ঝাড়খণ্ড— একসঙ্গে পাহাড়, জলপ্রপাত, জঙ্গল, অভয়ারণ্য
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২২, ০৯:৪০
ঝাড়খণ্ড— একসঙ্গে পাহাড়, জলপ্রপাত, জঙ্গল, অভয়ারণ্য
পর্যটন ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

পাহাড়, জলপ্রপাত, জঙ্গল, অভয়ারণ্য সব কিছু একসঙ্গে পেতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন ঝাড়খণ্ড থেকে। শাল, পিয়াল, মহুয়ায় ঘেরা রাস্তা দিয়ে যেতে হঠাৎই দেখা পেয়ে যেতে পারেন গজরাজের। যাঁরা পাখি পর্যবেক্ষক, তাঁদের জন্য এখানে রয়েছে ১৭৪ প্রজাতির ভিন্‌ রাজ্যের পাখি। ঝাড়খণ্ড মূলত খনি অঞ্চল। তবুও এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য, সবুজের সমাহার আপনার মন ভরিয়ে দেবে।


পাহাড়, জঙ্গল, নদী, জলপ্রপাতে সুসজ্জিত এই রাজ্যের পাহাড়ের কোলে জঙ্গলের মধ্যে কটা দিন কাটিয়ে যাওয়া মানে শরীর আর মনের দারুণ প্রশান্তি। কম খরচে কটা দিন শান্তিতে কাটাতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন ঝাড়খণ্ড থেকে। এই রাজ্যের আদিবাসীদের জীবনযাত্রাও বেশ আকর্ষণ করবে অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের। আর আরণ্যক জীবনের কটা দিনের স্মৃতি জায়গা করে নেবে মনেরমানচিত্রে।


ঝাড়খণ্ড গিয়ে কী কী দেখবেন?


রাঁচি


ঝাড়খণ্ডের সেরা জায়গা হল রাঁচি। রুক্ষ অথচ নির্মল সৌন্দর্য্যের অসাধারণ মেলবন্ধন এই ছোট্টো শহরটি। রাজ্যের যাবতীয় আধুনিক সুখ স্বাচ্ছন্দ্য রয়েছে এখানে। আবার সমতলভূমি, মালভূমি ও পার্বত্য ভূমির সমন্বয় এই শহর। রাঁচি পাহাড়ের চূড়া থেকে গোটা শহর দেখা একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা। রাঁচির শিব মন্দিরটি ধর্ম বিশ্বাসীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান। শ্রাবণ মাসে এই মন্দিরে ভক্তদের সমাগম বাড়ে। শহরে রয়েছে একটি কৃত্রিম হ্রদ। এর নাম কাঁকে হ্রদ। এই হ্রদে নৌকাচালনার সুবিধে রয়েছে। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যও অসাধারণ। এই জলাধারের পাশেই উঁচু পাথুরে টিলার উপর সাজানো রয়েছে 'রক গার্ডেন'। ১৯০৮ সালে রাঁচিতে বেড়াতে এসেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। শহরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ‘মোরাবাদী হিল’-এর উপর তিনি এক বাড়ি তৈরি করেছিলেন। তারপর থেকেই সেই পাহাড়ের নাম হয়ে যায় 'টেগোর হিল'। রয়েছে বিরসা মুণ্ডা চিড়িয়াখানা।


রাঁচি শহরের বাইরে আছে তিনটি জলপ্রপাত। দশম, হুড্রু এবং জোনহা জলপ্রপাত। রাঁচি শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে কাঞ্চি নদীকে ঘিরে রয়েছে দশম জলপ্রপাত। প্রায় ১৪৪ ফিট উঁচু থেকে কাঞ্চির জল দশটি ধারায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে সুবর্ণরেখার বুকে। জলের বুকে দেখা যায় রামধনুর সাতটি রং। পাহাড় অরণ্য মিলিয়ে দশম জলপ্রপাত একটি অপূর্ব সুন্দর স্থান।


রাঁচি থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে সুবর্ণরেখা নদীর প্রায় ৩২০ ফিট উপর থেকে ঝরনা হয়ে নেমে এসেছে বিখ্যাত হুড্রু জলপ্রপাত। ঘোরানো পাথরের সিঁড়ি দিয়ে নদীতে নামা যায়। এখানে যাওয়ার পথে পড়ে বেতলসুদ বাঁধ। বাঁধের ধারে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতাই আলাদা।


রাঁচি শহর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার গদূরে অবস্থিত জোনহা জলপ্রপাত। যদিও এটি গৌতম ধারা নামে বেশি জনপ্রিয়। গৌতম বুদ্ধের নাম অনুসারেই এই জলপ্রপাতের নাম দেওয়া হয়েছে। পাথুরে সিঁড়ি ভেঙে জলের কাছে যাওয়া যায়। ছবি তোলার জন্যও এই জলপ্রপাতগুলি বেশ আদর্শ।


