রাজনীতি কি ক্ষমতার না কী জনকল্যাণের?
প্রকাশ : ২০ মে ২০২২, ১২:০১
রাজনীতি কি ক্ষমতার না কী জনকল্যাণের?
ফারজানা মাহমুদ
প্রিন্ট অ-অ+

আমাদের মহান সংবিধানের ৬৬ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের ২৫ বছর বা তদূর্ধ কোন নাগরিক সংসদ সদস্য হবার অযোগ্য হবেন যদি তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে দুই বছর বা তার বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তার কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর ৫ বছর যতদিন অতিবাহিত না হয়। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া জেল খেটেছেন এবং ৩০ টির বেশী মামলায় তিনি অভিযুক্ত।


অপরদিকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুটি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত, অসংখ্য মামলায় অভিযুক্ত এবং বিদেশে পলাতক। সংবিধানের ৬৬(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে খালেদা জিয়া জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা রাখেন না। ২০১৮ সালের নির্বাচনেই কারাদণ্ডের কারণে খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা বাতিল করে দেয় নির্বাচন কমিশন। অর্থপাচার মামলায় মহামান্য হাইকোর্ট তারেক রহমানের ৭ বছর কারাদণ্ডের আদেশ দেন। পলাতক থাকায় এই রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপিল হয়নি। সুতরাং পরিচালিত আইন অনুসারে তারেক রহমান ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। যদিও বিএনপি ইতোমধ্যেই খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অবস্থান দলটিতে ধরে রাখতে তাদের গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন এনেছে। বিএনপি'র গঠনতন্ত্রের ৭ নং ধারা “কমিটির সদস্য পদের অযোগ্যতা” শিরোনামে উল্লেখ করা ছিল সমাজে দুর্নীতিপরায়ন ও কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি জাতীয়, নির্বাচন কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি বা যে কোন পর্যায়ের যে কোনো নির্বাহি কমিটির সদস্য পদের কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী পদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। ২০১৬ সালের ১৯ শে মার্চ বিএনপি'র ৬ ষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে এই ধারাটি কে বিলুপ্ত করা হয় দলটিতে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে টেকাতে।


কিন্তু গঠনতন্ত্র সংশোধন করলে ও বিএনপির শীর্ষ এই দুই নেতার দুর্নীতি আর অপকর্ম লুকানো থাকেনি। কানাডার আদালত বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে অবিহিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে সেখানে তারেকের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের অভাব, সাংগঠনিক দুর্বলতা, আদর্শহীন রাজনীতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির অবস্থানকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে তুলেছে। রাজনীতিতে শুধু টিকে থাকতে মরিয়া বিএনপি বিগত কয়েক বছর ধরেই কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার হুমকি দিয়ে আসছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে কোনো কার্যকর আন্দোলন গড়তে না পারলেও অস্তিত্ব সংকটে থাকা বিএনপি কে সন্ত্রাসী আগ্রসনের জড়াতে হয় জামায়াত কে সাথে নিয়ে। যদিও ২০১৪ সালের নির্বাচনে দলটি অংশ নেয়নি, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৫ টি আসন পাবার পর নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ফলাফল মেনে নেয়নি বিএনপি। লক্ষণীয় ২০০৮ সালের নির্বাচনে মাত্র ৩০ টি আসনে জয়ী হবার পর ও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি দলটি। এর অন্যতম কারণ হলো বিএনপি তখন নেতৃত্ব সংকটে ছিল না।


আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি'র জাতীয় সরকার গঠনের ইচ্ছা প্রকাশিত হয়েছে, যদিও তার রুপরেখা অস্পষ্ট। সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে বিভিন্ন ছোট দলগুলো কে সাথে নিয়ে বৃহত্তর জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। বিএনপির নেতৃবৃন্দের ভাষায় জনগণের দাবী আদায়ে তাদের এই আন্দোলনের পরিকল্পনা। দুঃখজনক হলেও সত্য জনগণের দাবি আদায়ের আন্দোলনের এই পরিকল্পনায় জনগণের সাথে বিএনপির সমূক্ততা লক্ষণীয় নয়। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির আন্দোলনে বিএনপি নিজেকে সম্পৃক্তই করতে পারেনি। যে কোনো রাজনৈতিক দলের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা ও জনগণের কল্যাণ করা। কিন্তু কোভিড মহামারীকালীন সময়ে ও বিএনপিকে জনগণের কল্যাণে তৎপর হতে দেখা যায়নি। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির ভূমিকা কেবলই ক্ষমতা দখলের জন্য উৎসুক সংগঠন হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে বারংবার।


