তদন্তে কেন্দ্রীয় বিএনপি
টাকায় মেলে বিএনপির পদ, বঞ্চিত ত্যাগীরা
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২২, ০৮:৩৪
টাকায় মেলে বিএনপির পদ, বঞ্চিত ত্যাগীরা
বাউফল থেকে এম. এ. হান্নান
প্রিন্ট অ-অ+

পটুয়াখালীর বাউফলে টাকা বিনিময় গোপনে উপজেলা ও ১৫টি ইউনিয়নে বিএনপির কমিটি গঠনে ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন, স্বজনপ্রীতি, নিস্ত্রিয়, দলীয় কর্মকাণ্ডে জড়িত না ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের  পদ-পদবী দেয়াসহ নানান অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ আমলে নিয়েছেন দলের মহাসচিব। বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমানকে দেওয়া হয়েছে তদন্তের দায়িত্ব। আগামী ২৮ নভেম্বর জেলা বিএনপি কার্যালয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হবে। এছাড়াও  স্থগিত করা হয়েছে উপজেলা বিএনপির ২৬ নভেম্বর, শনিবারের  সম্মেলন।



এদিকে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাহিরে থাকা দল বিএনপি যখন সরকার বিরোধী আন্দোলনে ব্যস্ত, তখন বাউফল বিএনপির এমন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তৃণমূল বিএনপি।



উপজেলা বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, গত বছরের ২৫ নভেম্বর উপজেলায় মো. শাহজাদা মিয়াকে আহবায়ক, মো. অলিয়ার রহমানকে সদস্য সচিব ও  হুমায়ন কবিরকে আহবায়ক, এটিএম মিজানুর রহমানকে সদস্য সচিব করে পৌর বিএনপির কমিটি ঘোষণা করে জেলা বিএনপি। সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল আলমকে করা হয় পৌর বিএনপির সদস্য ও তাঁর সহধর্মিণী সালমা আলম লিলিকে উপজেলা বিএনপির সদস্য করা হয়। এ নিয়ে সমালোচনাও হয়।


উপজেলা কমিটির আহবায়ক ও সদস্য সচিব বিভিন্ন ইউনিয়নের কমিটি গঠন নিয়ে বাণিজ্যে মেতে ওঠেন। টাকার বিনিময় কমিটি দেয়া নিয়ে আহবায়ক শাহজাদা মিয়া, সদস্য সচিব অলিয়ার রহমান ও যুগ্ম-আহবায়ক আপেল মাহমুদ ফিরোজের কথোপকথনের অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এনিয়ে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। ফলে আহবায়ক শাহজাদা মিয়া ও সদস্য সচিব অলিয়ার রহমানকে অব্যাহতি দিয়ে আব্দুল জব্বারকে আহবায়ক ও আপেল মাহমুদ ফিরোজকে সদস্য সচিব করা হয়। যা নতুন সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।


অভিযোগ আছে, আহবায়ক জব্বার ২০১৬ সালে বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপাশা ইউপি নির্বাচনে নৌকার পক্ষে কাজ করেছেন। অপরদিকে সদস্য সচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজেরও কমিটি বাণিজ্যের সাথে জড়িত। যার কথোপকথনের অডিও ফাঁস হয়েছিল।


এই দুই নেতাও একই পথে হাঁটতে শুরু করেন, শুরু করেন কমিটি বাণিজ্য। ঘোষণা করা হয় একের পর এক ইউনিয়ন বিএনপির কমিটি। এসব কমিটি গঠন নিয়ে আবারও পদ-পদবি বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন, নিস্ক্রিয়দের পদ-পদবি দেয়া সহ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।


ঢাকায় বসে ত্যাগীদের পদ না দিয়ে  টাকার বিনিময়ে গোপনে কমিটি ঘোষণার প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপির মহাসচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয় উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক  মো. তসলিম তালুকদার ও মো. আনিছুর রহমান।


এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে ২৬ নভেম্বর, শনিবারের উপজেলা বিএনপির সম্মেলন বন্ধ ঘোষণা ও ইউনিয়ন কমিটির বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বরিশাল বিভাগীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমানকে দায়িত্ব দেয়া হয়।


