শপথ
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০৮:৫৯
শপথ
বিপ্লব সাইফুল
প্রিন্ট অ-অ+

হঠাৎ টিনের চাল থেকে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে যায় একঝাঁক রঙিন কবুতর। গোয়ালের গরুগুলো দড়ি ছেঁড়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।


সেদিকে খেয়াল যায় না মুন্সির। সে তব্দা খেয়ে বসে থাকে। মুন্সির নববধূ তহুরা মুন্সির পা ঘেষে দুই কানে হাত রেখে বসে থাকে জুবুথুবু। দুড়ুম দুড়ুম শব্দে তখনো কাঁপে আদিগন্ত।


এদিকে শব্দগুলো ক্রমশ মুন্সির বাড়ি মুখি এগিয়ে আসতে থাকলে তহুরার চেতন ফেরে যেনো। সে মুন্সির দুই পায়ে ঝাকি মেরে বলে, হুনছেন? এই যে ওরা মনে অয় আমগো বাইত আয়া পড়তাছে। উডেন তাত্তারি। বউয়ের ঝাকুনি আর কথায় মুন্সি বাস্তবে ফিরে। তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়ায়। তহুরার হাত ধরে প্রায় টানতে টানতে ঘর থেকে বের হয়ে আসে। উঠোনে এসে একবার এদিক ওদিক তাকায়। তারপর সে তহুরাকে নিয়ে ঘরের পেছনের পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়ায়। তহুরা অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে মুন্সির দিকে। এদিকে বেলা প্রায় পড়ে এসেছে। সূর্যের শেষ আলোটা এসে পড়েছে তহুরার মুখে। সেই আলোয় তহুরাকে কেমন অলীক লাগে মুন্সির কাছে। তার ইচ্ছে হয় তহুরাকে একবার বুকে নেয়। ঠিক তখন, তখনই অনেকগুলি বুটের শব্দ মুন্সির কানে স্পষ্ট হলে সে দ্রুত তহুরাকে নামিয়ে দেয় পুকুরের পানিতে। তহুরা নিজেকে লুকিয়ে ফেলে পুকুরের কচুরিপানার নিচে।



মুন্সির চোখে করুণ অসহায়তা। সে সেই অসহায়, করুণ চোখে পুকুরের দিকে তাকিয়ে থাকে। এদিকে আযানের সময় হয়ে এলে মুন্সি ঘুরে মসজিদের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। সে মাত্র একপা বাড়িয়েছে তখনই তার বুক বরাবর একটি রাইফেলের নল এসে তার গতিরোধ করে দেয়। তার ওপর আছড়ে পড়ে ভিনদেশি অনেকগুলি চিৎকার। সেই চিৎকারে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলে তার নজরে আসে জালাল মাতব্বরকে। জালাল মুন্সির ভেতর কিছুটা সাহস এনে দিলে বলে, চাচা...



মুন্সি এরবেশি এগুতে পারে না। ততোক্ষণে দিনের আলো প্রায় মুছে যায় যায়। সেই মুছে যাওয়া আলোয় এতোক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকা পাখিগুলি হঠাৎ আমগাছটায় ডেকে ওঠে। আর কোথা থেকে যেনো উড়ে এসে মুন্সির বাড়ির ওপর চক্কর খায় একটি বিরাট শকুন।


জালাল তার পাকা দাড়িতে একবার হাত বুলায়। মুন্সির সাহসে জল ঢেলে দিয়ে কুটিল হেসে বলে, ইমাম সাব, আপনের বউডারে কোতায় হান্দায়া রাখছেন?


জালালের এহেন সংলাপে মুন্সি পুনরায় অসহায় হয়ে বলে, চাচা আমি এই গেরামেরই পোলা। আপনেগো মসজিদের ইমাম। আমি আপনার সন্তানতুল্য।



এবার জালাল খিচরে ওঠে, চুপ মাগির পুত বলে চিৎকার করে মুন্সির দিকে একিয়ে এসে তার গালে সপাটে চড় বসিয়ে দেয়। তারপর আসন্ন সন্ধ্যার পাখিদের কলকাকলি থামিয়ে দিয়ে বলে, হুন মুন্সি গতরের কাছে বাপবেটা, চাচা ভাতিজা বইলা কিচ্ছু নাইক্কা। তর বউ তহুরার যৈবন আমার বহুত রাইতের ঘুম কাইরা নিছে। দেশে গন্ডগোল লাইগা ভালাই হইছে। আজকা ওরে... ক তহুরা কই? নইলে তরে ঝাঁঝরা কইরা ফালামু।
মুন্সির মুখে কোনো কথা ফোটে না।



