
এমনিতে এখন সরকারি চাকরি পাওয়া সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। আর এই সোনার হরিণ অর্জন করতে গিয়ে কী রকম ত্যাগ স্বীকার করে মেধার পরিচয় দিতে হয়, সেটা কেবল এই পথে যারা হেঁটেছেন তারাই ভালো জানেন। এই সফলতা অর্জন করতে গিয়ে চাকরি প্রার্থীদের আবেদন ফি, পরীক্ষাকালীন যাতায়াতসহ নানা ধরণের খরচ হয়। আর এই খরচ বহন করতে যেখানে উচ্চ শিক্ষিত বেকার তরুণ -তরুণীদের হিমশিম খেতে হয়, সেখানে অনলাইন আবেদন ফি এ কমিশনের উপর ভ্যাট বসানো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
কথাগুলো বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে সরকারি চাকরির চেষ্টায় থাকা শিক্ষার্থী ফাহিম হাসান।
তিনি বলেন, চাকরিপ্রার্থীরা আবেদন ফি কমানোর দাবিতে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনও করেছেন। কিন্তু সেখানে সেটা না কমিয়ে উল্টো ভ্যাট বসানো এই যেন অনেকটা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের শামিল। আর এই ভ্যাটে হয়তো মনে হতে পারে অল্প কিছু টাকা বাড়বে। কিন্তু এটাও তো দেখতে হবে, চাকরিপ্রার্থীরা শুধু একটা চাকরিতে আবেদন করে না। তাদেরকে অনেকগুলো আবেদন করতে হয়। আর অনেকগুলো আবেদনে অল্প অল্প করে তো অনেক টাকা হয়ে যায়, যা বেকার শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরণের বোঝা।
চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার দাবি, আবেদন ফি সর্বোচ্চ ২০০ টাকা এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর স্মৃতি বিজড়িত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুষদে বঙ্গবন্ধুর নামে বঙ্গবন্ধু ল’ কমপ্লেক্স (বঙ্গবন্ধু চেয়ার এবং একটি ম্যুরাল) স্থাপনের দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন করছেন “চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৩৫ প্রত্যাশী শিক্ষার্থী সমন্বয় পরিষদ।”
সরকারি চাকরির আবেদনে ভ্যাট বসানোর বিষয়ে অবগত করে মন্তব্য জানতে চাইলে সংগঠনটির আহ্বায়ক শরিফুল হাসান শুভ বিবার্তাকে বলেন, আমরা সবাই জানি- সাধারণত আয়ের উৎস থেকে ভ্যাট বসানো হয়। কিন্তু আমার প্রশ্ন- বেকার শিক্ষার্থীদের আয়ের উৎস কোথায়? তারা বেকার বিধায় চাকরিতে আবেদন করছে। এক্ষেত্রে তাদের আবেদনের উপর ভ্যাট বসানো হলো! এটা তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।
তিনি বলেন, অন্যান্য দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারদের ভাতাও দেওয়া হচ্ছে। আমরা তো বেকার ভাতাও চাচ্ছি না। এরপরেও কেন উচ্চ শিক্ষিত বেকারদের স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আমরা অবিলম্বে এই ভ্যাটের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানাই।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রাসেল বিবার্তাকে বলেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা আবেদন ফি কমানোর জন্য আন্দোলন করতেছে, সেখানে তা না কমিয়ে উল্টো ভ্যাট বসিয়ে দেওয়া অমানবিক, নিষ্ঠুর, নির্মমতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি এটাকে প্রহসান ছাড়া আর কিছু মনে করি না।
তিনি বলেন, একজন চাকরিপ্রার্থীর আবেদন ফি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষা দিতে গিয়ে নানা ধরণের খরচ হয়। বেকার একজন শিক্ষার্থী যেখানে এটা ম্যানেজ করতে হিমিশিম খেতে হয়, সেখানে ভ্যাটের সিদ্ধান্ত নিতান্তই শিক্ষার্থী স্বার্থবিরোধী বলে আমি মনে করি।
