‘ব্যাপক দুর্নীতি এবং মূল্যবোধের ধস-পরিণতি দারিদ্র্য’
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২২, ১৪:২৮
‘ব্যাপক দুর্নীতি এবং মূল্যবোধের ধস-পরিণতি দারিদ্র্য’
আদনান সৌখিন
প্রিন্ট অ-অ+

‘ব্যাপক দুর্নীতি বৃদ্ধি এবং মূল্যবোধের ধসের পরিণতি হচ্ছে দারিদ্র। একশ্রেণির মানুষ ধনী থেকে আরো বেশি ধনী হচ্ছে, আরেক শ্রেণি গরিব থেকে আরো বেশি গরিব হচ্ছে। দুর্নীতি বাড়ার ফলে সম্পদের সঠিক বন্টন নিশ্চিত হচ্ছে না। ফলে এক শ্রেণি বিলাসী জীবন যাপন করছে, আর অপর শ্রেণি মানবেতর জীবনযাপন করছে। আর এর মাঝখানে আরেকটি শ্রেণি আছে। তারা চিন্তা করে কিভাবে নিজেকে এই রেসের মধ্যে টিকিয়ে রাখা যায়। তারা যে-কোনো উপায়ে টাকা ইনকাম করতে পারলেই বাঁচে। মধ্যবিত্তরা চাচ্ছে আরো ভোগবিলাসী জীবনযাপন করতে। সেজন্য তারা ধার দেনায় জর্জরিত হয়ে পরছে। এটি একটি চক্রাকার সমস্যা এবং এই চক্রের শেষ পরিণতি হচ্ছে দারিদ্রতা।’


কথাগুলো বলছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক (উপ-সচিব) ড. এম. এম. মাজেদুল ইসলাম।


ড. এম. এম. মাজেদুল ইসলামের জন্ম ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে, খুলনার ডুমুরিয়ায়। ডুমুরিয়া থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিন থেকে কৃতিত্বের সাথে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে ২০০৬ সালে ২৫তম বিসিএসে ইকোনমিক ক্যাডারে যোগ দেন। ড. মাজেদুল ইসলাম ২০০৯ সালে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Environmental Studies-এ দ্বিতীয়বার স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং ২০১৭ সালে নেদারল্যান্ডের Wageningen বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Environmental Science-এ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি সরকারের একজন উপ-সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সাহিত্যানুরাগী। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘জাপান প্রবাসীর জীবন’ ২০১১ সালে এবং দ্বিতীয় উপন্যাস ‘নিহি এবং ইউরোপের শীত বসন্ত’ ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়। ২০২১ গ্রন্থমেলায় তাঁর প্রবন্ধের বই ‘মানুষ ও প্রকৃতি’ প্রকাশিত হয়। এছাড়া, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে মাজেদ মিন্টুর বেশ কিছু গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।


সম্প্রতি গুণী এই ব্যক্তিত্ব বিবার্তার মুখোমুখি হয়েছিলেন। কথা হয় তার দীর্ঘ পথ পরিক্রমা নিয়ে। সম-সাময়িক সামাজিক ইস্যু, নৈতিকতা এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী কথা বলেছেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এই কর্মকর্তা। বিবার্তার পাঠকদের জন্য আলাপের চুম্বক অংশ তুলে দেয়া হলো।


বিবার্তা: আপনার শৈশব থেকে বেড়ে ওঠার গল্পটা জানতে চাই।


ড. এম এম মাজেদুল ইসলাম: আমি একটি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছি। আমার বাবা শিক্ষক ছিলেন। খুব সাধারণ একটি গ্রামে আমার বেড়ে ওঠা। খুব বেশি আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকার কারণে সমাজের আর দশটা ছেলের মতো হয়তো হাত খুলে খরচ করতে পারিনি, কিন্তু লেখাপড়া চালানোর জন্য যে খরচ সেটা দেয়ার জন্য আমার বাবা কখনো কার্পন্য করেননি। দুরন্ত একটি শৈশব ছিলো আমার। গ্রামের উন্মুক্ত প্রান্তরে দৌড়ে বড় হয়েছি। ধানক্ষেত, পুকুরে ঝাপাঝাপি, বিকেলে ক্রিকেট, ফুটবল খেলা- এ সবকিছুই ছিলো আমার ছেলেবেলা।



বিবার্তা: সেই সময় আর এখকার সামাজিক মূল্যবোধের মধ্যে কীকীপার্থক্য দেখেন?