দেওঘর


পুরোনো আমলের মধ্যবিত্ত বাঙালি হাওয়া বদলের জন্য দেওঘর এবং মধুপুরের বড়ই ভক্ত ছিল। ঝাড়খণ্ডের স্বাস্থ্যকর জায়গাগুলির মধ্যে অন্যতম দেওঘর।


বৈদ্যনাথ ধাম বা বাবা ধাম এবং সৎসঙ্গ আশ্রম এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। ৭২ ফিট উঁচু মন্দিরে দেবতা শিব লিঙ্গটি এখানে বৈদ্যনাথ নামে খ্যাত।


দেওঘরের প্রাণকেন্দ্র ক্লক টাওয়ারকে ঘিরে জমে উঠেছে বাজারহাট। ক্লক টাওয়ার থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত তপোবন। এ ছাড়াও এখানে রয়েছে নওলাখি মন্দির, বীর হনুমানের মূর্তি, কুণ্ডেশ্বরী নবগ্রহ মন্দির। শোনা যায় এখানে ঋষি বাল্মিকী এসেছিলেন। রামায়ণের সীতা এখানকার কুণ্ডে স্নান করেছিলেন বলেই সীতাকুণ্ডটি বিখ্যাত।


দেওঘরে রয়েছে রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম। দেওঘর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে ত্রিকূট পাহাড়। এই পাহাড়ে ট্রেকিং করা যায়, পাহাড় চূড়ায় রয়েছে রোপওয়ে। পাহাড় এবং জঙ্গলের মিশ্রণ দেখতে এখানে ভিড় জমান অনেকে। জঙ্গলে রয়েছে নানা জীবজন্তু। আর এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও অসাধারণ। ক্লক টাওয়ারের কাছেই অবস্থিত নন্দন পাহাড়। এর চূড়ায় রয়েছে একটি বিনোদন পার্ক। এ ছাড়াও এখানে আছে অনুকূলচন্দ্রের আশ্রম সৎসঙ্গ নগর। এখানে ভক্তেরা আসেন দিনভর।


নেতারহাট


পালামৌর পাহাড়ি অঞ্চলের নেতারহাটকে বলা হয় ছোটোনাগপুরের রানি। এখানকার সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখার মতো। রাজধানী রাঁচি থেকে এর দূরত্ব প্রায় দেড়শো কিলোমিটার। ছুটির প্ল্যানের অন্তত একটা দিন নেতারহাটে না কাটালে মন ভরবে না। চাইলে দুই দিনও কাটানো যায়। এখান দশ কিলোমিটার মতো নীচে নামলেই ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট। পাহাড়ের বাঁকে রয়েছে কোয়েল নদী, নেতারহাট বাঁধ। অদূরেই রয়েছে আপার ঘাঘরি জলপ্রপাত। নেতারহাট থেকে ট্রেক করে লোয়ার ঘাঘরিতে যাওয়া যায়। পাহাড়ি এই ঝরনাটি নেমে এসেছে প্রায় ৩২০ ফিট উঁচু থেকে। নেতারহাটের কাছেই অবস্থিত অঞ্জন গ্রাম। ধর্মীয় বিশ্বাস, এই গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন রামায়ণের বীর হনুমান। নেতারহাট থেকে প্রায় ৬১ কিলোমিটার দূরের জঙ্গল রয়েছে প্রায় ৪৬৮ ফিট উঁচু লোধ জলপ্রপাত।


হাজারিবাগ


ঝাড়খণ্ডের আরেকটি স্বাস্থ্যকর এবং অপূর্ব সুন্দর স্থান হাজারিবাগ। রাঁচি থেকে ট্রেনে এবং সড়কপথে হাজারিবাগ পৌঁছানো যায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, মনোরম জলবায়ু এবং নির্জনতাই এখানকার সম্পদ। হাজারিবাগ জাতীয় উদ্যানটি দেখার মতো স্থান। যদিও এটি শহরের বাইরে অবস্থিত। এখানে আছে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ এবং প্রাণী। এখানে প্রায় দশটি অবজার্ভেশন টাওয়ার রয়েছে। আছে নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার এবং তৃণভোজী প্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্র। নদী-বাঁধ দিয়ে তৈরি হয়েছে অপূর্ব সুন্দর জলাশয়। শহরের কাছেই অবস্থিত নজরমিনার। সেখান থেকে জাতীয় উদ্যান দেখার আনন্দই আলাদা। শহরের মধ্যে রয়েছে হাজারিবাগ হ্রদ। শান্ত এই স্থানে অনেকটা সময় কাটানো যায়। করা যায় নৌকাবিহারও। হ্রদের কাছে রযেছে স্বর্ণজয়ন্তী উদ্যান। হাজারিবাগের থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কানহেরি পাহাড়। রাঁচি-হাজারিবাগ রোডের মাঝামাঝি রামগড় থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে রয়েছে রাজারাপ্পা জলপ্রপাত এবং ছিন্নমস্তার মন্দির। ফেলুদার গল্পের ভক্তরা এই স্থানের মর্ম ভালোই বুঝবেন। সতীর ৫১ পীঠের অন্যতম এই স্থানে ছিন্নমস্তা রূপে পূজিত হন দেবী। মন্দিরটি ভৈরবী নদী এবং দামোদরের সঙ্গমে একটি টিলার উপর অবস্থিত।