এরআগে ১৭ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ চাকরির আবেদন ফি পুনঃনির্ধারণ করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। যেখানে আবেদন ফি'র ওপর টেলিটক কর্তৃক আদায়কৃত ১০ শতাংশ কমিশনের ওপর এ কর আদায় করা হবে। এর ফলে চাকরিপ্রার্থীদের আবেদন ব্যয় কিছুটা বাড়বে।
ফলে এখন থেকে চাকরিপ্রার্থীদের নবম গ্রেডে আবেদনের জন্য ৬৬৯ টাকা, দশম গ্রেডের জন্য ৫৫৭ টাকা ৫০ পয়সা, ১১ ও ১২তম গ্রেডের জন্য ৩৩৪ টাকা ৫০ পয়সা, ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের জন্য ২২৩ টাকা এবং ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য ১১১ টাকা ৫০ পয়সা দিতে হবে।
তবে প্রজ্ঞাপনে বিভিন্ন গ্রেডে চাকরির মূল আবেদন ফি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নবম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব (নন-ক্যাডার) পদের জন্য আবেদন ফি হবে ৬০০ টাকা, দশম গ্রেডের জন্য ৫০০ টাকা, ১১-১২তম গ্রেডের জন্য ৩০০ টাকা, ১৩-১৬তম গ্রেডের জন্য ২০০ টাকা এবং ১৭-২০তম গ্রেডের জন্য আবেদন ফি হবে ১০০ টাকা।
চাকরির আবেদন ফি ভ্যাটসহ পুনঃনির্ধারণ করে দেওয়া নতুন প্রজ্ঞাপনের বিষয়ে নানা সমালোচনা শুরু হয়েছে। আবেদনে প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন ফি'র ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আদায়ের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী ও যুব মৈত্রী। শনিবার (২৬ আগস্ট) পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠন দুটি এ কথা জানায়। এ ছাড়াও এ ঘটনার প্রতিবাদে ছাত্রমৈত্রী মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।
ছাত্রমৈত্রীর দফতর সম্পাদক মাহফুজ হাসান বিবাার্তাকে বলেন,প্রথমবারের মতো চাকরির আবেদনের ফি'র সঙ্গে সরকারের ভ্যাট আদায়ের সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। অবিলম্বে এটা বাতিল করতে হবে। অন্যথায়, আমরা রাজপথে নামতে বাধ্য হবো।
অন্যদিকে, যুব মৈত্রীর সভাপতি তৌহিদুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক তাপস দাস এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, বেকার যুবক ও চাকরি প্রত্যাশীদের জন্য এটি খুবই অমানবিক সিদ্ধান্ত। অবিলম্বে এই ভ্যাট বাতিলসহ বেকার যুবকদের দীর্ঘদিনের দাবি চাকরির আবেদনে পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট প্রথা বাতিল করে নিয়োগ আবেদন সহজ ও স্বল্প মূল্য করতে হবে।
চাকরির আবেদন ফি এ ভ্যাট নির্ধারণ করার বিষয়ে অবগত করে মন্তব্য জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বিবার্তাকে বলেন, চাকরিতে আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের উপর চাপাচাপি করে ভ্যাট বসানো ঠিক হচ্ছে না। আমরা উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের বিনা পয়সায় চাকরিতে আবেদনের সুযোগ দিতে পারলে, সেটা ভালো হতো। কিন্তু সেটা করা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে একান্ত নূন্যতম ফি নিয়ে শিক্ষার্থীদের আবেদনের সুযোগ দেওয়া উচিত।
এই বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বিবার্তাকে বলেন, সরকারের আয়ের তো অনেক উৎস আছে। এক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের সরকারি চাকরির আবেদন থেকে ভ্যাট না নিয়ে মানবিক আচরণ করা যেতে পারে।
বিবার্তা/রাসেল/এসবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)
১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,
বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]