সাক্ষাতকার
সাইবার নিরাপত্তায় দরকার সর্বজনীন সচেতনতা: তপন কান্তি সরকার
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২২, ১০:৫৬
সাইবার নিরাপত্তায় দরকার সর্বজনীন সচেতনতা: তপন কান্তি সরকার
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও ব্যাংকিংসহ সকল সেক্টরে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে অলাভজনক সংগঠন সিটিও ফোরাম বাংলাদেশ। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সাইবার নিরাপত্তার উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংগঠনটি। যেমন, ইনোভেশন হ্যাকাথন, সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওর্য়াকশপ ইত্যাদি।


সম্প্রতি রাজধানীর পান্থপথে কনসেপ্ট টাওয়ারে সিটিও ফোরাম বাংলাদেশের কার্যালয়ে বিবার্তার সাথে কথা বলেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তপন কান্তি সরকার। আলোচনায় দেশের সাইবার নিরাপত্তার বর্তমান অবস্থা, ব্যাংকিংসহ সব সেক্টরে কেন সাইবার আক্রমণ হচ্ছে, এ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়সহ সমসাময়িক নানান বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন উজ্জ্বল এ গমেজ।


বিবার্তা: দেশের সাইবার নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন?


তপন কান্তি সরকার: ‘সাইবার অপরাধ’ বলতে মূলত ইন্টারনেট ও কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধকে বুঝায়। ২০০৮ সাল থেকে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার মহাকর্মযজ্ঞ চলছে। সময়ের পরিক্রমায় দেশের তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। সব সেক্টরকেই প্রযুক্তিবান্ধব করার জন্য ঢেলে সাজানো হচ্ছে। অটোমোটেড করা হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, মন্ত্রণালয়সহ সবকিছু। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান কম। না জেনেও তারা ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমুর মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হরহামেশা ব্যবহার করছে। শুধু প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান কম থাকার কারণে বেশিরভাগ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নানারকম বিপদে পড়ছে। সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। একইভাবে সবধরনের প্রতিষ্ঠানও নানা সাইবার সংক্রান্ত দুর্ঘটনার মোকাবেলা করছে।



আশার কথা হলো, দেশের সাইবার নিরাপত্তার অবস্থা নিয়ে আমাদের সরকার, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এখন সরকারি বেসরকারিভাবে সবাই এই বিষয়ে কাজ করছে। আর এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। সাইবার নিরাপত্তা অন্তহীন।


বিবার্তা: সাইবার নিরাপত্তার সুরক্ষার ক্ষেত্রে কী কী সমস্যা রয়েছে?


তপন কান্তি সরকার: দেখুন, সাইবার নিরাপত্তার পুরো বিষয়টাই নির্ভর করে সঠিক পরিকল্পনার উপর। যেমন, আপনি ফেসবুক ব্যবহার করেন। এটা দিয়ে অনলাইন ব্যবসা করছেন। যে প্লাটফর্মে আপনি ব্যবসা পরিচালনা করছেন, এটার পাসওয়ার্ড তৈরির সময় আইডির নিরাপত্তার বিষয়টা নিশ্চিত করতে হবে। একই কথা যে কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, ব্যাংকিং সার্ভারগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সঠিক পরিকল্পনা দরকার। প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে যিনি আইটির দায়িত্বে আছেন, তারা সবাই যেনো এই বিষয়ে সচেতন হন। সার্ভারকে সাইবার আক্রমণের হাত থেকে রক্ষার জন্য দক্ষ কর্মী নিয়োগ দেয়া হলো। ওই কর্মী প্রতিষ্ঠানের সার্ভারকে মেইনটেইন করার জন্য যে বাজেটের প্রয়োজন তার চাহিদা দিলেন। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানে একবারে উপরে যিনি আছেন তিনি আইটির বিষয়টা বোঝেন না। তারা আইটিতে দক্ষ কর্মীর দেয়া বাজেটকে পাস না করে কমিয়ে দিলেন। তখন কিন্তু কাজ মানহীন হয়। অন্যদিকে, একজন অদক্ষ কর্মীকে যদি একটা বড় প্রতিষ্ঠানের সার্ভার সুরক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়, সেটাও তার পক্ষে দক্ষহাতে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। পুরো বিষয়টা যদি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা না বোঝেন, তাহলে মহাবিপদ।


বিবার্তা: হ্যাকাররা বাংলাদেশকে টার্গেট করে কেন?


তপন কান্তি সরকার: কয়েক বছর আগেও হ্যাকাররা হ্যাকিংয়ের জন্য বাংলাদেশকে টার্গেট করতো না, কিন্তু এখন করছে। কারণ বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত হয়েছে। আমাদের দেশ সম্ভাবনাময় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক গতিশীল। রিজার্ভও ভালো। দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনলাইন ট্রানজেকশন, কেনাকাটা, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রতিযোগিতা লক্ষ্যনীয়। এখানে হ্যাক ভ্যালু বেশি কিন্তু সাইবার নিরাপত্তা কম। এসব কারণে বাংলাদেশকে হ্যাকাররা টার্গেট করে।



বিবার্তা: দেশে এটিএম কার্ড জালিয়াতি, ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মতো ঘটনার নেপথ্যের কারণ কী?


তপন কান্তি সরকার: আমাদের দেশে ইতোমধ্যেই এসব ঘটনা ঘটেছে। বিষয়গুলো খুবই উদ্বেগজনক। এটিএম কার্ড জালিয়াতির পর বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দেশের অনলাইন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের ঘাটতি আছে বলে আমার মনে হয়েছে। তার চেয়ে বেশি আছে সচেতনতার অভাব। ফলে বিভিন্ন সময়ে এটিএম কার্ড নকল এবং গ্রাহকের তথ্য হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে।


বিবার্তা: হ্যাকারদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন উপায় আছে কী?


তপন কান্তি সরকার: একটা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে যত ধরনের ডিভাইস আছে, তার সবগুলো শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিনিয়ত সিকিউরিটি আপডেট, পাসওয়ার্ড আপডেট নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা বিষয়ে প্রযুক্তিগত এবং পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রতিনিয়ত উন্নতমানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।


বিবার্তা : বাংলাদেশে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন?


তপন কান্তি সরকার: বিভিন্ন সময়ে এটিএম কার্ড নকল ও গ্রাহকের তথ্য হ্যাকিংয়ের ঘটনাও ঘটেছে। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ঘটা ঘটনাগুলোতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কম। সম্ভাবনাময় এই খাতের উন্নয়নে প্রধান অন্তরায় অনলাইন লেনদেনের নিরাপত্তা। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক আরটিজিএস, বিএফটিএন, ইএফটি, ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচসহ অনেকগুলো প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করেছে। আমাদের অনলাইন ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের মধ্যেও ইলেকট্রনিক লেনদেনে যে সচেতনতার অভাব রয়েছে সেদিকেও মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের অবশ্যই পিসিআই-ডিএসএস ও ইএমভির মতো প্রযুক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং ব্যাংকগুলোকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেবার মান আরো বাড়াতে হবে।