মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন এবং সাহসী দেশপ্রেমিক: বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২২, ০০:৩১
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন এবং সাহসী দেশপ্রেমিক: বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব
সামিনা বিপাশা
প্রিন্ট অ-অ+

সভাকক্ষের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে লালপেড়ে ডোরাকাটা শাড়ি পরা ভদ্রমহিলাটি উঁচু স্বরে বললেন, 'কী হচ্ছে এখানে? আপনারা কী শুরু করেছেন? আমার বাড়িতে বসে কোনো ষড়যন্ত্র করা চলবে না, এখানে কোনো মারামারি করা চলবে না।' হতবাক সবাই। মুখের টুঁ শব্দটিও থেমে গেল। কিছুক্ষণ আগেও হট্টগোলে মশগুল ছিল যেই কক্ষ সেইখানে নামল নিস্তব্ধতা। সবার দৃষ্টি সেই সাদামাটা কিন্তু দৃঢ় চরিত্র ও চলনবলনের ভদ্রমহিলার দিকে। তিনি অন্য কেউ নন, বঙ্গমাতা- আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।


শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, আপনাদের নেতা জেলে আছেন। তাঁর অবর্তমানে তাঁর প্রণীত কোনো কর্মসূচি আপনারা পরিবর্তন করতে পারেন না। এটা হবে না। এটা হওয়া উচিত নয়। সভা স্থগিত করুন। আমি স্পষ্ট করে বলছি, ছয় দফা যারা মানবে না তারা দল থেকে চলে পারেন।' এর পরে সভা ভেঙে যায়। আট দফার পক্ষপাতিত্ব করা নেতারা সভাকক্ষ ছেড়ে চলে যান।


১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বাংলার মানুষের কাছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নাম তিনি। বঙ্গবন্ধুর পুরো রাজনৈতিক জীবনে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শকে বাস্তবায়ন করতে পেছন থেকে কাজ করেছেন শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় রেণু।


বাঙালির মুক্তির সনদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ছয় দফা। ১৯৬৬ সালে নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, অধিকারবঞ্চিত বাঙালির পক্ষে ঐতিহাসিক ৬-দফা দাবি পেশ করেন বঙ্গবন্ধু। ছয় দফা দাবি উত্থাপনের একদম শুরুর দিকের কথা। তখনও আন্দোলন শুরু হয়নি। ছয় দফা কর্মসূচিও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়নি। আবদুল গাফফার চৌধুরীর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ছয় দফা উত্থাপনের পূর্বে তিনি বঙ্গবন্ধুকে খুব চিন্তিত অবস্থায় দেখলেন একদিন। চিন্তার কারণ জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু তাকে জানালেন, আমার চিন্তার কারণ ভিন্ন। মুভমেন্ট তো শুরু করতে চাই। কিন্তু জোরালো সমর্থন পাচ্ছি না অনেকের কাছ থেকে। আমি গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় রয়েছি।



আবদুল গাফফার চৌধুরী অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, আপনাকে আবার গ্রিন সিগন্যাল দিবে কে? বঙ্গবন্ধু সোজাসাপটা উত্তর, তোমাদের ভাবি। আরো আশ্চর্য হবার পালা। তিনি আরো বললেন, এবার যে আন্দোলন শুরু করতে যাচ্ছি, তা খুবই বিপজ্জনক। আন্দোলনে জয়ী হতে না পারলে কেবল জেল-জুলুমেই সব শেষ হবে না। হয়তো রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে ফাঁসির দড়িতে ঝুলানোরও ব্যবস্থা হতে পারে। এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার আগে তোমাদের ভাবির সঙ্গে একটা খোলাখুলি আলোচনা দরকার। আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রশ্ন করলেন, যদি তিনি অনুমতি না দেন? আপনাকে এত বড় ঝুঁকি নিতে বারণ করেন? বঙ্গবন্ধুর হাতে তখন পাইপ, টোবাকো পুরেছেন আগেই। উত্তর দিলেন, সে কথা ভেবেও আমি চিন্তিত। আমি আর কারো বিরোধিতাকে ভয় করি না। কিন্তু হাসিনার মা (বঙ্গমাতা) বেঁকে দাঁড়ালে আমার পক্ষে মুভমেন্টে নামা কষ্ট হবে।



১৯৬৬ সনের ছয় দফা আন্দোলনের পক্ষে জনসমর্থন আদায় ও জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করতে লিফলেট হাতে রাস্তায় নেমেছিলেন বঙ্গমাতা। এসময় তিনি নিজের অলংকার বিক্রি করে সংগঠনের প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের নেপথ্যেও ছিল তার সঠিক দিক নির্দেশনা। আন্দোলনের উত্তাল সময়গুলোতে নিজ বাড়িতে পরম মমতায় নির্যাতিত নেতা-কর্মীর আত্নীয় স্বজনদের আপ্যায়ন করতেন, সুবিধা-অসুবিধার কথা শুনে ব্যবস্থা নিতেন।