তখন দৌড়াতে দৌড়াতে সেখানে উপস্থিত হয় জালালের দুই চামচা রজ্জব আর মোকলেছ। তারা একটু দম নেয় তারপর বলে, চাচা মাগিরে দেহিনা কোথাও। বলতে বলতে মোকলেছ তার হাতে থাকা কেরোসিনের গ্যালানটা মাটিতে নামিয়ে রাখে। তখন পাশের গ্রাম কার্তিকপুরের মসজিদ থেকে আযান ভেসে এলে মুন্সি বলে, চাচা আযান পড়ছে।
জালাল তার সাথে আসা পাক বাহিনীদের কিছু বলে যা মুন্সি বুঝে উঠতে পারে না। মুন্সির বুকের ওপর থেকে রাইফেলের নলটা সরে যায়। সে সামনে পা বাড়ালে জালাল বলে, এহেনেই আযান দে।



মুন্সি পশ্চিম দিকে ফিরে আযান দেয়। তার আযানের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়লে সন্ধ্যা কেমন ঘন হয়ে ওঠে।



আযান শেষ হলে মুন্সি সকলকে নামাজে আহ্বান করলে জালাল তাকে একাই নামাজ সম্পূর্ণ করতে বলে। মুন্সি সেখানেই নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। এদিকে জালাল মুখলেছ আর রজ্জবকে ইশারা করলে তারা কেরোসিনের গ্যালন ঢেলে দেয় মুন্সি ঘর আর গোয়াল ঘরে। ম্যাচ বাক্স থেকে রজ্জব খরচ করে দুইটি কাঠি। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে মুন্সির গোয়াল আর মাথাগোঁজার আশ্রয়। গরুগুলি উদভ্রান্তের মতো ডাক ছাড়ে। আর তাতেই ঘটে বিপত্তি। তহুরা পুকুর থেকে চিৎকার করে উঠে আসে। তহুরাকে দেখে একটা সোরগোল পড়ে যায়। আগুনের আঁচটা এসে পড়ে নামাজরত মুন্সিরও গায়। তবুও সে ডুবে থাকে নামাজে। তহুরা উঠে এলে জালাল তাকে ধরে ফেলে। তহুরার আকুতিতে ভেসে যায় মুন্সির চোখ। পাথর গলে না। তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা তহুরা বিবস্ত্র হলে জালালের কাছে মুন্সি খোদার কাছে পানা চায়। কিন্তু খোদাও নির্বাক এই জুলুমে!


একজন নামাজরত মানুষের পাশে চলে পৃথিবীর সবচেয়ে বর্বর, পৈচাশিক উল্লাস!
মুন্সি নামাজের সালাম ফিরিয়ে দৌড়ে যায় গোয়াল ঘরের দিকে। তখনো গরু দুটির শরীরে আগুন লাগে নি। সে কোনক্রমে দড়ি কেটে দিলে গরু দুটি দৌড়ে বাড়ির উঠোন পেরিয়ে নদীর দিকে যেতে থাকে।
দাউদাউ আগুনের সামনে মুন্সি দাঁড়িয়ে থাকে বধির হয়ে। সে তহুরার চিৎকার শুনতে পায় না!
তহুরার ওপর থেকে জালাল ওঠে গেলে মোকলেস আর রজ্জব তাকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। তহুরাকে কেন্দ্র করে হাঁটে বাকি সবাই।
মুন্সি এতোটা অসহায়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে যে তার চোখে ধরা দেয় না কিছুই!
তহুরাকে নিয়ে ওরা হেঁটে যায় চিত্রকোটের দিকে। যেখানে পাক বাহিনীর ক্যাম্প।