ড. এম এম মাজেদুল ইসলাম: মূল্যবোধের কথা বলার আগে বলে নেয়া দরকার, আমাদের সমাজে তিনটি শ্রেণি আছে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। অর্থনৈতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে এই বিভাজনগুলো করা হয়। মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে এটি শুধু অর্থনৈতিক অবস্থাই নয়, সেই সাথে চলে আসে পেশা, শিক্ষা, মর্যাদাপূর্ণ সামাজিক অবস্থানসহ আরো নানা কিছু। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত বলতে আমরা বুঝতাম সমাজের এমন এক শ্রেণির মানুষ যাদের সমাজে মোটামুটি অবস্থান আছে এবং তাদের নীতি নৈতিকতার মানদণ্ড খুবই উচ্চ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, বর্তমান সময়ে এই মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যেই নীতি নৈতিকতার চরম অবক্ষয় দেখা দিয়েছে, বলতে গেলে বিলুপ্তির পথে। এখন যেনো টাকা ইনকাম করাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। সেই টাকা কোন সোর্স থেকে আসছে সেটা আর এখন গুরুত্ব পাচ্ছে না। যেকোনো উপায়ে টাকা ইনকাম করা এবং সেই টাকা দিয়ে বিলাসী জীবন যাপন করাই এখন মানুষের প্রধান লক্ষ্য হয়ে গেছে। উচ্চবিত্তদের অনুকরণ করতে গিয়ে অনেকেই নিজের নীতি নৈতিকতা হারিয়ে বসে আছেন। নিজের আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে কিভাবে আরো ভোগবিলাসী জীবনযাপন করা যায় সেটাই এখন মানুষের নেশা হয়ে গেছে। আজ থেকে ২০/৩০ বছর আগেও মানুষের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা ছিলো, অল্পে তুষ্ট থাকার মতো একটি মহৎ গুণ ছিলো। সেটি এখন নেই বললেই চলে। বিশেষ করে মধ্যবিত্তদের মধ্যে সেটি তখন অত্যন্ত প্রবল ভাবে দেখা যেতো, যা আজকের মধ্যবিত্তদের মধ্যে অনুপস্থিত। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে এই দোষ-ত্রুটিগুলো নিয়ে আমরা সমালোচনা করতেও ভুলে গেছি।


বিবার্তা: সামাজিক মূল্যবোধ দুর্নীতি ও দারিদ্র- এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে আপনি কি ধরনের সংযোগ দেখতে পান?


ড. এম এম মাজেদুল ইসলাম: এগুলো প্রত্যেকটি একটি আরেকটির সাথে রিলেটেড। বিশেষ করে দুর্নীতির সাথে মূল্যবোধের ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। এই যেমন আমাদের দেশে দুর্নীতি ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। আগে মধ্যবিত্ত সমাজের স্ত্রীরা স্বামীর আয় উপার্জন সম্পর্কে প্রশ্ন করতো। সন্তানরা প্রশ্ন করতো ‘বাবা তোমার তো বেতন বেশি না! তুমি কিভাবে এই জিনিসটি কিনে আনলে?’ কিন্তু আজকাল সমাজ থেকে বা পরিবার থেকে ইনকামের উৎস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় না। অনেক সময় দেখা যায় মসজিদে মন্দিরে একজন নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, বড় অংকের ডোনেশন দেয়। কেউ কিন্তু কখনো প্রশ্ন করে না এই টাকাটা আসলো কোথা থেকে। দুর্নীতির একটি নীরব গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে সমাজে।


বিবার্তা: বিশ্ব র‍্যাঙ্কিয়ে দেড় হাজারের মধ্যে আমাদের দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান নিয়ে আপনার মতামত কী?


