ওপরে উঠতে থাকে। মনে হয় এই বুঝি বাঁক শেষ। কিন্তু না। গুলমার্গ ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই চক্ষু ছানাবড়া! দূরের সাদা পাহাড়গুলো যেন আমাদেরকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। নিচের সবুজ ভ্যালি থেকে আমরা ক্রমান্বয়ে আকাশ পানে উড়ছি। বরফ নেই। তাই মিষ্টি রোদে পায়ে হেঁটে গুলমার্গ ভ্যালি ঘুরে দেখি। আগের রাতে হোটেল ম্যানেজার রোপ-ওয়ের তিনটে টিকেট কেটে প্রিন্ট করে দিয়েছিল। তা দেখিয়ে গ্যান্ডোলায় উঠে বসি। ১৫ মিনিটের মতো সময় লাগে ফেজ-ওয়ান সম্পন্ন করতে। যেদিকেই চোখ যায় পাহাড় আর তার শুভ্র সাদা মেঘের খেলা। গ্যান্ডোলা থেকে ফেজ ওয়ানে নেমে টের পাচ্ছিলাম শ্বাসকষ্ট। আমার স্ত্রীতো এক পর্যায়ে মাটিতে বসে পড়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েক হাজার ফিট ওপরে হওয়ায় ব্রিদিং সমস্যা আমিও টের পাচ্ছিলাম। তবে ভয় পাইনি। কারণ আমার একমাত্র ছেলের কাছ থেকে এ বিষয়ে আগেই টিপস নেয়া ছিল। সে আমেরিকার নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে।


বিশ্ববিদ্যালয়টিও ভূ-পৃষ্ঠ থেকে সাত হাজার ফুট উঁচুতে বিধায় প্রথম প্রথম তাকেও এ সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। পড়ে অবশ্য এ্যাডজাষ্ট হয়ে যায়। এই মুহুর্তে আমার মনে হচ্ছে আমি যেন চন্দ্রতরী ঈগলের সেই নভোচারী নীল আর্মষ্ট্রং এর মত চাঁদের মাটিতে পা রাখছি।


আমি এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম। প্রায় ১০ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়। পায়ে হেঁটে সামনে যাওয়া খুব কঠিন। তবুও খানিক হেঁটে নির্জন একাকী এক পাথরের ওপর বসে ঝিমুচ্ছি। এমন সময় ফোঁস ফোঁস শব্দে ভীষণ ভয় পেয়ে যাই। থেমে থেমে হলেও শব্দটা স্পষ্ট। সাপের গর্জনের মত মনে হচ্ছে! শুনেছি, পাহাড়ি সাপ অনেক বিষধর! এতটা পথ একাকী হেঁটে এসেছি যে কাছাকাছি কাউকে দেখতেও পাচ্ছি না। আবিষ্কার করার চেষ্টা করি, শব্দটা কিসের? বড় পাথরের চারপাশ জুড়ে ছোট খাটো কিছু গুল্মলতা জন্মেছে। পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে সেই ঝুপরি গুল্মলতার দিকে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল। যা ভেবেছি তাই! সাপ! বিশালাকার না হলেও একেবারে ছোট নয়। মেরুন রঙয়ের। কিছু একটা মুখে নিয়ে মাটিতে আছড়ে মাড়ছে মনে হলো। আমার দিকে সাপটির খেয়াল নেই সত্যি কিন্তু আমি আর সামনে তাকাইনি। এক দৌড়! কমপক্ষে আধা কিলোমিটার ভোঁ-দৌড়ে লোকালয়ে এসে জানালে কেউ পাত্তাই দিল না। তবে এক কলকাতার দিদি বললো, ভাগ্য ভালো যে পায়ের নিচে পড়েনি কিংবা বড় অজগর ছিল না সেটি। দুটোর যে কোনও একটি হলে নাকি এই গুলমার্কে আমি ট্রেডমার্ক হয়ে যেতাম!


[রহস্যময় তাজমহল: ভালবাসার নাকি ঘৃণার? কোন অমোঘ আকর্ষণে দেশ-বিদেশের পর্যটকগণ ছুটে আসেন তাজমহলে? কেন একবার এই সৌধ না দেখলে জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়? কেন ফতেপুর সিক্রির ইতিহাস রূপকথার কল্পকাহিনী হয়ে আজো মানুষের হৃদয়ে দোলা দেয়? ইতিহাসের আলোকে যুক্তি-তর্কসহ লেখকের মতামত জানতে চোখ রাখুন আগামী পর্বে।]


লেখক: প্রফেসর ড. মো. নাসির উদ্দীন মিতুল, ডিন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।


বিবার্তা/এসএফ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com