বাঙালি জাগরণের মহাজাদুকর শেখ মুজিব (পর্ব ১৬)
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:১৪
বাঙালি জাগরণের মহাজাদুকর শেখ মুজিব (পর্ব ১৬)
এফ এম শাহীন
প্রিন্ট অ-অ+

খেলাধুলায় বিশেষ ঝোঁক ছিল, একাধারে ফুটবল, ভলিবল, হকি খেলতেন শেখ মুজিবুর রহমান। ফুটবল খুব ভালো খেলতেন। দলের মধ্যে দারুণ অবস্থান ছিল তাঁর। মিশন স্কুল ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন। তাঁর স্কুলের টিম খুব ভালো ছিল। মহকুমায় যারা ভালো খেলতো তিনি তাদের এনে ভর্তি ও বেতন ফ্রি করার ব্যবস্থা করে দিতেন। তাঁর খেলাধুলা বিষয়ে বলতে গিয়ে একটা কথা না বললেই নয়। শেখ মুজিবুর রহমান সবসময়ই ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে ছিলেন। রাজনীতি, খেলাধুলা যে বিষয়ই হোক না কেন তিনি দলের জন্য কাজ করতেন, দলের স্বার্থকে বড় করে দেখতেন। তিনি তো এটা ভাবতেই পারতেন যে একাই নামকরা খেলোয়াড় হবেন। ভালো প্রশিক্ষকের জন্য বাবা কিংবা স্কুলকে অনুরোধ করতে পারতেন। কিন্তু না! তিনি স্কুল টিমকে ভালো ভাবে সংগঠিত করার প্রচেষ্টা চালাতেন। এ ব্যাপারে সফলও ছিলেন। তাদের টিমকে কেউ হারাতে পারতো না।


তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমানও খেলতেন। অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারি ছিলেন তিনি। বাবা ও ছেলের টিমে যখন খেলা হতো তখন জনসাধারণ খুব উপভোগ করতো। কারণ, খেলার মাঠে বাবা-ছেলের আচরণ সম্পূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৪০ সালে অফিসার্স ক্লাবকে প্রায় সকল খেলায় পরাজিত করে মিশন স্কুল টিম। অফিসার্স ক্লাবের টাকার অভাব ছিল না। খেলোয়াড় বাইরে থেকে আনতো। সবাই নামকরা খেলোয়াড়। তবুও মিশন স্কুলের ছাত্রদের সাথে পেরে উঠতো না। আসলে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরণাই ছিল দলের শক্তি।


কিন্তু তিনি নিজে খুব বেশি খেলতে পারতেন না। হার্টের অসুখের কারণে তাঁর বাবা তাকে খেলতে দিতে চাইতেন না। আবার ছেলে ভালো খেলে বলে নাও করতে পারতেন না।


খেলার মাঠে যতো উদ্দীপনা নিয়ে ছুটতেন শেখ মুজিবুর রহমান, জীবনের ময়দানেও ছিল তাঁর একই গতি, একই উদ্যোম। ১৯৪৩ সালে উপমহাদেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আরম্ভ হয়। লক্ষ লক্ষ লোক মারা যাচ্ছিল। এই সময় তিনি প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য হন। দুর্ভিক্ষে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। গ্রাম থেকে লক্ষ লক্ষ লোক শহরে ছুটতে শুরু করে। খাবার কাপড় কিছুই ছিল না। ইংরেজরা যুদ্ধের জন্য সব নৌকা বাজেয়াপ্ত করে নিয়েছিল। ধান-চাল সৈন্যদের খাওয়ানোর জন্য গুদাম জব্দ করে নিয়েছিল। ব্যবসায়ীরা দশ টাকা মণের চাল চল্লিশ টাকায় বিক্রি করতে শুরু করেছিল। রাস্তায় রাস্তায় মানুষ মরে পড়ে থাকতো। কুকুর মানুষ একসাথে ডাস্টবিন থেকে উচ্ছিষ্ট খেত। পেটের দায়ে নিজের ছেলেমেয়েকে বিক্রির চেষ্টা করছে, কিন্তু সেই বাচ্চাটাকে কিনবে এমন মানুষটিই বা কোথায়? বাচ্চার মুখে খাবার দিতে না পেরে কেউ কেউ রাস্তাতেই বাচ্চাকে ফেলে রেখে যাচ্ছিল।


তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। ইংরেজদের নজর ঐদিকেই। বাঙালির প্রধান খাবার চালের আকাল দেখা দেওয়ায় ভাতের জন্য সারা বাংলায় হাহাকার পড়ে যায়। গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে দুর্ভিক্ষ। পথে-প্রান্তরে লুটিয়ে পড়তে থাকে না খাওয়া মানুষ। এখানে-ওখানে পড়ে থাকতে দেখা যায় হাড্ডিসার লাশ। এ সময় জরুরি খাদ্য সরবরাহের জন্য চার্চিলের কাছে আবেদন করেও বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন ভারতের তৎকালীন ব্রিটিশ কর্মকর্তারা। বিভিন্ন গ্রাম থেকে তখন বুভুক্ষু হাজার হাজার মানুষ একমুঠো অন্নের আশায় স্রোতের মতো ধাই করেছেন কলকাতার দিকে। একই সময় ব্রিটিশ কর্মকর্তা এবং তাদের তোষামুদে অবস্থাপন্ন ভারতীয় লোকজন বাড়িতে বসে ভুরিভোজ করছেন।


বাঙালির এমন দুরাবস্থা অথচ ইংরেজের কথা, বাংলার মানুষ মরে মরুক, যুদ্ধের সাহায্য আগে। যুদ্ধের সরঞ্জাম প্রথম স্থান পাবে। ট্রেনে অস্ত্র যাবে, তারপর জায়গা থাকলে রিলিফের খাবার যাবে। যুদ্ধ করছিল ইংরেজ, আর না খেয়ে মরছিল বাঙালি। বিপদাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে সেই একজনই, যার ছিল এক অতুলনীয় উদারমন।


প্রথমে বেকার হোস্টেলে বেঁচে যাওয়া খাবার বুভুক্ষদের মধ্যে বিতরণ করতে শুরু করলেন। এরপর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী হলে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে সাহায্য আনতে সমর্থ হলেন। কন্ট্রোল দোকান খোলার ব্যবস্থা করলেন। তাঁর নির্দেশেই শেখ মুজিবুর রহমান অনেকগুলো লঙ্গরখানা খুললেন। রাত দিন ভুলেই গেলেন। পড়ালেখা খেলাধুলা একপ্রকার ছেড়েই দিলেন। দিনভর রিলিফ বিতরণের কাজ করতেন। মানুষকে বাঁচানোর জন্য অক্লান্তভাবে নিরলস কাজ করেছেন তিনি তখন। রাতে কখনো হোস্টেলে ফিরতেন কখনো লীগ অফিসের টেবিলেই শুয়ে থাকতেন। এরপর গোপালগঞ্জে এসে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের জন্য কাজ শুরু করলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম গুণ ছিল এটাই তিনি কখনো 'না' বলতেন না। তেতাল্লিশের মন্বন্তরে তাঁর যে অবদান তা সত্যিই প্রশংসনীয়, একেবারে তৃণমূল মানুষের কাছে গিয়ে কাজ করেছেন নিজের স্বার্থ ভুলে গিয়ে।


http://www.bbarta24.net/literature/197933


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com