পদ্মা সেতু, স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা দক্ষিণাঞ্চলবাসীর
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২২, ১৮:৩৫
পদ্মা সেতু, স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা দক্ষিণাঞ্চলবাসীর
মো. তাওহিদুল ইসলাম
প্রিন্ট অ-অ+

ঈদের সময় লঞ্চের ডেক বা কেবিনে জায়গা না পেয়ে গন্তব্য পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যাওয়া, কিংবা বাসের টিকিট, ফেরিতে জায়গা না পাওয়ার ভোগান্তি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য চিরাচরিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এবারের ঈদুল আযহার যাত্রায় সেই ভোগান্তি আর থাকছে না। না থাকার কারণ স্বপ্নের পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন। গত ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভোগান্তি কমতে শুরু করেছে।


দক্ষিণাঞ্চলবাসীর এবারের ঈদযাত্রা হবে স্বস্তিদায়ক- যা এর আগে কখনও হয়নি। উৎসবে বাড়ি ফেরা নিয়ে আর দুশ্চিন্তা করতে হবে না এই অঞ্চলের মানুষের। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পরে এ অঞ্চলের মানুষ এমনটাই মনে করছে।


বর্তমানে সারা দেশে মোট ১০৭টি নৌপথ রয়েছে, এর মধ্যে ৪৩টি পথ ঢাকার সদরঘাট থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানকে সংযুক্ত করেছে। এই ৪৩টি নৌ-রুটে লঞ্চের সংখ্যা প্রায় ২০০। আর শিমুলিয়া থেকে মাঝিরকান্দি ও বাংলাবাজারে চলাচল করে ৮৭টি লঞ্চ। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানের সংযোগকারী ৪৩টি নৌ-রুটের যাত্রীরা পদ্মা সেতুর সুবিধাভোগী। এতে করে লঞ্চে যাত্রীর চাপ কমেছে, কমেছে যাত্রীদের ভোগান্তিও।


বেসরকারি সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, গত ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে যাত্রাপথে ২৮৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত দেড় হাজার মানুষ। গত ২৫ এপ্রিল থেকে ৮ মে পর্যন্ত সংঘটিত হয় এসব দুর্ঘটনা। এ সময় ৭টি নৌ-দুর্ঘটনায় পাঁচজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছে এবং দুজন নিখোঁজ রয়েছেন।


স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষার্থী ফেরদৌস রহমান সাগর বিবার্তাকে বলেন, আমার বাড়ি বরগুনায়। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পরে দুইবার বরগুনা-বরিশাল যেতে হয়েছে। আমি লঞ্চে যাতায়াত করেছি। লঞ্চের ডেক বা কেবিনে আগের মতো যাত্রী নাই। লঞ্চের ভাড়া আনুষ্ঠানিক না কমালেও ঘাট থেকে কম ভাড়ায় যাত্রী তোলে। এখন আমরা লঞ্চ বলেন আর বাস বলেন- সব কিছুতেই যেতে পারবো। পদ্মা সেতু হওয়ায় যাত্রীদের কদর বেড়েছে। লঞ্চ মালিকদের মাফিয়াগিরি আর থাকছে না।



তিনি বলেন, ঈদের আগে মালিকরা লঞ্চের কেবিন ও ডেকে ভাড়া ইচ্ছা মতো বাড়াতো। তখন একটা কেবিন পাওয়া ছিলো সোনার হরিণ পাওয়া। আর এবার তারা কেবিনের ভাড়া কমিয়েও যাত্রী পাচ্ছে না। এবারে ঈদ যাত্রা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


মাদারীপুরের শিবচরের বাসিন্দা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মামুন বিবার্তাকে বলেন, ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। প্রতি বছরের মতো এবারও এসেছে ঈদ। তবে এবার দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে কোরবানির ঈদের আনন্দে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। দীর্ঘদিন এই অঞ্চলের মানুষ স্পিড বোর্ড, লঞ্চ, ফেরিসহ নানা ভোগান্তিতে ভুগলেও এবার বদলে গেছে সেই চিত্র। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে এখন নির্বিঘ্ন যাতায়াত করবে তারা।


তিনি বলেন, অন্যান্য বার ঈদের সময় বাড়ি পৌঁছার আগ পর্যন্ত নানা ঝামেলা পোহাতে হতো। তাই ঝামেলার ভয়ে অনেকে বাড়ি যাওয়ার ব্যাপারেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলতেন। তবে এবার দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের ঈদযাত্রা হবে স্বস্তিদায়ক।


