রবিবারের ধারাবাহিক
বাঙালি জাগরণের মহাজাদুকর শেখ মুজিব (পর্ব ৭)
প্রকাশ : ২২ মে ২০২২, ১০:৫৯
বাঙালি জাগরণের মহাজাদুকর শেখ মুজিব (পর্ব ৭)
এফ এম শাহীন
প্রিন্ট অ-অ+

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেদিন ম্যাট্রিক পাস করে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়তে যান, সেদিন তাঁর বাবা শেখ লুৎফর রহমান পেনশন নিয়ে বাড়ি চলে আসেন। শেখ লুৎফর রহমান এনট্রান্স পড়া অবস্থায় ভাইবোনদের পড়ালেখা, বিবাহ তাঁর মাথার ওপর এসে পড়েছিল। বাধ্য হয়ে লেখাপড়া ছেড়ে চাকরি অন্বেষণে বের হয়েছিলেন। এদিকে ইংরেজদের দুষ্টচক্রে পড়ে, মুসলমান বলে তাঁর চাকরি লাভে বিপত্তি ঘটে। শেষপর্যন্ত দেওয়ানি আদালতে সেরেস্তাদারের চাকরি পান শেখ লুৎফর রহমান। জীবন জীবিকার প্রয়োজনে তাঁর নিজের লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটেছিল বলে তিনি ছেলের পড়াশোনার বিষয়ে খুবই আন্তরিক ছিলেন। তাই বাবা চাকরি থেকে অবসর নিলেও শেখ মুজিবুর রহমানকে থেমে যেতে হয়নি।


থেমে যেতে হয়নি ১৯৩৪ এ! ১৯৩৬ এ! ১৯৩৭ এ! ১৯৪১ এও নয়! আসলে কখনোই নয়। দমে যাওয়ার পাত্রতো শেখ মুজিবুর রহমান নন!


১৯৩৪ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমান খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। কারণ, বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হন, হার্ট দুর্বল হয়ে যায়। চঞ্চল দুরন্ত শেখ মুজিবুর রহমান যে খেলাধুলা করে, গান গায়, ভালো ব্রতচারী করে; হঠাৎই ছেদ পড়ে তার দুরন্তপনায়। দুর্বল হার্ট নিয়ে আসতে হয় কলকাতায়, চিকিৎসার জন্য। তারপর হার্টের সমস্যা ভালো হলেও, সাবধানতা অবলম্বন করেই চলতে হতো। এই ধাক্কা সামলিয়ে উঠতে না উঠতেই অন্য ধকল আসে ১৯৩৬ সালে। গ্লুকোমা রোগে তাঁর চোখ খারাপ হয়ে যায়। আবার কলকাতা যাত্রা। জানা যায়, দ্রুত অপারেশন করাতে হবে, নাহলে অসুবিধা হয়ে যেতে পারে অর্থাৎ অন্ধ হয়ে যেতে পারেন তিনি। ছোট্ট মুজিবুর ভয়ে হাসপাতাল ছেড়ে পালাতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না। ছোট একটা ছেলে- মায়ের আঁচল ধরে যার ঘুরে বেড়ানোর কথা, আদরে আহ্লাদে যার শৈশব-কৈশোর বর্ণিল হওয়ার কথা, অথচ মাকে ছেড়ে জটিল অসুস্থতার কারণে অচেনা শহরে অপারেশনের ঘরে শুয়ে থাকতে কি ভালো লাগে, না মন মানে? ছোট্ট বালকটির পালাতে চাওয়াটাই স্বাভাবিক। নিজের অপারেশনের ঘর থেকে পালাতে চাইলেও কোনদিন দেশ, মাটি ও মানুষের জন্য নিবেদিত লড়াইয়ের ময়দানে পারবো না বলে ছেড়ে যাননি। তিনি সত্যিই এক আশ্চর্য মানুষ, অসাধারণ যোদ্ধা।