ড. এম এম মাজেদুল ইসলাম: দেখুন আমি আপনার সবগুলো কথার সাথেই একমত। এটি খুব দুঃখের বিষয় যে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র‍্যাঙ্কিংয়ে নেই। দেশের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিন্তু সবসময় দাবী করে, আমরা ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়, অনেক পুরানো বিশ্ববিদ্যালয়। সবই ঠিক আছে, সেটা দেশের অভ্যন্তরে আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু বিশ্বের কাছে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত হতে হলে আরো অনেকগুলো বিষয় আছে যেগুলো নিশ্চিত করতে হয়। এখন গ্লোবালাইজেশনের যুগ। বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতা করেই টিকে থাকতে হবে। পাশের দেশ চায়না, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর- তারা তাদের নিজেদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরো বেশি উন্নত করার জন্য কতো চেষ্টা করছে! সেই তুলনায় আমরা তো কিছুই করছি না। এমনকি পাশের দেশ ভারতও চেষ্টা করছে, তাদের দেশের ২০টির মতো বিশ্ববিদ্যালয়কে যেনো বিশ্বের টপ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নিতে পারে।


গতবছর ইউজিসি একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা গেছে গত ১ বছরে বাংলাদেশের ৪৫% বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের গবেষণা হয়নি। বাংলাদেশ খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি দেয়া হয়। বেশির ভাগই মাস্টার্স পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। আমি নেদারল্যান্ডের যে সুপারভাইজারের কাছে পিএইচডি করেছি, তিনি কিছুদিন আগে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। তিনি ১০০০টি পিএইচডি সুপারভাইজ করেছেন। তাহলে চিন্তা করে দেখুন, সেখানে একজন প্রফেসর এক হাজারটা পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করেছেন। আর এদিকে বাংলাদেশের এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কি আছে, যাদের টোটাল পিএইচডি সংখ্যা ১০০০!


বিশ্ববিদ্যালয়ের এই র‍্যাঙ্কিংয়ের বিষয়টি আমার পুরোপুরি নির্ভুল মনে হয় না। কারণ যারা র‍্যাঙ্কিং করেন তাদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একটি নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। তাদেরকে কিছু তথ্য প্রদান করতে হয়। আমার মনে হয় বাংলাদেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সেই যোগাযোগ রক্ষা করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ শাখায় যারা কর্মরত আছেন, তাদের উচিত এই যোগাযোগটা ঠিক রাখা। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা যে একদম হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। যেগুলো হচ্ছে সেগুলো হাইলাইট করা দরকার বলে আমি মনে করি।


বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা আরো একটি অভিযোগ করে থাকেন। তারা গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ড পাচ্ছেন না। আমার কাছে মনে হয়, এটি পার্শিয়ালি ট্রু। পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক কম বাজেটেও, অনেক ভালো গবেষণা করা সম্ভব। বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে আরো বরাদ্দ বাড়ানোর। তবে এর পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বেসরকারি ফান্ড আছে, সেখানে বাংলাদেশের অনেক শিক্ষকই আবেদন করছেন। তারা পাচ্ছেনও এবং একটি মানসম্মত গবেষণাও করছেন। একটি জার্নাল পেপার প্রকাশ করার জন্য খুব বেশি ফান্ডের দরকার নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গবেষণার ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও গবেষণায় আরো বেশি মনোনিবেশ করার অনুরোধ থাকবে। গবেষণায় পিছিয়ে থেকে একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন করা কখনোই সম্ভব না।



বিবার্তা: বহির্বিশ্বের সাথে আমাদের দেশের শিক্ষার বেসিক পার্থক্যগুলো কীকী?


ড. এম এম মাজেদুল ইসলাম: তাদের সাথে আমাদের পার্থক্যের মূল জায়গাটাই হচ্ছে গবেষণা এবং গবেষণার মান। আমাদের দেশে এখনো শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি করা হয়। এছাড়া প্রমোশন ব্যবস্থায়ও সমস্যা আছে। একজন শিক্ষকের চাকরি ১০/১২ বছর হয়ে গেলে তিনি প্রফেসর হয়ে যাচ্ছেন। তার কি ধরনের কতোগুলো গবেষণা রয়েছে, সেটা দেখা হচ্ছে না। পক্ষান্তরে ইউরোপের একটি দেশে শিক্ষকদের পদোন্নতি নিতে হলে, তিনি বাৎসরিক কতোগুলো গবেষণা করেছেন, কতোগুলো জার্নাল পেপার প্রকাশিত হয়েছে- সেসব বিবেচনায় রাখা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে গবেষণা মানসম্মত না হলে তাকে প্রমোশনের বদলে ডিমোশনও দেয়া হচ্ছে।


বিবার্তা: দেশের স্বাস্থ্যখাতকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?


