আমাদের আত্মমর্যাদার প্রতীক "পদ্মাসেতু"
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২২, ২১:৩০
আমাদের আত্মমর্যাদার প্রতীক
কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি
প্রিন্ট অ-অ+

ছোট্ট একটি দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। বিশ্ব মোড়লদের কাছে আমরা পরিচিত ছিলাম তলাবিহীন ঝুড়ি হিসাবে। সেই দেশের এক সাহসী দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের আত্মবিশ্বাসের রূপ আমাদের "পদ্মাসেতু"। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র, বিশ্ব মোড়লদের চোখ রাঙানি কিংবা বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতি তত্ত্বকে পেছনে ফেলে আজ আমাদের পদ্মাসেতু উদ্বোধনের অপেক্ষায়। যার একক কৃতিত্ত্ব বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার।


১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১টি স্প‌্যান বসানোর মধ্য দিয়ে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৮ দশমিক ১০ মিটার প্রস্থ দেশের সর্ববৃহৎ এই সেতুর। এই সেতু নির্মানের ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ টি জেলার অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে। দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে উঠবে শিল্প প্রতিষ্ঠান। মানুষের যাতায়াত হবে আরো সহজতর। এর ফলে পুরো দেশের অর্থনৈতিক চিত্রপট বদলে যাবে।


দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি পূর্বের তুলনায় ১.২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। স্বাধীনতার পর থেকে যোগাযোগ ব্যবস্থার কারনে পিছিয়ে পড়েছিলো দক্ষিণবঙ্গের ৩ বিভাগের মোট ২১ টি জেলা। এখন সরাসরি ঢাকার সাথে যাতায়াত সহজতর হবে এই অঞ্চলের মানুষের।


অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই সেতুর ফলে শুধুমাত্র দক্ষিণাঞ্চল নয় পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতিই বদলে যাবে। সিপিডি'র গবেষণায় বলা হয়েছে, পরবর্তীতে পদ্মা সেতু দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ, বাণিজ্য, পর্যটনসহ অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই অঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান,বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়তে সহায়তা করবে।


এই সেতু নির্মাণ করতে শেখ হাসিনাকে দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়েছিলো। বঙ্গবন্ধুর মতো শেখ হাসিনাও একজন ভিশনারি লিডার। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেই তিনি পদ্মাসেতু নির্মাণ করার তাগিদ অনুভব করেন। ১৯৯৮-৯৯ সালে বিশেষজ্ঞ দল সেতুর ফিজিবিলিটি স্টাডি করেন। বিভিন্ন ভাবে পদ্মাসেতুর কাজকে তিনি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট চক্রান্তের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে লুটপাটে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পদ্মাসেতু নির্মাণে কোন পদক্ষেপ তারা গ্রহণ করেনি। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে শেখ হাসিনা আবার পদ্মাসেতুর কাজে হাত দেন। জননেত্রী শেখ হাসিনা বিচক্ষণতার সাথে ২০১১ সালে পদ্মাসেতুতে রেলপথ সংযোজনের নির্দেশ দেন। ৬.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১৮.২ মিটার প্রস্থের পদ্মাসেতু মুন্সিগঞ্জের লৌহজং এবং শরীয়তপুরের জাজিরাকে সংযুক্ত করেছে। সেতুটিতে সড়ক ও রেলপথ ছাড়া আরো আছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অপটিক্যাল ফাইবার লাইন।


প্রথমে এই সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক আমাদের সহায়তা করতে চেয়েছিলো। সে অনুযায়ী চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিলো ২০১১ সালে। কিন্তু আমাদের দেশের ভিতরের কিছু ষড়যন্ত্রকারী পদ্মাসেতুর ঋণের বিনিময়ে সরকার থেকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিতে চেয়েছিলো। তারা বিশ্ব মোড়ল আমেরিকার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে চাপ দিয়ে কিছু কাজ করিয়ে নিতে চেয়েছিলো। ওরা ভুলে গিয়েছিলো শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু কন্যা। যে জীবন দিতে পারে কিন্তু আপোষ করতে পারেনা। যার ফলে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ আনে বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাদের কেউ পদত্যাগ করেন এবং কয়েকজনকে বদলী করা হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক তারপরেও সন্তুষ্ট হয়নি। তখন জননেত্রী শেখ হাসিনা নিজেদের অর্থে পদ্মাসেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। তখন অনেক বিদেশী দালাল জুজুর ভয় দেখানো শুরু করেন। আমাদের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে বলেও মতামত দেন। কিন্তু তিনি শেখ হাসিনা- তিনি হারতে জানেন না। তিনি পদ্মাসেতু নির্মাণ ও মানুষের ভাগ্য বদলের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। বিশ্বব্যাংক তখন দুর্নীতির অভিযোগ এনে মামলা করেন। কানাডার আদালত ১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ার জন্য মামলাটি খারিজ করে দেন। এবং পদ্মাসেতু প্রকল্পে কোন দুর্নীতি হয়নি হলে মতামত দেন। কানাডার আদালত কিংবা বাংলাদেশের দুদকের কাছে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির কোন প্রমাণ দেখাতে পারেনি। যার সবটাই ছিলো আসলে অনেক বড় ষড়যন্ত্র।