চোখের অপারেশনে পর চোখ ঠিক হলো, তবে লেখাপড়া কিছুদিনের জন্য বন্ধ হলো আর চোখে চাপলো চশমা। চোখের বিপদ কেটে যাওয়ার পর ১৯৩৭ সালে আবার লেখাপড়া শুরু করেন। চার বছরের বাধা পড়ে গেলে পুরোনো স্কুলে পড়তে যেতে মন কী মানে? সহপাঠীরা যে অনেকদূর চলে গেছে। ভর্তি হলেন গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে, পিছিয়ে পড়া লেখাপড়ার সুবিধার্থে বাড়িতে সার্বক্ষণিক গৃহশিক্ষক কাজী আবদুল হামিদ এমএসসি। সেও হঠাৎ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। শেখ মুজিবুর রহমানে পড়ালেখার স্রোতে শুধু ভাটা আর ভাটার আঘাত, ভাটার ভেতরে জন্ম নেওয়া তিনি এক অদম্য জোয়ার।



এরও আগের গল্প। শেখদের গোয়ার্তুমি ইংরেজি পড়বে না! শেখরা পিছিয়ে পড়েছিল। অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়ে উঠছিল। ইংরেজকে গ্রহণ করতে না পারায় শেখ বংশ জীবনের দৌঁড়ে টিকে থাকতে পারছিল না। শেষপর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের দাদাদের আমল থেকে শেখ পরিবার ইংরেজি লেখাপড়া শুরু করল। শেখ মুজিবুর রহমানের দাদা আবদুল হামিদ, তারা তিন ভাই ছিলেন। বড় ভাই খুব বিচক্ষণ লোক ছিলেন, দেশের বিচার-আচার করতেন, ছোট ভাই শেখ আবদুর রশিদ ইংরেজদের দেওয়া 'খান সাহেব' উপাধি পেয়েছিলেন। জনসাধারণ তাকে খান সাহেব বলেই জানতো। খান সাহেব শেখ আবদুর রশিদ একটা এম ই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, সেই অঞ্চলে এই একটাই ইংরেজি স্কুল ছিল, পরে সেটা হাইস্কুল হয়, সেটি আজও আছে। শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও এই স্কুলে লেখাপড়া করেন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত।



১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাৎ সাত বছর বয়সে শেখ মুজিবুর রহমান গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। নয় বছর বয়সে ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে গোপালগঞ্জ পাবলিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন। পিতার বদলিসূত্রে ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি চতুর্থ শ্রেণিতে মাদারীপুর ইসলামিয়া বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখানে ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বেরিবেরি নামক জটিল রোগে আক্রান্ত হন এবং তার হৃৎপিণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে তার চোখে গ্লুকোমা ধরা পড়ে। ফলশ্রুতিতে, তিনি ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চার বছর বিদ্যালয়ের পাঠ চালিয়ে যেতে পারেননি। তিনি ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে আবার পড়ালেখা শুরু করেন। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে গোপালগঞ্জে মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। পরবর্তীকালে গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে তিনি ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। তিনি ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমান নাম মওলানা আজাদ কলেজ) থেকে আই.এ এবং ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই কলেজটি তখন বেশ নামকরা ছিল। ইসলামিয়া কলেজে ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি বেকার হোস্টেলের ২৪নং কক্ষে থাকতেন। ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে ২৩ ও ২৪ নম্বর কক্ষকে একত্রিত করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানার্থে “বঙ্গবন্ধু স্মৃতিকক্ষ” তৈরি করে। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি কক্ষটির সম্মুখে তার আবক্ষ ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। ভারত ভাগের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হন। তবে, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি দাওয়ার প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ঔদাসীনতার বিরুদ্ধে তাদের বিক্ষোভ প্রদর্শনে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে তাকে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে, ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়।


একনজরে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাজীবন জানা হয়ে গেল। তবে তাঁর শিক্ষাজীবনের পথ পরিক্রমাটা এতো সরল ছিল না। বরং নানারকম বাধা আর চড়াই উতরাই দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল তাঁর শিক্ষিত হওয়ার পথটি। কিন্তু তিনি তো বরাবরই দমে যাওয়ার পাত্র নন। তাই অসুস্থতা, বাধা, বিপত্তি, আন্দোলন, মিথ্যা অভিযোগ ঘাড়ে নিয়েও জ্ঞানের মুকুট নিজের মাথায় পড়েছেন ঠিকই।



