হার্ট রাখুন সুস্থ, সজীব ও সতেজ
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২২, ১২:০১
হার্ট রাখুন সুস্থ, সজীব ও সতেজ
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

হার্ট— শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। হার্টের ভালো থাকার সাথে অন্য অঙ্গগুলোর ভালো থাকা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কীভাবে ভালো রাখা যাবে হার্ট, সজীব ও সতাজ হার্ট নিয়ে কীভাবে পাবো দীর্ঘায়ু, আসুন জেনে নেই।


পরিমিত খাবারের সঙ্গে নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক চাপ না নেওয়া, ওজন নিয়ন্ত্রণ আর ধূমপান না করা—দৈনন্দিন জীবনে এরকম কয়টি অভ্যাস আপনার হৃৎপিণ্ডকে রাখবে সুস্থ-সবল। এই কাজগুলো কি খুব কঠিন না অসাধ্য। নতুন কোনো কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন ব্যাপার, কিন্তু মানুষ মাত্রই প্রতিনিয়ত নিজেকে পরিবেশ, পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেয়। অতএব চাইলেই কিছু অভ্যাসের পরিবর্তন করে নিজেকে ভালো রাখা যায়। দৈনন্দিন জীবনে নানা কৌশলে হার্ট ভালো রাখার এসব অভ্যাস গড়ে তুলে ফেলা সম্ভব খুব সহজেই। আসুন জেনে নিই এভাবে হৃৎপিণ্ড সজীব ও সতেজ রাখার সহজ উপায়:


কী ধরনের খাবার খাবেন


যেসব খাবারে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ আছে সেসব খাবার খাবেন। এসব খাবারের কারণে শরীরে স্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়। কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে সাহায্য করে এই ব্যাকটেরিয়া। ভালো থাকে হার্ট। বেশি আঁশ আছে এরকম সবজির মধ্যে রয়েছে শিম ও মটরশুঁটি জাতীয় সবজি, কলাই ও ডাল জাতীয় শস্য এবং ফলমূল। পুষ্টি বিজ্ঞানীরা বলছেন, আলু এবং শেকড় জাতীয় সবজি খোসাসহ রান্না করলে সেগুলো থেকেও প্রচুর আঁশ পাওয়া যায়।


গরুর দুধে থাকা লো ফ্যাট হৃদযন্ত্রের ক্রিয়াবিরোধী কম ঘনত্বসম্পন্ন লিপ্রোপ্রোটিনের হার কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি দুধে থাকা ক্যালসিয়াম শরীরে জমে থাকা পুরু চর্বির স্তর কাটতে ভূমিকা রাখে। অতএব নিয়মিত পান করুন গরুর দুধ।


শরীরের কোলেস্টেরল দূর করে রসুন। খালি পেটে এক কোয়া রসুন হার্টের পক্ষে দারুণ উপকারী। কাঁচা হলুদের উপকারিতার কথা আমরা সবাই জানি। এটি হার্টের জন্যও বেশ উপকারী। তাই হার্ট ভালো রাখতে কাঁচা হলুদ খান। রক্তচাপ কমাতে কলা কাজে লাগে। এতে প্রচুর পটাশিয়াম থাকে। তাই নিয়মিত কলা খান। ওটস বেশ স্বাস্থ্যকর একটি খাবার। হাই ফাইবার থাকে ওটসে। এটি হার্টের উপকারে লাগে। কোলেস্টেরল কমাতেও কাজে আসে। হার্টের সুস্থতা বজায় রাখতে ভিটামিন কে খুবই প্রয়োজন। তার সেরা উপায় সবুজ শাক-সবজি খাওয়া। এতে রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে থাকে।


মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ আমন্ড হার্টের জন্য উপকারী। পানিতে ভিজিয়ে ৬-৭টি আমন্ড রোজ খান। খালি পেটে খেলে সবচেয়ে বেশি উপকার।
তেলওয়ালা মাছেও ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে।এটিও হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ কার্যকরী।


খাদ্যাভ্যাস পাল্টানো


প্রাণীজ উৎস থেকে প্রাপ্ত ‘স্যাচুরেটেড ফ্যাট’ (ক্ষতিসাধক স্নেহ পদার্থ) যেমন ধরুন, ‘রেড মিট’ কিংবা পূর্ণমাত্রায় ফ্যাটযুক্ত দুগ্ধজাত দ্রব্যাদি হার্ট ভালো রাখতে এসব খাবার ছাড়তে হবে। ‘রেড মিড’-এর মেন্যুতে ধীরে ধীরে ‘লো-ফ্যাট মিট’ যোগ করুন।


খাবারে লবণের পরিমাণ কমান। প্রক্রিয়াজাত কিংবা প্যাকেটজাত খাবার কম খান। প্রতিদিনের খাবারে ১ হাজার ৫০০ মিলিগ্রামের বেশি লবণ খাবেন না। ভালো করে রান্না করলে শাকসবজি খেতে কিন্তু দারুণ লাগে। শাকসবজি খান প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই কাপ, সঙ্গে থাকুক ফলমূল। শস্যদানা বা ‘গ্রেইন’যুক্ত খাবার খেতে পারেন, যেমন বাদামি চাল, বার্লি, পপকর্ন, ওটমিল, গমের রুটি, গমের প্যানকেক ইত্যাদি।