বাংলাদেশের জন্য যা মঙ্গলজনক সেই সমস্ত কিছুতে সবুজ সংকেত দেওয়ার মতো ক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তা সত্যিকার অর্থে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবেরই ছিল। তাঁকে যথার্থ উপলব্ধি করতে পেরেই প্রত্যেকটা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বঙ্গমাতার সাথে পরামর্শ করে নিতেন বঙ্গবন্ধু। ছয় দফার সফল বাস্তবায়ন যেমন বঙ্গমাতার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছাড়া সম্ভব হতো না, বাংলাদেশের বিষয়ে আপসহীন ও সাহসী বঙ্গমাতার অবস্থান ব্যতীত বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে অর্জন করাটাও বাঙালির জন্য স্বপ্নই থেকে যেতো।




ছয় দফা ঘোষণার পর সেটার পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে গিয়ে সারা বাংলাদেশেই সফর করেছেন এবং বহুবার গ্রেফতার হয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যেখানেই বক্তৃতা দিয়েছেন সেখানেই গ্রেফতার হয়েছেন৷ এভাবে চলতে চলতে ১৯৬৬ সালের ৮ মে গ্রেফতার হওয়ার পর প্রায় ৫ মাস তার কোন খোঁজ জানা যায়নি। পরিবারের কাউকেই জানতে সুযোগ দেওয়া হয়নি তিনি কেমন আছেন। শাসকগোষ্ঠীর বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের প্রতি এই অন্যায় আচরণ ছাড়াও ছয় দফা নিয়ে হয়েছে নানান ষড়যন্ত্র। ছয় দফা যে-কোনো সময় আট দফায় পরিণত হতে পারে আশঙ্কায় পাকিস্তানের অনেক নেতাই ছয় দফা আন্দোলনকে চাপা দিয়ে তথাকথিত আট দফা দাবি কার্যকর করতে চেয়েছিলেন। ছয় দফাকে আট দফা করা নিয়েও তাদের মধ্যে কোন্দল শুরু হয়ে যায়।


কিন্তু সেসময় দূরদর্শী ও সাহসী বঙ্গমাতা দৃঢ়ভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন। বঙ্গবন্ধু প্রণীত ছয় দফা নিয়ে আলোচনায় বসেন নেতাকর্মীরা, বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে। ছয় দফা প্রণয়নের অপরাধে বঙ্গবন্ধু তখন জেলে। ছয় দফাকে আট দফায় রূপান্তরিত করতে বাকবিতণ্ডা এমন পর্যায়ে যায় যে, রীতিমতো চিৎকার ও চেয়ার ছোঁড়াছুড়ি চলছিল সেই সভাকক্ষে।


বিশেষ করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যখন বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তি নিয়ে কিছু কুচক্রী স্বাধীনতা সংগ্রামকে বিপন্ন করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিলো, তখন প্যারোলে মুক্তির বিপক্ষে বেগম মুজিবের দৃঢ়চেতা অবস্থান বাংলার মুক্তি সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করেছিল। যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।


বঙ্গবন্ধু যখন বারে বারে পাকিস্তানি শাসকদের হাতে বন্দি জীবন যাপন করছিলেন, তখন দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী বঙ্গমাতার কাছে ছুটে আসতেন, তিনি তাদের বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন দিকনির্দেশনা বুঝিয়ে দিতেন এবং লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা জোগাতেন।


১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ও যুদ্ধকালীন তিনি তাঁর ডানার আড়ালে রেখেছেন সন্তানদের। তিনি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে সন্তানদেরকে বলেছেন- ' কতবার কত দুর্দশায় পড়েছি, এবার না হয় একটু বেশি কষ্ট হবে।' চারিদিকে যুদ্ধ, যত্রতত্র হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ, এরমাঝে সমস্ত দেশের দায়িত্ব ছিলো বঙ্গবন্ধুর উপর। সে সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেনাপতিকে পেছন থেকে সাহস যুগিয়েছেন যিনি, তিনি আর কেউ নন, আমাদের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।



বঙ্গমাতা সক্রিয় রাজনীতি না করলেও দিনে দিনে দক্ষ রাজনীতিক হয়ে উঠেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনিই নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনা দিতেন, সবাইকে সংগঠিত রাখার প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োজিত থাকতেন, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পৌঁছে দিতেন পরবর্তী সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে। ছয় দফা দাবিকে আট দফায় পরিবর্তন করতে চেয়ে নেতাকর্মীরা যে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ফেলছিল সে পরিস্থিতি সামাল দেন বঙ্গমাতাই।



