‘হাওয়ার রাজনীতি, রাজনীতির হাওয়া’
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২২, ২০:২৭
‘হাওয়ার রাজনীতি, রাজনীতির হাওয়া’
আবু নাছের ভূঁইয়া
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ৫৩২ ডলারে আসতে ১৯৭২-৭৩ সাল থেকে শুরু করে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ৩৪ বছর সময় লেগেছিল। ২০০৭-৮ সাল থেকে ২০১৯-২০ এ এসে মাথাপিছু আয় দাঁড়ায় প্রায় ২০৬৪ মার্কিন ডলারে। যা ১১ বছরে প্রায় চারগুণ হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে আমাদের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯০০ ডলার। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ব্যাপারটা হচ্ছে নেতৃত্বের দূরদর্শিতা যেখানে এক সময় বিএনপি ব্যর্থ হয়েছিল, সেই জায়গায় শেখ হাসিনা তার নেতৃত্বে ক্যারিশমা দেখিয়েছেন। বলতে গেলে- কাল যেখানে আঁধার ছিল, আজ সেখানে আলো। কাল যেখানে মন্দ ছিল, আজ সেখানে ভালো। আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে ২০০১ থেকে ২০০৬ খালেদা জিয়ার শাসনামলে। ২০০১ এ যুদ্ধাপরাধী জামাত জোট নিয়ে ক্ষমতায় আসেন খালেদা জিয়া । প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া হলেও দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থায় একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপন করে দুর্নীতির বরপুত্র তারেক জিয়া ও তার কলঙ্কজনক অধ্যায়ের আঁতুড়ঘর হিসেবে অধিক পরিচিত হাওয়া ভবন। দেশে হাওয়া ভবনের কল্যাণে জর্জ মিয়া নাটক থেকে শুরু করে এমন কোন খাত নেই যে খাতে চরম দুর্নীতি দুর্দশার চিত্র বাংলাদেশ দেখেনি। যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ খাত, স্বাস্থ্যখাত, অর্থনীতি, ব্যাবসা-বানিজ্য, সন্ত্রাস ও জঙ্গি মদদ দাতাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই তখনকার বাংলাদেশ ছিল দুর্নীতিতে ঠাসা। যার পেছনে কলকাঠি নাড়াতেন হাওয়া ভবনের দোসর তারেক জিয়া। বিএনপির তৎকালীন নেতারা এসব কর্মকাণ্ডে দুর্নীতির বরপুত্র তারেক জিয়াকে মি. টেন পার্সেন্ট সহ ইত্যাদি নামে অভিহিত করতেন। তখন দেশ দুর্নীতির উৎসবে পাঁচ বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়, মোটা দাগে শিরোনাম হয় দেশিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।


প্যারাডাইস পেপারস, কিংবা উইকিলিকস সব মাধ্যমেই উঠে আসে খালেদা জিয়ার এ সুপুত্রের(!) সীমাহীন দুর্নীতির তথ্য। তিনি ভেবেছিলেন এভাবেই বাংলাদেশে অন্ধকারের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন । ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে ক্ষমতার রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে। তার দুঃশাসন, সীমাহীন দুর্নীতি আর অরাজকতার মধ্যেই ১/১১ সরকার দেশে আবির্ভূত হয়, দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার হন তারেক জিয়া। অথচ তার উল্টো চিত্রও আজকের বাংলাদেশে আছে। এ দেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তার সততা এবং দুর্নীতিমুক্ত থাকার কারণে বিশ্ব দরবারে অনন্য এক উচ্চতায় আসীন হয়েছেন। সম্প্রতি ইউরোপের একটি গবেষণা সংস্থা ‘পিপলস এন্ড পলিটিক্স’ বিশ্বের ৫ সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের চিহ্নিত করেছেন, যাদেরকে কোনো দুর্নীতি স্পর্শ করেনি। এদের বিদেশে কোন ব্যাংক একাউন্ট নেই, উল্লেখ করার মতো সম্পদও নেই। ১৭৩ দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কে ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে স্কোর করা হয়। এই তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ,তাঁর স্কোর ৯০, দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং, তাঁর স্কোর ৮৮। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮৭ স্কোর পেয়ে এ তালিকায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইরনা সোলবার্গ এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম স্থান অধিকার করেন তাদের স্কোর ছিল যথাক্রমে ৮৫ এবং ৮১। এ প্রতিবেদনে আরও বলা হয় দেশের ৭৮ শতাংশ মানুষ মনে করে শেখ হাসিনা দুর্নীতিমুক্ত এবং লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে। ছোটখাটো দুর্নীতি ও তাকে স্পর্শ করতে পারেনি ।


১/১১ তে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তারেক জিয়া বিভিন্ন দুর্নীতির কথা স্বীকার করেছেন। ২০০৮ সালে তিনি মুচলেকা দিয়ে জামিনে মুক্ত হন। মুচলেকা দিয়েছিলেন যে, তিনি আর কোনদিন রাজনীতি করবেন না। এরপর তিনি লন্ডনে চলে যান এবং সেই থেকে লন্ডনে বসবাস করছেন। এরই মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা, মানি লন্ডারিং মামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাসহ অন্যান্য মামলার রায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হন। এখন দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি হিসেবে লন্ডনে বিলাস বহুল জীবন যাপন করছেন। প্রশ্ন হচ্ছে এ বিলাসিতার উৎস কি? কোথা থেকে আসে এত গাড়ি-বাড়ি? বাংলা একটা প্রবাদ আছে ‘কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না’ এ তত্ত্ব তারেক জিয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ। তিনি লন্ডনে বসেও টাকা কামাচ্ছেন হাওয়া ভবন স্টাইলে, খুলেছেন হাওয়া ভবনের লন্ডন শাখা।