এখনো কুচক্রী মহল পদ্মাসেতু নিয়ে গর্ব করতে পারে না। তারা দুর্নীতির গল্প সাজায়। কিন্তু তারা জানেনা পদ্মাসেতু পৃথিবীর অন্য যে কোন সেতুর চেয়ে অনন্য।


পানি প্রবাহের বিবেচনায় বিশ্বে আমাজন নদীর পরেই খরস্রোতা পদ্মার অবস্থান। মাটির ১২০ থেকে ১২৭ মিটার গভীরে গিয়ে পাইল বসানো হয়েছে এই সেতুতে। পৃথিবীর অন্য কোনো সেতু তৈরিতে এত গভীরে গিয়ে পাইল প্রবেশ করাতে হয়নি।


ভূমিকম্প সহনীয় করতে এই সেতুতে ব্যবহার করা হয়েছে ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং’ এর সক্ষমতা ১০ হাজার টন। এখন পর্যন্ত কোনো সেতুতে এমন সক্ষমতার বিয়ারিং ব্যবহার হয়নি। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় হবে আমাদের পদ্মাসেতু।


বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রেন ব্যবহার করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে পদ্মা সেতু। স্প্যান বসাতে যে ক্রেনটি ব্যবহৃত হয়েছে সেটি আনা হয়েছে চীন থেকে। প্রতি মাসে এর ভাড়া বাবদ গুনতে হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। সাড়ে তিন বছরে মোট খরচ হয়েছে ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বিশ্বে প্রথম কোনো সেতু তৈরিতে এত দীর্ঘদিন ক্রেনটি ভাড়ায় থেকেছে। এই ক্রেনটির বাদাম দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা।


এই প্রথম সেতু নির্মাণে কংক্রিট এবং স্টিল উভয়ই ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বে আর কোনো সেতু নির্মাণে কংক্রিট এবং স্টিল একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়নি।


এইসব দিক বিবেচনায় পদ্মাসেতু অন্য যে কোন সেতুর তুলনায় অনন্য।


দেশের ষড়যন্ত্রকারীরা এখন বিভিন্ন তত্ত্ব আনছে। এসব তারা করছে অন্তর্জ্বালা থেকে। তারা ভারতের ভূপেন হাজারিকা সেতুর সাথে পদ্মাসেতুর তুলনা করছে। যেখানে ভূপেন হাজারিকা সেতু এক তলা কিন্তু পদ্মাসেতু দুই তলা। ভূপেন হাজারিকা সেতুর প্রস্থের তুলনায় পদ্মাসেতুর প্রস্থ দেড় গুন বেশি। ভূপেন হাজারিকা সেতুর পাইল লোড ক্যাপাসিটি ৬০ টন কিন্তু পদ্মাসেতুর ক্যাপাসিটি ৮২০০ টন। ভূপেন হাজারিকা সেতুর পিলারের ওজন ১২০ টন কিন্তু পদ্মাসেতুর পিলারের ওজন ৫০০০০ টন। পাকিস্তানি দালালদের এই অন্তর্জ্বালা থাকবেই। আর বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।


বাংলাদেশে সম্ভবত একজন মানুষ-ই বিশ্বাস করতো আমাদের নিজেদের অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ সম্ভব। তিনি আমাদের বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এসেছেন আমাদের দেশের মানুষের ভাগ্য বদল করতে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে। তার নেতৃত্বে আমরা আজ গর্ব করে বলতে পারি "বিশ্ববাসী দেখো, আমরা আজ তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ নই। আমরা পারি, আমরা করে দেখিয়েছি"। তিনি আজকে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিচ্ছেন। তিনি কোন মোড়লের চোখ রাঙানিতে ভয় পান না। তার দৃঢ় নেতৃত্বের ফসল আমাদের আজকের পদ্মাসেতু। যা আমাদের আত্মমর্যাদার প্রতীক। আগামীকাল ২৫ জুন আমাদের এই স্বপ্নেরসেতু উদ্বোধন হবে। এদেশের মানুষ চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবে জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। যার হাত ধরে আজ এগিয়ে যাচ্ছি আমরা, আমাদের বাংলাদেশ।


জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু
জয় শেখ হাসিনা।


লেখক: কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি, সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ যুব মহিলালীগ।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com