বাদ দিতে হবে এনার্জি ড্রিংকস। এসব পানীয়কে ‘শত্রু’ হিসেবে গণ্য করুন। কেননা এসব পানীয় কোনোভাবেই আপনার কোনো ধরনের উপকারে আসবে না, উল্টো রক্তচাপ বাড়িয়ে আপনার ক্ষতি করবে।



নিয়মিত ব্যায়াম করুন


হৃৎপিণ্ড ভালো রাখতে প্রতিদিন নিয়ম করে ৩০ মিনিট ব্যায়ামের প্রয়োজন। কিন্তু ব্যায়ামের অভ্যাস না থাকলে হুট করে শারীরিক কসরতের মাধ্যমে ঘাম ঝরানো ভীষণ ক্লান্তিকর ব্যাপার। সেক্ষেত্রে, একটু হাঁটা কিংবা সাংসারিক কাজের মধ্য দিয়ে ব্যায়ামের রুটিন সেরে নিতে পারেন। প্রতিদিন ৩০ মিনিট ব্যায়াম মানে যে টানা আধঘণ্টা ব্যায়াম করতে হবে, সেটা কিন্তু নয়। এ সময়টাকে ভেঙে নিতে পারেন। সকালে ১০ মিনিট ঘাম ঝরালেন, দুপুরে অফিসে মধ্যাহ্নবিরতির সময় ১০ মিনিট হেঁটে খেতে গেলেন, অফিস থেকে ফেরার পর বিকেলে কিংবা রাতে এ রকম আরও কিছু কাজ দিয়ে ব্যায়াম সেরে নিতে পারেন। আজকাল অনেকে হেঁটে বাড়ি ফেরে, কিংবা বাড়ি ফেরার একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব হেঁটে যায়, অনেকে ফেরার পথে সাইকেল চালিয়ে ফেরে।


ব্যায়ামের পাশাপাশি শ্বাসের ব্যায়াম করুন। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন শ্বাসের ব্যায়াম উত্তম। এতে শুধু হার্ট না, পুরো শরীর ভালো থাকে। সেক্ষেত্রে, প্রথমে ৩০ সেকেন্ডে ছয়টি পূর্ণাঙ্গ শ্বাস-প্রশ্বাস সম্পন্ন করুন। এরপর সময়ের পরিমাণ কমাতে থাকুন। এ ব্যায়াম আপনার হৃদ সংকোচনসংক্রান্ত চাপ কমাতে ধন্বন্তরি ভূমিকা রাখবে।


চাপ কমান ও পরিমিত বিশ্রাম নিন


দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে পরিমিত বিশ্রাম নিন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘একাডেমি অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়াবেটিস’-এর চিকিৎসক সুসান মুরের ভাষ্য, হৃৎপিণ্ডের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় মানসিক চাপ ‘খলনায়ক’-এর ভূমিকা পালন করে। গোটা স্বাস্থ্যের ওপরই এটা মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
আর তাই মাঝেমধ্যে কাজ ফেলে উঠে দাঁড়ান। বড় করে একটা শ্বাস নিন। কিছু সময় মোবাইল ফোন বন্ধ করুন। সাংসারিক কিংবা অফিসের কাজ ভুলে যান। স্রেফ নিজের জন্য বিশ্রাম নিন। সেটা শুয়ে-বসে যেকোনোভাবে। বিশ্রাম নেওয়ার পর দেখবেন ভীষণ ফুরফুরে লাগছে। মানে, ওই বিশ্রামের সময়টুকু আপনাকে কাজের জন্য উজ্জীবিত করে তুলবে।


ওজনকে বশ মানান


হার্ট ভালো রাখতে হলে ওজনের দিকে নজর দিতে হবে। ওজন কম হলে আবার বিপদ প্রেসার লো হতে পারে। আর বেশি হলে বাড়ে হৃদরোগের ঝুঁকি। ওজন ঠিক রাখতে খেতে হবে পুষ্টিকর খাবার। স্বাস্থ্যকর খাবার আর ক্যালরিযুক্ত খাবার কিন্তু এক নয়। পুষ্টিকর খাবার খান এবং ক্যালরি খরচ ও গ্রহণে ভারসাম্য আনুন। শাকসবজি রাখতেই হবে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায়।শারীরিক পরিশ্রম, নিয়মিত ব্যায়াম বা হাঁটা বাধ্যতামূলক করুন। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। বাসা থেকে বের হয়েই রিকশা না নিয়ে হেঁটে কিছুটা পথ এগোন। বাসায় ফেরার পথেও একই কৌশল অনুসরণ করুন।