এ প্রসঙ্গে আরও কিছু গল্প না বললেই নয়। ১৯৪১ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিবেন। পরীক্ষার পাস নিয়ে তাঁর কোন দ্বিধাই ছিল না। ইংরেজির শিক্ষক রসরঞ্জন বাবু, গণিতের শিক্ষক মনোরঞ্জন বাবু, আর নিজের উদ্যোগতো আছেই। গণিত ভয় পেতেন বলে প্রথম বিভাগ হাতছাড়া হবে বলে মনে করতেন। কিন্তু ঘটে গেল এরচেয়েও বড় দুর্ঘটনা। পরীক্ষার একদিন পূর্বে শেখ মুজিবুর রহমানের ভীষণ জ্বর হলো, মামস হয়ে গলা ফুলে গেল। একশ চার ডিগ্রি জ্বর। রাতভর বাবা তাঁর শুশ্রূষা করলো, গোপালগঞ্জের ভালো ডাক্তার চিকিৎসা করলো। কিন্তু জ্বর কী তাকে ছাড়ে! ছেলের এই অবস্থা দেখে বাবা পরীক্ষা দিতে নিষেধ করেন, কিন্তু ছেলে নাছোড়বান্দা, শুয়ে হলেও পরীক্ষা দিবেনই।



জ্বর নিয়ে প্রথম পরীক্ষা দিলেন বাংলা। অন্য পরীক্ষাগুলো ভালো হল। বাংলায় শুধু কম মার্কস পেলেন। অন্যান্য বিষয়ে দ্বিতীয় বিভাগের মার্কস। মন ভেঙে গেল। তো, পড়ালেখা থেমে গেল? নাহ! আবার পড়তে শুরু করলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের মনে এটাই গাথা ছিল যে পাস তাকে করতেই হবে। পরের বৎসর দ্বিতীয় বিভাগে পাস করে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন।


কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে যখন পড়েন, দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে দেশ নাজেহাল৷ সুবোধ বালকের মতো ঘরে বসে থাকবেন, পড়বেন তেমন মানুষ কি শেখ মুজিবুর রহমান। পড়ালেখা তো দূরের বিষয়, নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সেবায় রীতিমতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়েন, তখন ছাত্রদের নয়, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে সমর্থন দেওয়ায় তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। মানুষের সেবা করতে গিয়ে তিনি যে জীবনভর কতো মিথ্যে অভিযোগ কাঁধে নিয়েছে তার বোধহয় হিসাব মিলবে না। আর এতো বাধা-বিপত্তি, ঝড়-ঝাপটা সামলেও জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর পড়ালেখাটা চমৎকারভাবেই করেছিলেন, তিনি ছিলেন যথার্থই স্বশিক্ষিত এবং সুশিক্ষিত। তাঁর ভাষণ, ইংরেজি উচ্চারণ, বাংলা ভাষার প্রয়োগ, চালচলন, দর্শন, মতাদর্শ এসব পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায় তিনি জ্ঞানের এক মহাসমুদ্র, বিজ্ঞতা, তাঁর অলংকার, মহৎ গুণ তাঁর অহংকার।


তাঁর পিতা যেমন সবসময় তাকে বলতেন যাই করো পড়ালেখাটা ঠিকমতো করো, ঠিক তেমনি জাতির পিতা হিসেবে তিনিও আমাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ছাত্রদের আহবান জানিয়েছেন, ছাত্র ভাইদেরকে বলি, 'একটু লেখাপড়া করো। বাবার হোটেলে আর কতকাল খাবে? পয়সা কড়ি নেই। তোমাদের কষ্ট হচ্ছে জানি। কিন্তু লেখাপড়া একটু করো। আন্দোলন করো, আমার আপত্তি নেই। আমার জন্ম আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তোমাদের একটু মানুষ হতে হবে। মানুষ না হলে দেশ গড়তে আমি পারব না। ভবিষ্যতে তোমাদের এ দেশের শাসনভার হাতে নিতে হবে। চুঙ্গা ফুকাও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু মেহেরবানি করে একটু কাজ করো।'
(৯ মে, ১৯৭২; রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দান)


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com