'খোদা নাকি মান্টো? কে বেশি ভালো গল্প লিখতে পারে?'
প্রকাশ : ১১ মে ২০২২, ০৮:০০
'খোদা নাকি মান্টো? কে বেশি ভালো গল্প লিখতে পারে?'
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

আজ ১১ মে, বুধবার কিংবদন্তি সাহিত্যিক ও উপমহাদেশের প্রখ্যাত গল্পকার সাদত হাসান মান্টোর জন্মদিন। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই এই কিংবদন্তি সাহিত্যিকের প্রতি।


মান্টো বলে গিয়েছিলেন, "আমি থাকবো না, কিন্তু আমার ভাষ্য থেকে যাবে, আমার গল্পই আমার কথা বারবার বলবে।" তাইতো সালমান রুশদির ভাষায় সাদত হাসান মান্টো হলেন "Undisputed master of modern Indian short story." মৃত্যুর কিছুদিন আগে মান্টোর লেখা এপিটাফের সাক্ষ্যে বলা— "কে বেশি ভালো গল্প লিখতে পারে? খোদা নাকি মান্টো?' প্রখ্যাত সাহিত্যিক কৃষণ চন্দর বলেছিলেন, "উর্দু সাহিত্যে অনেক ভালো গল্পকারের জন্ম হয়েছে, কিন্তু মান্টো দ্বিতীয়বার জন্ম নেবে না, আর তার স্থান কেউ পূরণ করতে পারবে না। মান্টোর বিদ্রোহ আধুনিক সভ্যতার পাপের বিরুদ্ধে। তার এই প্রচ্ছন্ন বিদ্রোহের মাঝে আমরা খুঁজে পাই মান্টোর ক্ষোভ, ঘৃণা আর ভালোবাসা।"



সাদত হাসান মান্টোর জন্ম ১৯১২ সালের ১১ মে ভারতের পাঞ্জাবের লুধিয়ানার পাপরউদি গ্রামের এক ব্যারিস্টার পরিবারে। মান্টোর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত। তার বাবা গুলাম হাসান মান্টো ছিলেন আদালতের বিচারক। পারিবারিক ঐতিহ্যের জন্য দারুণ গর্বিত ছিলেন মান্টো। ভাইবোনদের মধ্যে মান্টো ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত বলে দারুণ গর্ব বোধ করতেন তার পরিবার। কাশ্মীরি লোকজনের সাক্ষাৎ পেলে তার বাবা দারুণ সমাদর করতেন।
পারিবারিক কড়া শাসন আর শৃঙ্খলার মধ্যেই বেড়ে ওঠা মান্টোর।


প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার শুরু অমৃতসরের এক মুসলিম হাই স্কুলে। কিন্তু স্কুলের গন্ডিতে তার মন প্রাণ হাঁপিয়ে উঠতো। ছিলেন দুষ্টুর শিরোমণি। একবার স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে গুজব রটিয়ে দিয়েছিলেন আমেরিকা তাজমহল কিনে নেবে, নানা যন্ত্রপাতি ভারতে আসছে। একটা সময় নাটকের ভূত চেপেছিল মান্টোর মধ্যে। নাট্যদল অব্দি গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু গুলাম হাসান মান্টো ছেলের এমন কীর্তির সংবাদ শুনে হারমোনিয়াম তবলা ভেঙে দিয়েছিলেন। তার মতে এসব নাপাক কাজ আর যাই হোক তার ছেলে করতে পারে না। স্কুলে পড়া অবস্থায় মান্টোর টেবিলে থাকতো ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক ভগত সিংহের মূর্তি। পড়ার সময়ও চুমু আঁকতেন তিনি সেই মূর্তিতে। মান্টো স্বপ্ন দেখতেন তিনি ভগত সিংহের মতো ইংরেজ তাড়াচ্ছেন। অন্যদিকে দিনভর অমৃতসরের রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা আর দুচোখ জুড়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন মান্টোর।


আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে মান্টোর পরিচয় হয় প্রগতিশীল কবি আলী সরদার জাফরির সঙ্গে। প্রথমদিন পরিচয় হওয়ার পর মান্টো নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন "কমান্ডার মান্টো" নামে। ১৯৩১ সালে কলেজে পড়ার সময় অবিভক্ত ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামের অশান্ত পরিবেশে এসে মান্টোর পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটলো। এর পরের বছর মারা যান মান্টোর বাবা গুলাম হাসান মান্টো। ১৯৩২ সালে বাবার মৃত্যুর পর মান্টো যেন জীবনের চরম রূপ দেখলেন। অসহায় হয়ে পড়লেন মান্টো। সেই সময় বাধ্য হয়ে উপার্জনের পথ বেছে নিতে হলো মান্টোকে। সে সময় তার্কিক লেখক আবদুল বারি আলিগের সঙ্গে মান্টোর দেখা হলো।