শ্রীলংকার মত অর্থনৈতিক দূর্দশায় বাংলাদেশ পতিত হলে বিএনপি কত উল্লাসিত হবে তা যখন বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বক্তব্য স্পষ্ট হয়, তখন বিএনপির রাজনীতি যে শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাবার একটি মাধ্যম তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পর্যটনশিল্পে ধ্বস, বিদেশি শ্রমিকদের রেমিটেন্স সরবরাহ কমে যাওয়া ও ঋণ অব্যবস্থাপনাকে মূলত শ্রীলংকার বর্তমান অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে গণ্য করা হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি মিশ্র ধরনের, আমাদের উৎপাদন ও করতে হয় আবার আমদানিও করতে হয়। মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশ তৃতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, ধানে সপ্তম ও আলুতে অষ্টম। কৃষির ১১ খাতে বিশ্ব সেরা বাংলাদেশ। আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যর ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কোভিডকালীন দুর্যোগে যখন পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের অর্থনীতি হুমকিতে ছিলো, আমাদের সরকারের প্রণোদনা, সময়ানুগ সঠিক সিদ্ধান্তে তৈরি পোশাক খাতসহ অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিগুলো কোনো ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিটেন্স আমাদের অর্থনীতির আরেকটি মূল উৎস, মহামারীতে ও যার প্রবাহ ছিল চমকপ্রদক। বিশ্বব্যাংকের মতে ২০২১ সালে রেমিটেন্স প্রবাহে সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭ম। আবারো ২০২১-২০২২ অর্থ বছরের শুরু থেকে মার্চ পর্যন্ত রফতানি আয় এর পরিমাণ বেড়েছে ৩৩ শতাংশ।


আমাদের দেশের স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদরারা নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণ নিয়ে কোনো ধরনের ঝুঁকিতে নেই এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তিও মজবুত আছে। তবে ইউক্রেন - রাশিয়া যুদ্ধ বিশ্ববাজারকে অস্থিতিশীল করেছে, পণ্যের দাম বাড়ছে। বাংলাদেশ ও তার ব্যতিক্রম নয়। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে বেগবান রাখতে আমাদের মিতব্যায়ী ও অধিকতর সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে যারা রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্যে দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দিতে চায় বা পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল করতে চায়, তাদের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শ্রীলঙ্কার মতো হবে বলে যারা প্রচার করে তারা আসলে বিদেশী বিনিয়োগকারী এবং জনগণের মনস্তত্ত্বে ভীতি সঞ্চার করে বিদ্যামান অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে ধ্বংস করার চক্রান্তে লিপ্ত ।নিজের দেশের মানুষের দুর্ভাগ্য কামনাকারীরা কিভাবে জনগণের সেবক হবার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের নিমিত্তে জোট বদ্ধ হয় তা বোধগম্য নয়।বিএনপির সাজা প্রাপ্ত শীর্ষ নেতারা যেখানে নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য, দল যেখানে আদর্শহীন ও বিশৃংখল সেখানে ক্ষমতায় যেতে হলে নির্বাচনের বিকল্প কিছুতেই বিএনপির আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। দেশী-বিদেশী অপশক্তির সাথে ষড়যন্ত্র করে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে পারলেই বিএনপি সেই পথ সুগম হয়।


অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ তম বার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বাংলাদেশকে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার মডেল বলে আখ্যায়িত করেছেন। বিগত এক দশকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধির জন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের প্রশংসা করেন বাইডেন। একথা অনস্বীকার্য শেখ হাসিনার দক্ষতা, বিচক্ষণতা, দেশপ্রেম, এবং মানুষের কল্যাণে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেবার দর্শন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।


অন্যদিকে জনগণের আস্থা ও সমর্থন বিএনপির শীর্ষ দুই নেতা অনেক আগেই হারিয়েছেন আর সাজাপ্রাপ্ত হবার পর হয়েছেন জনবিচ্ছিন্ন। শেখ হাসিনার রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার দক্ষতার সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারে এমন কোনো রাজনীতিক শুধু আমাদের দেশে নয়, দক্ষিণ এশিয়াতেও নেই। দেশের মানুষের মঙ্গল সাধনে শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের বিকল্প কোনো শক্তি নেই। এই বাস্তবতার নিরিখে নীতি ও নেতৃত্বহীন বিএনপিকে ঢেলে সাজানো, জনকল্যাণমুখী ও সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী না করা গেলে দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শুন্য।


লেখকঃ ফারজানা মাহমুদ (বার-এট-ল), আইনজীবী ও গবেষক।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com