ঘাটশিলা


ঝাড়খণ্ডের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হল ঘাটশিলা। স্বাস্থ্য সচেতন বাঙালির প্রিয় জায়গা এটি। প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক কাল ঘাটশিলার জনপ্রিয়তা এতটুকু কমেনি। ঘাটশিলা থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গালুডিও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের এক অনবদ্য উদাহরণ। এখানে সুবর্ণরেখা নদীর দুই রকম রূপ। ঘাটশিলা স্টেশন থেকে কাছেই রয়েছে সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি 'গৌরীকুঞ্জ'। অটো করেই সারা শহর ঘোরা যায়। স্টেশন থেকে অটোয় করে পৌঁছে যাওয়া যায় ফুলডুংরি টিলার এক্কেবারে মাথায়। অপূর্ব তার সৌন্দর্য্য। দেখার মতো স্থান বুরুডি। চারদিকে পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত এক অপূর্ব সুন্দর জলাধার এটি। বুরুডি হ্রদ থেকে পাহাড়ি পথ ধরে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া যায় ধারাগিরি প্রপাতে। ঘাটশিলা থেকেই ঘুরে আসা যায় ধলভূমগড়, চাণ্ডিল বাঁধ এবং দলমা পাহাড়।


ম্যাকলাস্কিগঞ্জ


ঝাড়খণ্ডের নিরিবিলি অ্যাংলো-সাহেবি পাড়া ম্যাকলাস্কিগঞ্জ। বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে বুদ্ধদেব গুহর লেখায় বার বার এসেছে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ। এখানে রয়েছে সাহেবদের পুরোনো বাংলো বাড়ি, সবুজমোড়া জঙ্গল আর নিরিবিলি। ম্যাকলাস্কিগঞ্জের পাশেই রয়েছে চট্টি নদী। এখানকার আবহাওয়া অত্যন্ত মনোরম। এই অঞ্চল মূলত বসবাস করেন মুণ্ডা, ওঁরাও আদিবাসী মানুষরা। জঙ্গল ছাড়াও রযেছে ডেগাডেগি নদী এবং কুমারপাত্র নদী। কুমারপাত্র নদীর কাছে রয়েছে অপূর্ব কলোরাডো ভূমিরূপ। হেসালাং ওয়াচ টাওয়ার থেকে গোটা ম্যাকলাস্কিগঞ্জ দেখা যায়। গাড়ি ভাড়া করে এই গঞ্জ ভালোমতো ঘুরে আসা যায়। এখানকার দুল্লি গ্রামটি পায়ে হেঁটে ঘুরে আসা যায়। এখানকার নাট্টা পাহাড়ে যেতে হলে মায়াপুর জঙ্গল ভেদ করতে হয়। গোটা ঝাড়খণ্ড ঘুরতে না চাইলে শুধু ম্যাকলাস্কিগঞ্জেই গোটা ছুটি কাটিয়ে দেওয়া যায়। কঙ্কনা সেনশর্মা পরিচালিত 'আ ডেথ ইন দ্য গঞ্জ' ছবির প্রেক্ষাপট এই ম্যাকলাস্কিগঞ্জ।


কী করে যাবেন?


হাওড়া থেকে রাঁচিযাওয়ার অনেক ট্রেন আছে। শিয়ালদহ থেকেও ট্রেন ছাড়ে। আগের দিন রাতে ট্রেনে চেপে পরের দিন ভোরবেলা পৌঁছে যাওয়া যায় রাঁচি।


বিমানে গেলে নামতে হবে বিরসা মুণ্ডা বিমানবন্দরে।


রাস্তাও খুব সুন্দর। কলকাতা থেকে রাঁচির দূরত্ব প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার। গাড়িতে কলকাতা থেকে রাঁচিযেতে সময় লাগে ১০ ঘণ্টার মতো।


কোথায় থাকবেন?


রাঁচি, হাজারিবাগে থাকার জন্য সরকারি, বেসরকারি বহু হোটেল আছে। তবে নেতারহাটে থাকার জায়গা বিশেষ নেই। তাই আগে থেকে সরকারি বন বাংলো বুক করে রাখতে পারেন। ভরা সময়ে হোটেল না পাওয়া গেলে রাঁচিথেকে ভোর ভোর বেরিয়ে ঘুরে, আবার হোটেলে ফিরে আসা যায়।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com