ধূমপান ছাড়ুন অবশ্যই


ধূমপানের অপকারিতা সমন্ধে আমরা সবাই জানি, হার্টের জন্য এটি অপকারীই নয়, মারাত্মক।ক্ষতিকর। এ বদভ্যাসটি ছাড়া ব্যাতীত অন্য কোনো পথ নেই। ধূমপান ত্যাগ করার জন্য ধূমপানের অপকারী দিকগুলো নিয়ে ভাবুন, আবার ধূমপান ছাড়ার উপকারী দিকগুলোতে মনোযোগী হতে পারেন। ধূমপায়ী বন্ধুদের সঙ্গ ত্যাগ করাই শ্রেয়। মদ্যপান এড়িয়ে চলুন। এটা ধূমপানে আপনাকে আরও আকৃষ্ট করবে। শরীরচর্চার মধ্যে থাকলে ধূমপানের ইচ্ছা কমে যেতে পারে। কর্মচাঞ্চল্যের মধ্যে থাকলেও সুফল পেতে পারেন।



মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করুন জীবনে


হার্ট ভালো রাখতে মানসিক প্রশান্তির বিকল্প নেই। কিন্তু কর্মক্ষেত্র, সমাজ কিংবা পরিবার থেকে মানুষ নানাভাবে চাপে থাকে। এসব চাপ যেমন মোকাবিলা করতে হবে, তেমনি বুদ্ধি করে কমাতেও হবে। প্রতিদিনের কাজের চাপ শেষে নিজের জন্য আলাদা করে একটু সময় বের করুন। পছন্দের গান শুনতে পারেন কিংবা বই পড়তে পারেন। কোনো কারণে মনে কষ্ট পেলে তা বন্ধু কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে ভাগ করে নিন। মনে কষ্ট পুষে রাখবেন না। এ ধরনের অভ্যাস হৃদ্‌রোগ ডেকে আনে। সবচেয়ে ভালো হয় পরিবার কিংবা কর্মক্ষেত্রে চমৎকার সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলা।


এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৮০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ একাকিত্ব বোধ করেন এখনকার মানুষ। অর্থাৎ ১৯৮০ সালে এ হার ছিল ২০ শতাংশ, এখন ৪০ শতাংশ। একাকিত্ব শুধু মানসিক ক্ষতি করে না, শারীরিক ক্ষতিও করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, কেউ যখন কারও সঙ্গে কথা বলে, তখন হরমোন নিঃসরণের মাধ্যমে মস্তিষ্ক হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। এতে হৃৎপিণ্ডের কার্যক্রম দারুণ সচল হয়ে ওঠে। অর্থাৎ হৃৎপিণ্ড ভালো রাখতে মানসিক চাপ কমানো এবং চারপাশের মানুষের সঙ্গে চমৎকার সম্পর্ক গড়ে তোলাও জরুরি।


সঙ্গীর সাথে সময় কাটান ও হাসুন


গবেষণায় দেখা গেছে, সঙ্গীর সঙ্গে যাঁরা মাসে একবার শারীরিক সম্পর্ক করে থাকেন তাঁদের তুলনায় যাঁরা সপ্তাহে দুই বা তার বেশিবার করেন তাঁদের হার্ট বেশি সুস্থ থাকে। আমেরিকান জার্নাল অব কার্ডিওলজির মতে, শারীরিক সম্পর্ক হৃদযন্ত্রের ক্রিয়াকে নিরাপদ করে তোলে, যেভাবে পোশাক তাপমাত্রার হাত থেকে শরীরকে রক্ষা করে। আর, হাসি হার্টকে পুরনায় উদ্দীপিত করে। হাসির আমেজ জীবনে রাখতেই হবে যদি সুস্থ হার্ট চান।


জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বুঝে নিতে হবে


আপনার যদি উচ্চ রক্তচাপ থাকে বা হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকে, সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির (পিল, প্যাচেজ) ব্যবহার হার্টের ক্ষতি করতে পারে। তাই এসব ব্যবহারের আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।


পরিমিত ঘুম চাই


ভালো ঘুম শরীরের জন্য খুবই জরুরি। ভালোভাবে না ঘুমালে স্ট্রোক এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। নির্দিষ্ট সময় ঘুমাতে যান এবং ঘুম থেকে উঠুন। এতে হার্ট ভালো থাকবেই, সব অভ্যাস মেনে চলাও সহজ হয়ে যাবে। যেমন সকালে হাঁটা বা ব্যায়াম, সময়মত খাদ্যগ্রহন, বিষণ্ণতা-অবসাদ এগুলোও কমবে জীবনে।


মূলত নিয়মতান্ত্রিক ও সুস্থচিন্তার একটি হাসিখুশি জীবন আপনাকে দিতে পারে সুস্থ, সজীব ও সতেজ হার্ট। আর সুস্থ মানেই সুস্থ সুন্দর একটি জীবন। হার্ট ভালো রাখতে মেনে চলুন নির্দেশিকাগুলো। জীবন হয়ে উঠুক আনন্দের।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com