সময় গড়িয়ে যায়। নিভে আসে আগুন। এষার আজানের প্রস্তুতি নেয় মুন্সি।
মসজিদে গিয়ে আযান দেয়। নামাজ শেষে সে খেয়াল করে জালালও নামাজ শেষে বের হয়ে যাচ্ছে মসজিদ থেকে।
সবাই চলে গেলে মুন্সি একলা মসজিদের ভেতর হারিকেনের আলোয় কোরান তেলাওয়াত করে মধুর সুরে। সে মগ্ন থেকে আরো মগ্ন হয়ে যায় কোরানের আয়াতে। এভাবে রাত গভীর হলে সে হারিকেন হাতে বেড়িয়ে আসে।


বাড়ির উঠোনে এলে হারিকেনের আবছা আলোয় দেখে সব ছাই হয়ে পড়ে আছে। গরু দুটি ফিরে এসে দাঁড়িয়ে আছে শূন্য উঠোনে। মুন্সিকে দেখে একটা গরু এগিয়ে আসে। মুন্সির কাছ ঘেষে দাঁড়ায়। একবার তার হাত চেটে দেয় জিহ্বা দিয়ে। আর এতোক্ষণ জমে থাকা মুন্সির ভেতরটা হঠাৎই যেনো চৌচির হয়ে যায়। সে গরুটির গলা জড়িয়ে ধরে হু হু করে ওঠে রাত্রির নিরবতা ভেঙে। হারিকেনটা তার হাত থেকে পড়ে স্থির হয়ে যায় একটু দুলনি খেয়ে। মুন্সি খেয়াল করে না যে, আবছা আলোয় ভেসে যায় পালিত গরুর চোখ!


মুন্সি ঘন রাত্রির অন্ধকারে শূন্য হয়ে বসে থাকে পুড়ে যাওয়া ঘরের ভিটায়। হারিকেনটা তখনো জ্বলছে। সহসা তার নজরে আসে কোরবানির পশু জবাই করার ছুরিটা পড়ে আছে।


কাঠের বাটটা অর্ধেক পোড়া। সে উঠে ছুরিটার কাছে গিয়ে হাতে তুলে নেয়। আঙুলে পরখ করে দেখে নেয় ধার।
গরু দুটি ক্লান্ত হয়ে বসে আছে উঠোনে। আকাশে গোটা কয়েক নক্ষত্র।
ছুরিটা হাতে মুন্সি একবার আকাশের নক্ষত্রগুলির দিকে তাকায়। একবার তহুরার মুখটা তার চোখের সন্নিকটে ধরা দেয়। কান্না মানুষকে অনেক হালকা করে দেয়। মুন্সিও নিজেকে হালকা বোধ করে।
সে ছুরি হাতে মসজিদের দিকে হাঁটতে থাকে নিজের অজান্তেই। এসময় জালাল তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার জন্য মসজিদে আসে।
মসজিদে ঢোকার মুখে তার সাথে দেখা হয় জালালের। সে জালালের চোখের সামনে ছুরিটা ধরলে জালাল চমকে উঠে আপাদমস্তক।
জালালের মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে আসে, মুন্সি...



মুন্সি হাসে। বলে, চাচা এই ছুরিটা চিনেন? তারপর সে উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলে, গেলো বকরী ঈদেও এইটা দিয়া আপনের গরু জবাই করেছি আমি। কিন্তুক এইটা দিয়া অহন থিকা আর গরু না, আপনের লাহান জানোয়ার, রাজাকার জবাই করুম। শ্যাষ কইরা দিমু এই দেশের শত্রুগো...। বলে আর এক মুহূর্তও দেরি করে না মুন্সি। জালালকে এক ঝটকায় মাটিতে শুইয়ে দেয়। জালাল কিছু বলারও সময় পায় না। মুন্সি হাতের ছুরিটা তার গলা বরাবর চালিয়ে দেয়। ফিনকি দিয়ে রক্ত এসে ভিজিয়ে দেয় মুন্সি জোব্বা।
জালাল দাপাতে দাপাতে স্থির হয়ে যায়।
মুন্সি ছুরি হাতে হাঁটা দেয় উল্টো পথে।



সে হাঁটতে হাঁটতে একসময় কমলপুর গ্রামের সীমানা অতিক্রম করে যায়। সে তার বুকের ভেতর আগুনের মতো এক শপথ নিয়ে আরো দূরে হারিয়ে যেতে থাকে...


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com