উপজেলা বিএনপির একাধিক যুগ্ম আহবায়ক ও বিভিন্ন ইউনিয়ন বিএনপির নেতারা জানান, আহবায়ক আব্দুল জব্বার ও সদস্য সচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজ ঢাকা বসে টাকার বিনিময় গোপনে বিভিন্ন ইউনিয়ন কমিটি ঘোষণা করেন। যাতে ত্যাগীদের বাদ দিয়ে নিস্ক্রিয়, অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের পদ দেওয়া হয়। যারা দলীয় কর্মকাণ্ডে জড়িত না, ঢাকায় ব্যবসা বাণিজ্য করেন।


তারা আরও অভিযোগ করেন, গত ২১ নভেম্বর উপজেলা কালাইয়া ইউনিয়ন বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটিতে ঢাকায় বসবাসরত মো. জসিম উদ্দিন তুহিনকে সভাপতি ও ন্যাপের রাজনীতির সাথে যুক্ত আতাহার উদ্দিন সিকদারকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান মাতুব্বর  ও সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. নুর হোসেন খানকে  করা হয় সদস্য। বাউফল ইউনিয়ন বিএনপির কমিটিতে ঢাকায় বসবাসরত  মো. ফারুক গাজীকে সভাপতি করা হয়েছে। দাশপাড়া ইউনিয়নে সাবেক সভাপতি আব্দুল খালেককে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগে ইউপি চেয়ারম্যানের আত্মীয় ও ঢাকায় বসবাসরত মো. আলী আজমকে সভাপতি ও দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় মো. মজিবুর নামের এক ব্যক্তিকে করা হয় সাধারণ সম্পাদক। একই অবস্থা চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে। সাবেক সভাপতি ও ত্যাগী নেতা সামসুল হক হাওলাদারকে বাদ দিয়ে বেল্লাল বেপারীকে সভাপতি করা হয়। যিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয়।  এছাড়াও বাউফলে বিএনপির দূর্গখ্যাত ধুয়িলা ইউনিয়নে স্বজনপ্রীতি করে উপজেলা আহবায়কের ভাই মো. নজরুল ইসলামকে সভাপতি করা হয়েছে। নজরুল ইসলাম ব্যবসার কাজে ঢাকায় থাকেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে তার (নজরুল ইসলাম) যোগাযোগ রয়েছে।  এছাড়াও  সূর্যমনি বিএনপির সভাপতি মো. মনির ও নাজিরপুর বিএনপির সভাপতি মো. হেলাল মুন্সি ঢাকাতে থাকনে। এমন অভিযোগ কেশবপুর, নওমালা, কালিশুরী ইউনিয়ন বিএনপির কমিটি নিয়েও।


উপজেলা বিএনপির একাধিক যুগ্ম আহবায়ক বিবার্তাকে জানান, বাউফল বিএনপির জনপ্রিয় নেতা ও সাবেক এমপি শহিদুল আলম তালুকদারকে কোণঠাসা করার জন্য কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক মুহাম্মাদ মুনির হোসেন মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। জড়িয়ে পড়েছেন দলীয় কোন্দলে। পৃথকভাবে করেন দলীয় প্রোগ্রাম। উপজেলা বিএনপির এই বিভেদ ও বিশৃঙ্খলার জন্য ওই নেতাই দায়ী।


কালাইয়া বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক পদ-বঞ্চিত মো. শাহজাহান মাতুব্বর বিবার্তা প্রতিনিধিকে বলেন, আমি দুইবার সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। দলের জন্য অসংখ্যবার নির্যাতিত হয়েছি। আমাকে করা হয়েছে ৪৮ নম্বর সদস্য।


উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক তসলিম তালুকদারের কথা হয় বিবার্তার সাথে। তিনি বলেন, দুর্দিনে দলের জন্য কাজ করেছেন এমন ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে টাকার বিনিময় স্বজনপ্রীতি করে অদক্ষ, অসাংগঠিনক  এবং এলাকায় থাকেন না এমন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রেখে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক মোহাম্মাদ মুনির হোসেনের নির্দেশে ঢাকায় বসে  কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।  


এবিষয়ে জানতে উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আব্দুল জব্বারের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। অনেকবার চেষ্টা করেও বন্ধ পাওয়া যায় সদস্য সচিব আপেল মাহমুদের মোবাইল।


এবিষয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক স্নেহাংশু সরকার কুট্টি বিবার্তাকে বলেন, দলের মহাসচিব এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে বরিশাল বিভাগের সহ-সাংগঠনিক আকন কুদ্দুসুর রহমানকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন। তদন্ত সাপেক্ষে দল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে।


বিবার্তা/হান্নান/রোমেল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com