ছয় দফা আন্দোলনের একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল কারাবন্দিদের মুক্তির জন্য বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের প্রচেষ্টায় সারাদেশে ৭ জুনের হরতাল পালন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক বক্তব্যে জানা যায়, ছয় দফা ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু কয়েকদফা গ্রেফতার হলেও শেষপর্যন্ত ৮মে গ্রেফতার হলে ৫ মাস জানা যায়নি কী অবস্থায় আছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর পরিবার, বিশেষ করে বঙ্গমাতার কী উৎকণ্ঠার একটা সময় তখন। কারাবন্দি থাকা বঙ্গবন্ধু কোথায় আছে, আদৌ বেঁচে আছেন কি না কেউ জানে না। সেসময়ও বিচলিত হয়ে বা কষ্টে আত্মনিমগ্ন না থেকে বঙ্গমাতা কারাবন্দিদের মুক্তির জন্য আন্দোলন গড়ে তোলেন এবং ৭ জুন হরতাল সফলভাবে পালন করার জন্য কাজ করেন।


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো উল্লেখ করেছেন, আমার মাকে দেখেছি আমাদের নিয়ে ছোটো ফুফুর বাসায় যেতেন, ওখানে গিয়ে নিজের পায়ের স্যান্ডেল বদলাতেন, কাপড় বদলাতেন, বোরকা পরতেন। একটা স্কুটারে করে আমার মামাকে নিয়ে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। আন্দোলন চালাবেন কীভাবে তার পরামর্শ দিতেন, তিনি সেখান থেকে ফিরে এসে বোরকা খুলে আমাদেরকে নিয়ে বাসায় ফিরতেন।' গোয়েন্দা নজরদারিকে এভাবেই ফাঁকি দিয়ে তিনি গতিশীল রেখেছিলেন বাংলার মানুষের আন্দোলন-সংগ্রাম। বাংলাদেশের স্পর্ধিত স্বাধীন জন্মে পিতা আর মাতার মতোই ছিলেন বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা। প্রতিটি সংগ্রামে-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর সহায়ক শক্তি ছিলেন বঙ্গমাতা।



ছয় দফার বিনিময়ে জেনারেল আইয়ুব ব্ল্যাংক চেক দিতে রাজি ছিলেন বঙ্গবন্ধুকে। এই বিষয়ক গল্পটি ফজলুল কাদের চৌধুরী সম্পর্কিত। গল্পটি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরীকে। ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোর রাজনৈতিক শত্রু। ছয় দফা আন্দোলন যখন শুরু হতে যাচ্ছে, ফজলুল কাদের চৌধুরী তখন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মন্ত্রী। খুব ধুরন্ধর লোক ছিলেন আইয়ুব খান। তিনি একটা কথা গোড়াতেই বুঝতে পেরেছিলেন, কোনো শক্তি প্রয়োগ দ্বারা ছয় দফার আন্দোলন রোখা যাবে না, রোখা যাবে যদি শেখ মুজিবুর রহমানকে টাকাপয়সার অথবা উচ্চ পদ, ঘুস দিয়ে বশীভূত করা যায়।



বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার এই চিন্তাটি হাস্যকর হলেও দূরাভিসন্ধি বাস্তবায়নে আইয়ুব খানের চিন্তাকে উপযুক্তই বলা চলে। তার এই কূটচাল বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়ল ফজলুল কাদের চৌধুরীর উপর। আইয়ুব খান তাকে বললেন, চৌধুরী সাহেব, আপনি ব্ল্যাংক চেক সই করিয়ে নিয়ে যান। টাকা কোটির অংকে হলেও আমার আপত্তি নেই। একটাই শর্ত, ছয় দফার দাবি ছেড়ে দিতে হবে।' ফজলুল কাদের চৌধুরী বললেন, 'মুজিবকে আমি চিনি। একসময় আমরা দুজনেই শহীদ সোহরাওয়ার্দীর চেলা ছিলাম। টাকাপয়সা দেখিয়ে তাঁকে বাগ মানানো যাবে না। অন্য কোনো অফার?' আইয়ুব খান বললেন, মন্ত্রী হবার অফার তিনি বহু আগেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে একটা সত্য কথা তাঁকে বলে দেখতে পারেন, আমি মোনায়েম খাঁকে এই মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদ থেকে সরিয়ে তাঁকে গভর্নর পদে বসাতে রাজি আছি। তিনিনিজের লোক নিয়ে প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। আমরা কেন্দ্র থেকে তাঁর সিভিল প্রশাসনে বড়ো একটা হস্তক্ষেপ করব না। এছাড়াও আমি আমার বেয়াই জেনারেল হাবিবুল্লা এবং ছেলে গওহর আইয়ুবকে রাজি করিয়ে গান্ধারা ইন্ডাস্ট্রিজের ফরটি নাইন পার্সেন্ট শেয়ার মুজিব বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তির নামে ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করব। তাঁর শেয়ার কেনার টাকার ব্যবস্থাও আমি করব।'