তাও আবার নির্বাচনী মনোনয়ন কেন্দ্রিক যা তিনি স্কাইপের মাধ্যমে সচল রেখেছেন। এক দিকে পাচার করা সম্পদ আর অন্য দিকে নির্বাচনী বাণিজ্য সব মিলে বিলাস বহুল জীবন । বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও ২০১৮ নির্বাচনে মনোনয়নের নামে তারেক রহমান সেখানে খুলে বসেন নির্বাচন কেন্দ্রিক মনোনয়ন বাণিজ্য কেন্দ্র। বিএনপির দুর্দিনের নেতাকর্মীরা তার এ মনোনয়ন বাণিজ্যের কাছে হেরে যান। মোটা অংকের নজরানা লন্ডনে পাঠাতে না পারার কারণে মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হন অনেকেই। টাকার জোরে ৩০০ আসনে ৯০০ জন মনোনয়ন পেয়ে যান। যাদের টাকার শক্তি রাজনৈতিক শক্তির চেয়েও অধিক। ব্যবসায়ী কিংবা অন্য যে কোন পেশার লোক, যাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার চেয়ে টাকার শক্তি বেশি এবং তারেক জিয়া তার চাহিদা পরিমাণ নজরানা পেয়েই তাদেরকে মনোনয়ন দেন।


মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণেই বিএনপি’র আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া, চাঁদপুরে এহসানুল হক মিলন অথবা নারায়ণগঞ্জে তৈমুর আলম খন্দকারের মতো ত্যাগী নেতারা মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। তারেক রহমানের টাকার অংকে যারা মনোনয়ন হারান তাদের নেতা কর্মীরা বিএনপি অফিসে হামলা, ভাঙচুর, তালা লাগানোর মতো ঘটনা ঘটায়। বিএনপির কেন্দ্রীয় ও চেয়ারপারসনের কার্যালয়েও বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা হামলা করে, হামলা করে বিএনপি মহাসচিবের গাড়িতেও। বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের সামনে তারেক রহমানের মনোনয়ন বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সেদিন বিএনপি নেতারা স্লোগান দিচ্ছিল ‘হয় মনোনয়ন দাও, নয় টাকা ফেরত দাও’,‘ আশি বছরের বৃদ্ধ মা পরে আছেন জেলে, লন্ডনে বসে কোটি টাকার নমিনেশন বাণিজ্য করছে ছেলে’। কথায় আছে, ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান বানে’; তারেক জিয়া লন্ডনে গিয়েও হাওয়া ভবন কেন্দ্রিক কৃতকর্ম থেকে নিজেকে সরাতে পারেননি। সেখানেও খুলে বসেন আরেক হাওয়া ভবন। যেখানে চলে সীমাহীন মনোনয়ন বাণিজ্য। একই আসনে একাধিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়ে তিনি বিএনপির মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছিলেন যা বিএনপির রাজনীতিকে আরো একবার কলুষিত করে ।


বাস্তবে এত কিছুর পরেও তারেকে জিয়ার কোন পরিবর্তন হয়নি। তিনি যদি ২০১৮ নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে লন্ডনে ‘হাওয়া ভবন’ খোলেন, তাহলে দেশে ফিরতে পারলে তিনি কী কী করবেন? তারেক রহমান লন্ডনে তার ইনকাম ট্যাক্সের ফাইলে দেখিয়েছেন, আয়ের উৎস জুয়া খেলা (লন্ডনে জুয়া খেলা বৈধ)। বাস্তবে তিনি যে কত কিছু নিয়ে জুয়া খেলতে পারেন তার প্রমাণ এ মনোনয়ন বাণিজ্য। টাকার বিনিময়ে মনোনয়নে এমন নীতি অবলম্বন করার কারণেই সমালোচকরা মনে করেন, বিএনপি এলিটদের ক্লাব।


শেষ করছি উইকিলিকসেরি একটি তথ্য দিয়ে, ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস ২০০৮ সালের ৩ নভেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে এক গোপন তারবার্তায় তারেক সম্পর্কে লিখেন। যা পরে উইকিলিকসের ফাঁস করা নথিতে পাওয়া যায়, তিনি লিখেন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ও ভয়ঙ্কর এবং একটি দুর্নীতি পরায়ণ সরকার ও বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার প্রতীক। তারেক রহমানের প্রকাশ্য দুর্নীতি মার্কিন সরকারের তিনটি লক্ষ্যকে, যথা- গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন এবং জঙ্গিবাদ নির্মুল করার মিশনকে প্রচণ্ডভাবে হুমকির সম্মুখীন করেছে। আইনের প্রতি তার প্রকাশ্য অশ্রদ্ধা বাংলাদেশে জঙ্গিদের মূল শক্ত করতে সহায়তা করেছে।


লেখক: শিক্ষক ও গবেষক


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com