বাঙালি জাগরণের মহাজাদুকর শেখ মুজিব (পর্ব ১০)
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২২, ০৮:০৪
বাঙালি জাগরণের মহাজাদুকর শেখ মুজিব (পর্ব ১০)
এফ এম শাহীন
প্রিন্ট অ-অ+

“আম্মা,


আমার ভক্তিপূর্ণ ছালাম নিবেন। আপনি আমায় জানেন না তবুও আজ লিখতে বাধ্য হচ্ছি। আপনার ছেলে খালেক নেওয়াজ আজ জেলখানায়। এতে দুঃখ করার কারণ নাই। আমিও দীর্ঘ আড়াই বৎসর কারাগারে কাটাতে বাধ্য হয়েছি। দেশের ও জনগণের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার জন্যই সে আজ জেলখানায়। দুঃখ না করে গৌরব করাই আপনার কর্তব্য। যদি কোন কিছুর দরকার হয়, তবে আমায় জানাতে ভুলবেন না। আমি আপনার ছেলের মত। খালেক নেওয়াজ ভাল আছে। জেলখানা থেকেই পরীক্ষা দিচ্ছে। সে মওলানা ভাসানী সাহেবের সাথে আছে।আপনার স্নেহের


শেখ মুজিবুর রহমান”


এই চিঠিটা তৎকালীন ছাত্রনেতা ময়মনসিংহের জনাব খালেক নেওয়াজ খান যখন জেলে তখন ৬ জুলাই ১৯৫২-তে বঙ্গবন্ধু খালেক নেওয়াজ খান সাহেবের মাকে 'আম্মা' সম্বোধন করে চিঠিটি লিখেন। কোন মাত্রার সংবেদনশীল মানসিকতার মানুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু তা এই চিঠি পড়লেই বোঝা যায়। সহকর্মীর মাকে নিজের মায়ের স্থানে এনে বঙ্গবন্ধু এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। সিংহহৃদয়ের মানুষ না হলে সহকর্মীর মাকে মাতৃজ্ঞান করা সম্ভব নয়। সহকর্মীর মাকে যদি এতোটা শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন তাহলে নিজের মায়েরপ্রতি তার ভালোবাসা কতোটা সুগভীর ছিল তা সহজেই অনুমেয়।


বঙ্গবন্ধুর শৈশবের পুরোটাই তাঁর মাকে ঘিরে আবর্তিত ছিল। তিনি প্রায়ই গরিব সহপাঠীদের নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসতেন। মাকে বলে তাদেরকে খাবার খাওয়াতেন। সায়েরা খাতুনও তাতে কখনো আপত্তি করেননি। বরং ছেলের উদারতায় মুগ্ধ হতেন তিনি। একবার শেখ মুজিব তাঁর ছাতাটা এক বন্ধুকে দিয়ে নিজে বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরলেন। মা ভেবেছেন, খোকা হয়তো ছাতা হারিয়ে ফেলেছে। আরেকদিন গায়ের চাদরও দিয়ে এলেন অসহায় বৃদ্ধ পথচারীকে।


নিজের ছেলের এই উদারতায় হাসতেন সায়েরা খাতুন। খোকাকে আদরে জড়িয়ে ধরতেন বুকে। মায়ের উদারতাই নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি নিজের মা সম্পর্কে লিখেছেন ‘আম্মা? তিনি দয়ালু, ধার্মিক। তাঁর নিজের জগৎ নিয়েই তিনি থাকেন।’ সায়েরা খাতুনের নিজের জগৎ বলতে তাঁর স্বামী-সন্তান এবং সংসার। স্বামী-সংসার এর চিন্তাই ছিল তাঁর প্রধান কাজ। সায়েরা খাতুন স্বামীর সঙ্গে শহরে থাকতেন না। নিজের বাবার দিয়ে যাওয়া সমস্ত সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন আর বলতেন, ‘আমার আব্বা আমাকে সম্পত্তি দিয়ে গেছেন। যাতে তাঁর বাড়িতে আমি থাকি। শহরে চলে গেলে এ বাড়িতে আলো জ্বলবে না, বাবা অভিশাপ দিবে।” তিনি তাঁর পুরো জীবন গ্রামে কাটিয়েছেন। শেখ মুজিবুর রহমানের মা তাঁর নিজের বাবাকে কতোটা শ্রদ্ধা করলে এরকম কথা বলেছেন, একজীবন গ্রামেই কাটিয়েছিন, খুবই সহজ সরল জীবনযাপন করেছেন। ঠিক একইরকম শ্রদ্ধা, সম্মান, স্নেহ, ভালোবাসার উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মন। সেটি তাঁর কর্মেই প্রতিফলিত। তাঁর মা সায়েরা খাতুন তাঁর শৈশব সম্পর্কে বলেছেন, ‘এমন কিছু সে করেনি যা ভাল নয়। আমার বংশে তিনপুরুষেও এমন নির্ভীক সৎ, সাহসী ছেলে আসেনি।’