ফজলুল কাদের চৌধুরী এসব প্রস্তাব নিয়ে ঢাকায় আসেন। যথাসময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সব জানান। শেখ মুজিবুর রহমান মুচকি হেসে তাকে বলেন, দেখি হাসুর মায়ের সঙ্গে একটু আলাপ করে। ফজলুল কাদের চৌধুরী ভাবলেন, হাতি কলা অর্ধেক গিলেছে। বাকিটাও গিলবে। তিনি সে রাতেই প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে টেলিফোনে জানালেন, 'আলাপ এগোচ্ছে।' দুদিন পরেও শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী নিজেই মাঝরাতে গোপনে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন। তাঁকে সঙ্গে করে দোতলায় বসার ঘরে নিয়ে গেলেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে একা পেয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী তাঁর প্রস্তাবগুলোর প্রসঙ্গ তুলতে যাবেন, এমন সময় ঘরে ঢুকলেন বেগম মুজিব। তাঁর হাতে চা-নাশতার ট্রে। সেটি ফজলুল কাদের চৌধুরীর সামনে টেবিলে রাখে তিনি বিনীত কণ্ঠে বললেন, 'ভাই, আপনাকে একটা অনুরোধ জানাব। শেখ মুজিবকে আইয়ুব খান আবারো জেলে ভরতে চান আমার আপত্তি নেই। আমাদের এই বাড়িঘর দখল করতে চান, এতেও দুঃখ পাব না। আপনাদের কাছে আমাদের দুজনেরই অনুরোধ, আমাদের মাথা কিনতে চাইবেন না। শেখ মুজিবকে মোনায়েম খাঁ বানাবার চেষ্টা করবেন না।'



বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব প্রসঙ্গে এই ঘটনার পর, ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেছিলেন, আমি আইয়ুবকে দেখেছি, তিনি কত বড়ো বড়ো রাজনীতিকের মাথা কিনেছেন। এক হাটে কিনে আবার অন্য হাটে বিক্রি করে দিচ্ছেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের ওই একটি মাত্র লোক শেখ মুজিবুর রহমান। বার বার চেষ্টা করেও তিনি তাঁকে বাগ মানাতে পারেননি। বঙ্গমাতা যদি অন্য আর দশটি মেয়ের মতো হতেন, হতেই পারতো এমন যে বঙ্গবন্ধুর অকল্পনীয় প্রাচুর্য কিংবা প্রতিপত্তির মধ্যে বসবাস করতে পারতেন তিনি স্বামী-সন্তানসহ। কিন্তু তিনি তো সেই মহিয়সী নারী যিনি স্বামীর সাথে দেশের কল্যাণে অকাতরে নিজের জীবন, নিজের সন্তান, নিজের সুখ-শান্তি, নিজের চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়েছেন। এমন আত্মত্যাগ বঙ্গমাতার পক্ষেই সম্ভব।



বঙ্গমাতার দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার দ্বার খুলে দিয়েছিল। 'সারা জীবন তুমি সংগ্রাম করেছ, তুমি জেল জুলুম অত্যাচার সহ্য করেছ, তুমি জানো যে এ দেশের মানুষের জন্য কী চাই, তোমার থেকে বেশি কেউ জানে না, তোমার মনে যে কথা আসবে তুমি শুধু সেই কথাই বলবে, কারো কথা শুনতে হবে না। তুমি নিজেই জানো তোমাকে কী বলতে হবে। তোমার মনে যে কথা আসবে তুমি সে কথাই বলবা।’ এমন দৃঢ় সাহস ও প্রত্যয় জোগানোর ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের অমর ভাষণ দিয়েছিলেন, বাঙালি জাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের নেপথ্য শক্তি— বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব।



বাংলাদেশের সৌভাগ্য এমন একজন মা পেয়েছিল, যার স্নেহছায়ায় বেড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বৃক্ষটি। শেষ পর্যন্ত স্মরণ করতে হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ সহধর্মিণী সম্পর্কে বলা কথাটি—


" একজন নারী ইচ্ছে করলে আমার জীবনটা পালটে দিতে পারতেন, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাসও সেদিন পালটে যেত"। মেনে নিতেই হবে, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন এবং সাহসী দেশপ্রেমিক আর কেউ নন, আমাদের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com