গণমাধ্যম কর্মী ইশতিয়াক ইমন জানান, ঢাকা বরিশাল রুটের লঞ্চের বেহাল অবস্থা। একটা সময় যে জুলুম মানুষের সাথে করেছে তার হিসেব সুদাসলে পাচ্ছে মালিক-শ্রমিকরা। ৩৫০ টাকার ডেকের ভাড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় নেমেছে, তবুও যাত্রী খরা। লঞ্চের কেবিন সাধারণের জন্য একরকম অধরাই ছিলো। লবিং আর ক্ষমতা ছাড়া কেবিন পাওয়া যেতো হাতে গোনা। দালালচক্র ২৫০০ টাকার কেবিন ৫ হাজার টাকাও বিক্রি করতো। তেলের দাম বৃদ্ধির পর মালিকরা যেভাবে চেয়েছে সরকার তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী ভাড়া চাপিয়েছে সাধারণ যাত্রীদের ওপর। এসি ডাবল কেবিনের নির্ধারিত ভাড়া ছিলো ২৮০০ টাকা, তা এখন ১৮০০ টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে না। ১৪০০ টাকার সিঙ্গেল কেবিন এখন ৮০০ থেকে এক হাজারে নেমেছে।


দুটি বড় কোম্পানির লঞ্চ মালিকের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, গত কয়েকদিনে বরিশাল থেকে ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ কেবিন ফাঁকা এসেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ভাড়া কমানো এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। জুলুম করলে তার ফল একদিন না একদিন ভোগ করতেই হয়।


বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার সিনিয়ির সহ-সভাপতি আলহাজ্ব মো. বদিউজ্জামান বাদল বিবার্তাকে বলেন, আমাদের যাত্রী খরা চলছে। মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এখন যেভাবে লঞ্চ চলছে সেভাবেই আরো কিছুদিন চলবে। এরপর পর্যবেক্ষণ করে আমরা সিদ্ধান্ত নিবো। তবে আমাদের দুর্দিন চললেও যাত্রীরা ভালো আছে। কারণ লঞ্চ ভাড়া অটো কমে গেছে। এতে যাত্রীদের সুবিধা হয়েছে।



পদ্মা সেতু হওয়ায় মাওয়া ফেরিঘাটের দীর্ঘ অপেক্ষারও অবসান ঘটেছে। এর আগে প্রতিটা ঈদ বা যেকোনো মৌসুম আসলে ফেরিঘাটে যানবাহন ও যাত্রীর চাপ বেড়ে যেতো। বাড়তো ভোগান্তি। এছাড়াও ঘাটে নানান ধরনের হয়রানির শিকার হতে হতো যাত্রীদের। কিন্তু এ বছর তা একদমই হবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।


তারা মনে করেন, পদ্মা সেতু তো আছেই। ঈদকে কেন্দ্র করে লঞ্চে কম হলেও যাত্রী যাবে। লঞ্চ ও বাসে যাত্রী ভাগ হয়ে যাবে। এতে ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক হবে। অন্যদিকে, পণ্যবাহী ট্রাক, মোটরসাইকেল যদি মাওয়া থেকে ফেরিতে পারাপারের সুযোগ থাকে, তাহলে তো আরো সুন্দর হবে।


ঢাকা বরিশাল রুটের বাস যাত্রী ইমরান বিবার্তাকে বলেন, ঈদের সময় মাওয়া ফেরিঘাটের অনেক স্মৃতি আছে। যা মনে পড়লে আঁতকে উঠি এখনো। ভাবতেই ভালো লাগছে যে, এই বছর কোরবানির ঈদে বাড়িতে যাব অথচ মাওয়া ফেরিঘাটের ভোগান্তিতে পড়তে হবে না।


তিনি বলেন, এমনও ঈদ গেছে ফেরিঘাটে আসছি সন্ধ্যায় আর ফেরি পার হয়েছি পরের দিন দুপুরে। এসব ভোগান্তি থেকে এখন আমরা মুক্ত।



বৃহত্তর দক্ষিণবঙ্গ কোচ ও বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং সায়েদাবাদ আন্ত জেলা ও নগর বাস টার্মিনাল মালিক সমিতিরি যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বিবার্তাকে বলেন, পদ্মা সেতু হওয়ায় যাত্রীরা বাসের দিকে ঝুঁকছে বেশি। বাসের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। টার্মিনালে জায়গা দিতে পারছি না। যাত্রীরা স্বস্তিতে আছে কিন্তু আমরা জায়গা সংকটে আছি। সামনে ঈদকে কেন্দ্র করে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। এ বছর ঈদযাত্রা আরামদায়ক হবে।


যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক চৌধুরী বিবার্তাকে বলেন, সড়ক পথে নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেতু হওয়ায় সড়কে বাস চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই জরুরিভিত্তিতে সড়কগুলো সংস্কার করা উচিত। না হলে সড়কে দুর্ঘটনা বাড়তে পারে।


তিনি বলেন, গত বছর ঈদের সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের রুটে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। আশা করি, এ বছর এত বেশি দুর্ঘটনা ঘটবে না। যদিও আমরা চাই কোনো প্রকার দুর্ঘটনা না ঘটুক। তবে এ বছর ঈদযাত্রায় স্বস্তির সুবাতাস পাচ্ছি।


বিবার্তা/তাওহিদ/রোমেল/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com