বৈশ্বিক সংকট ও আমাদের হীনমন্যতা
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২২, ১৮:৩০
বৈশ্বিক সংকট ও আমাদের হীনমন্যতা
মো. হাফিজুল ইসলাম হাফিজ
প্রিন্ট অ-অ+

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন ছিল সুবর্ণরেখার আলোকছটার মতো প্রজ্জ্বলিত।


স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫০ বছর পর— করোনা মহামারিকে পশ্চাতে ফেলে দেশের অর্থনীতি সার্বিকভাবে এগিয়ে গিয়েছে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও খাদ্য সংকটে যখন উন্নত ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে— তখন বাংলাদেশ একটা স্থিতিশীল অবস্থা ধরে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে।


বর্তমানে বিশ্ববাজারে সব খাদ্য পণ্যের দাম প্রায় ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হওয়ার রেকর্ড গড়েছে। দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার ৭.৫% ঠেকেছে। আর ব্রিটেনে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিক্ষোভ করেছে মানুষ। ইউরোজোনে যে ১৯টি দেশে ইউরো মুদ্রা ব্যবহার করে সেসব দেশে মূল্যস্ফীতি ইউরো মুদ্রা চালুর পর সর্বোচ্চ।


এই পরিস্থিতিতে জীবন-মানের ব্যয়, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে এটা খুবই স্বাভাবিক। তবে এই স্বাভাবিক বিষয়টিকে নিয়ে বিরোধী দলের রাজনীতি বলেন আর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য বলেন কোনোটাই থেমে নাই।


একটা পক্ষ আছে যারা করোনা পরবর্তী যুদ্ধে টালমাটাল বিশ্ব পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এবং এটাকে পুঁজি করে দেশ দেউলিয়া প্রচারণায় ব্যস্ত। আর একটা পক্ষ আছে তাদের কাউন্টার দিতে গিয়ে জনগণের পালস না বুঝে সময় অসময় দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য নিয়ে— যারা আজ বিভিন্ন সভা সমাবেশ জনগণের সামনে দেশের দেউলিয়াত্ব প্রমাণে ব্যস্ত। তাদেরও বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি প্রেক্ষিতে প্রকৃত সত্য জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত। এটা না করে যদি তারা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিকে এড়িয়ে নিজেদের স্বার্থে এবং সরকারের বিরোধিতার খাতিরেবিরোধিতা করতে থাকে তবে সেটা হবে জনগণের সাথে মহা প্রবঞ্চনা। অবশ্যই বঙ্গদেশের সহজ সরল মানুষগুলোর সাথে সহজেই প্রবঞ্চনা করা যায়, প্রলুব্ধ করা যায় আবার গুজব ছড়িয়ে মধ্য রাতে রাস্তায় ও নামানো যায়।


প্রবঞ্চনা কেন বলছি! করোনা পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও খাদ্য সংকট, অনাবৃষ্টি, দাবানলের প্রভাব বিশ্বের সমগ্র অঞ্চলের মানুষের উপর পড়তে শুরু করেছে। আপনি, আমি, আমরা সবাই ইতোমধ্যে এই পরিস্থিতির স্বীকার হতে শুরু করেছি। যারা আজ সভা সমাবেশে দাড়িয়ে জোর গলায় এই পরিস্থিতির পক্ষে বিপক্ষে বলছেন তারাও এই পরিস্থিতির প্রভাবমুক্ত নয়। শরীরের ময়লা তেল কিংবা লোশন দিয়ে ঢাকার চেষ্টা নিতান্তই বোকামি।


বর্তমান বিশ্বের এই খাদ্য ও জ্বালানি সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি কোনোটাই সরকার বা বিরোধীদলের সৃষ্টি নয়। বরং বিগত এক দশকের বেশি সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বহু অর্জনের কারণে এই টালমাটাল বিশ্ব পরিস্থিতি সামাল দেয়াটা সহজ হচ্ছে। এই পরিস্থিতির দায়ভার অন্যের উপর চাপিয়ে জনগণকে ভুলপথে পরিচালনার চেষ্টাই জনগণের সাথে প্রবঞ্চনা। এই বিষয়গুলো নিয়ে রাজনীতি করা, জনগণকে প্রলুব্ধ করাটা নিতান্তই দেশ ও দেশের মানুষের সাথে প্রতারণা। এতে করে দেশ ও দেশের জনগণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।


বর্তমান পরিস্থিতিকে পুঁজি করে বিরোধী দলগুলো জনগণকে সরকার বিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করছে এবং করবে। জনগণের কাছে এই পরিস্থিতি সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরছে এবং ধরবে। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এই সময়ে বিরোধী দলগুলোর সভা সমাবেশে মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে এটা অস্বীকার করা যাবে না।


তবে ক্ষমতাসীনদের এগুলো হালকাভাবে দেখা এবং নগণ্য হিসেবে প্রচার করা কতটা সমীচীন আমার বোধগম্য নয়। "শত্রুর শক্তিমত্তাকে দুর্বল বা ছোট করে উপস্থাপন করাটা নির্বুদ্ধিতা। বরং সেটাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নেয়াটাই ধূর্ততা"।


ক্ষমতাশীন দল ও সরকারের উচিত বিরোধী দলগুলো যখন ক্ষমতায় ছিল তখন বিশ্ব পরিস্থিতি কেমন ছিল, তখন সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের অবস্থা কী ছিল, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল, দেশে দুর্নীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার অবস্থা কেমন ছিল সেগুলো জনগণের কাছে তুলে ধরা।


একইসাথে মহামারি করোনা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পূর্বে তুলনামূলক বাংলাদেশের অবস্থা কতটা ভালো ছিলো সেগুলো জনগণের কাছে স্পষ্ট করা। ঠিক এই জায়গাতে ক্ষমতাশীন দলের দুর্বলতা পরিলক্ষিত। একমাত্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য অন্য কেউ দায়িত্বশীল কথা বলেনি বরং অনেকেই বেসামাল মন্তব্য করেছেন।


বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল-সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, এনজিও, সর্বোপরি শিক্ষিত-সচেতন নাগরিকদের উচিত দেশের জনগণকে সচেতন করা। বর্তমান পরিস্থিতির কারণগুলো মানুষের সামনে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা। প্রয়োজনবোধে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা এবং এই পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে মোকাবিলা করতে সকলকেই উদ্বুদ্ধ করা।


বর্তমান সমস্যা ও সংকট কেবল জাতিগত সমস্যা বা সংকট নয় বরং বৈশ্বিক। এককভাবে ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দল এই সংকট মোকাবিলা করার জন্য যথেষ্ট নয়। এই সংকট মোকাবিলার জন্য সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সংকট মোকাবিলায় কাজ করতে হবে। এই কাজগুলো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেশের সকল শ্রেণির মানুষকে সচেতন করতে না পারলে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কষ্টসাধ্য হবে।


লেখক: মো. হাফিজুল ইসলাম হাফিজ, বিএসএস (অনার্স), এমএসএস (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com