১৯৩৩ সাল, মান্টোর ২২ বছর। আবদুল বারি আলিগের সঙ্গে এই সাক্ষাৎই ছিল মান্টোর জীবনে এক অন্যতম মাইলফলক। আবদুল বারি আলিগ, একদিন বললেন, "মান্টো বিশ্বসাহিত্য জানতে চাও তো রুশ এবং ফরাসি ভাষা শিখে নাও। এটি ভীষণ কাজে দেবে তোমাকে। এই দুই ভাষাই বিশ্বসাহিত্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে আছে।" কয়েক মাসের মধ্যে রুশ ও ফরাসি ভাষা অনেকখানি আয়ত্বে চলে এলো মান্টোর। এরপর একটা সময় মান্টো ভিক্টর হুগোর বিখ্যাত “The last Day of a Condemned Man” এর উর্দু অনুবাদ করেছিলেন। যা পরবর্তীকালে “সারগুজাস্‌ত-ই-আসির”( এক বন্দীর গল্প) নামে উর্দুতে প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে মান্টোর হাতে রাশিয়ান গল্পের উর্দু অনুবাদ “রাশি আফ্‌সানে” প্রকাশিত হয়। বিদেশি সাহিত্য উর্দু ভাষায় অনুবাদ করতে গিয়ে মান্টো যেন এক অন্য জগতের সন্ধান পেলেন। কিংবদন্তি সাহিত্যিক ভিক্টর হুগো, অস্কার ওয়াইল্ড, আন্তন চেখভ, মাক্সিম গোর্কির লেখার সঙ্গে আগে খানিক পরিচয় থাকলেও এই সময় তার বিস্তৃতি ঘটলো যেন পূর্ণমাত্রায়।


মান্টোর প্রথম গ্রন্থ ছিল গল্পগ্রন্থ "আতিশ পারে"। "আতিশ পারে" প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৩৬ সালে। এই গ্রন্থে ছিল মোট ৮টি গল্প। নিজের প্রথম গ্রন্থটি মান্টো উৎসর্গ করেছিলেন তার বাবাকে। মূলত আবদুল বারি আলিগের পরামর্শেই ছাপা হয়েছিল এই গ্রন্থ। এর আগে সাপ্তাহিক সাহিত্য সাময়িকী খালাকে প্রকাশিত হয়েছিল এই গল্পগুলো। সে বছর মান্টো অমৃতসর থেকে জীবিকার খোঁজে চলে এলেন বোম্বাইতে। এখানে এসে চাকরি নিলেন নাজির লুধিয়ানভির সাপ্তাহিক "মুসাব্বির" পত্রিকায়। বেতন মাত্র চল্লিশ টাকা। এই পত্রিকায় চার বছর চাকরি করেছিলেন মান্টো।


পরবর্তী সময়ে ক্রমশ সাদত হাসান মান্টো হয়ে ওঠেন উর্দু সাহিত্যের একজন জনপ্রিয় ছোটগল্পকার। তার বিখ্যাত গল্পের মধ্যে আছে বু, টোবা টেক সিং, তামাশা, ঠান্ডা গোশত, কালি সালোয়ার, খালি বোতল, ধুঁয়া ইত্যাদি। তার রচনায় দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা, দাংগা, মানব চরিত্রের বীভৎসতা বারংবার ঘুরে ফিরে আসে। প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক চিন্তার এই উর্দু ছোটগল্পকারকে তার মুক্তচিন্তার কারণে অপমানিত, লাঞ্ছিত হতে হয় ভারত পাকিস্তান দুই দেশেই। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে সপরিবারে তিনি লাহোর চলে যান। পাকিস্তানের কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, নাসির কাজমি, আহমেফ রহি প্রমুখের সংস্পর্শে আসেন। প্রগতিশীল রাজনৈতিক সাহিত্যচর্চায় তার বিশেষ খ্যাতি হয়।



তিনি একজন বেতারলিপি লেখক ও সাংবাদিকও ছিলেন। তার ছোট গল্পের সংকলন Kingdom's end and other stories, একটি উপন্যাস, তিনটি প্রবন্ধ সংগ্রহ ও ব্যক্তিগত স্কেচের দুটি সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে। বোম্বাই চলচ্চিত্র জগত অর্থাৎ বলিউডে মান্টোর অজস্র কাজ রয়েছে। বহু সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে প্রথম শ্রেনীর চিত্রাভিনেতা ও পরিচালকদের কাছে মান্টোর কদর ছিল। আট দিন, চল চলরে নওজোয়ান, মির্জা গালিব ইত্যাদি সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটিং তার কৃতিত্ব।


কীর্তিমান সাহিত্যিক সাদত হাসান মান্টো “লিভার সিরোসিস”-এ আক্রান্ত হন। তার জীবনযাত্রা ছিল বাউণ্ডুলে। শরীরের প্রতি অযত্ন, অপ্রতুল চিকিৎসা, আর্থিক অনটন ইত্যাদিতে জর্জরিত মান্টোর বেঁচে থাকার প্রবল আগ্রহ ব্যাধির কাছে আত্মসমর্পণ করে। ১৯৫৫ সালের ১৮ জানুয়ারি তার অকাল প্রয়াণ ঘটে তার দ্বিতীয় আবাস ভূমি লাহোরে।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com