শেখ মুজিবুর রহমান যখন কারাবন্দী থাকতেন শেখ লুৎফর রহমানের সাথে তিনিও সেখানে তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্রকে দেখতে যেতেন। নিজের অন্য ছেলেমেয়েদের মতো পুত্রবধূ বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকেও সায়েরা খাতুন লালনপালন করেছেন। কারন বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বিয়ের সময় অনেক ছোট ছিলেন । দৃঢ় শক্তিশালী মনোবলের অধিকারী ছিলেন সায়রা খাতুন। তার খোকা দিনের পর দিন বাংলার মানুষের জন্য সংগ্রাম করেছে, জেলে যাচ্ছে এবং পাকিস্তান সরকারের নির্যাতন সহ্য করছে তবু মা সায়েরা খাতুন সন্তানকে কখনো পিছু হটতে বলেননি। কখনো বলেননি রাজনীতি ছাড়ার কথা। হাজারো নির্যাতনে মানুষের অধিকারের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু যেমন ছিলেন অবিচল, মা হয়ে সায়েরা খাতুনও মনে শঙ্কা থাকলেও অবিচল থাকতেন।


সায়েরা খাতুন ছেলে শেখ মুজিবুর রহমানকে একবার বলেছেন, ‘বাবা, তুই তো পাকিস্তান পাকিস্তান করে চিৎকার করেছিস, কত টাকা খরচ করেছিস, এ দেশের মানুষ তো তোর থেকেই পাকিস্তানের নাম শুনেছিল, আজ তোকেই সেই পাকিস্তানের জেলে কেন নেয়?’ আদরের খোকার কারাবন্দি জীবন মা সহ্য করতে পারতেন না। তিনি ছেলের জন্য কতো যে চোখের পানি ফেলেছেন তা অবিশ্বাস্য, তা সত্যি বেদনাদায়ক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তাঁর গ্রন্থগুলোতে তাঁর জন্য অক্লান্তভাবে ঝরে পড়া মায়ের চোখের জলের কথা দুঃখ নিয়ে লিখেছেন। সায়েরা খাতুন ছেলের জেলজীবন দেখে তিনি কষ্ট পেতেন, কাঁদতেন, অথচ শেখ মুজিবুর রহমানকে তিনি কোনদিন রাজনীতি ছাড়তে বলেননি। সায়েরা খাতুন তাঁর সন্তানকে বাংলার মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।


তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যেও বাবা-মায়ের মুখটি ভুলতেন না। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় তিনি লিখেছেন, ‘মনে পড়ল আমার বৃদ্ধ বাবা-মার কথা। বেরিয়ে কি তাঁদের দেখতে পাব? তাঁদের শরীরও ভাল না। বাবা বুড়া হয়ে গেছেন। তাঁদের পক্ষে আমাকে দেখতে আসা খুবই কষ্টকর। খোদার কাছে বললাম, খোদা তুমি তাদের বাঁচিয়ে রেখ, সুস্থ রেখ।’’


বঙ্গবন্ধুর মা বেঁচে থাকার প্রতিটি দিনে সাধারণ সাদামাটাভাবে টুঙ্গিপাড়াতেই জীবনযাপন করে গেছেন। পৃথিবীর আর কোন দেশের রাষ্ট্রপতির মা বা পরিবারের লোকজন বোধকরি এত সাধারণ জীবনযাপন করেননি। সৌভাগ্য এইটুকুই ১৯৭৫ সালের ৩১ মার্চ সায়েরা খাতুন মারা যান, অর্থাৎ তাঁর আদরের পুত্রকে হত্যার দিন ১৫ আগস্টের পূর্বে। তাকে অন্তত এই দৃশ্য দেখে যেতে হয়নি যে, যাদের কল্যাণের জন্য তাঁর পরম আদরের পুত্রটিকে স্বার্থহীন দান করেছিলেন, তাদের মধ্যকার কয়েকজন ক্ষমতালোভী অমানুষ তাঁর পুত্রকে হত্যা করেছিল নৃশংসভাবে, সপরিবারে...

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com