ড. এম এম মাজেদুল ইসলাম: আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। সার্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা (Universal Health Coverage) নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশের উপজেলা পর্যায়ে এখন পর্যন্ত একটি ভালো হাসপাতাল নাই। বিশেষায়িত হাসপাতাল তো দূরের কথা। জেলা পর্যায়েও একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল পাওয়া দুষ্কর। বড় কোনো রোগ হলে প্রায় সবাইকেই ঢাকায় আসতে হয়। ধনী পরিবারের লোকেরা সর্দি-কাশি হলেই বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখানোর সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু যারা গ্রামে থাকে, তারা কিন্তু বড় বড় অসুখ হলেও সামান্য চেকআপ করানোর সুযোগ পাচ্ছে না। এমনকি ঢাকা মেডিকেলের বারান্দায়ও তারা জায়গা পাচ্ছে না। কোন রোগের জন্য, কোন ডাক্তার দেখাতে হবে, সেটাও নির্ধারণ করা নেই। সামান্য সর্দি কাশি হলে জেনারেল প্রাকটিশনারের কাছে গেলেই হবে। তিনি যদি রেফার করেন বিশেষজ্ঞ কোনো ডাক্তারের, তবে তিনি সেখানে যেতে পারেন। অযথা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে ভিড় করে তো লাভ নেই। এটাকে বলে Two stage two referral system. এটা আমাদের দেশে নাই।


চিকিৎসা খাতে আরেকটি সময়ের দাবি হচ্ছে স্বাস্থ্য বীমা। শুধুমাত্রই হেলথ ইন্সুরেন্স না থাকার কারণেই, প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় টাকার অভাবে মারা যায়। অনেকে দারিদ্র সীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব না। যেকোনো রোগের ক্ষেত্রে, সবার সমান চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে হেলথ ইন্সুরেন্স নিয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। আশা করা যায় এটি খুব দ্রুত আলোর মুখ দেখবে।



বিবার্তা: ভেজাল খাদ্যকে ঘিরে রমরমা ব্যাবসা চলছে। কিভাবে ও কেনো এটা সম্ভব হচ্ছে? আপনার মতামত জানতে চাই।


ড. এম এম মাজেদুল ইসলাম: ভেজাল খাদ্য এখন সমাজে একটি দুরারোগ্য ব্যাধির মত হয়ে গেছে। নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় সমাজের সকল পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে। যারা এই ভেজাল খাদ্য উৎপাদন করছেন, তারা যেকোনো উপায়ে মুনাফা নিশ্চিত করতে পারলেই খুশি। আমাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এগুলো মনিটরিং করার জন্য আমাদের খুবই অল্প সংখ্যক লোকবল রয়েছে। আমাদের লোকবল সঙ্কট না থাকলে, আরো ব্যাপকভাবে মনিটরিং করা যেতো এবং এসব অনিয়ম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতো। তবে মানুষের মধ্যে যদি নৈতিকতার উন্নয়ন না ঘটে, তবে শুধুমাত্র ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে কোনো লাভ হবে না।


১৯১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভেজাল বিরোধী একটি সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়। কারণ সেখানকার নাগরিকেরা বুঝতে পেরেছিলেন, ভেজাল খাদ্য তাদের নিজেদের জন্যই হুমকিস্বরূপ। ফলে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তারা ভেজালকে এমনভাবে বিদায় করেছেন যে, এখন সেখানে মানুষ ভেজাল শব্দটা ভুলতে বসেছেন। সে দেশের নাগরিকরা এতোটা সচেতন যে, গাছ থেকে সদ্য পড়া কোনো ফলও তারা পুষ্টিবিদদের অনুমতি ছাড়া খান না। আমাদের নাগরিকদেরও সেই পর্যায়ের সচেতনতা তৈরি করতে হবে।


এই ভেজাল যে শুধুমাত্র রেডিমেড খাদ্যে সেটা কিন্তু না। এর শিকড় আরো অনেক বেশি গভীরে। আমাদের মাটিও কিন্তু দূষিত। মাটিতে হেভি মেটাল দূষিত কেমিক্যাল সবকিছু মিশে আছে। সেই মাটিতেই আমরা ধান উৎপাদন করছি। সেগুলো চালের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। আমরা দুধ-ডিম, মুরগির মাংস, মাছ ইত্যাদি খাচ্ছি। সেগুলো চাষের সময় যে খাবার দেয়া হয়, সেই খাবার তৈরি হচ্ছে ট্যানারি বর্জ্য দিয়ে। ট্যানারি বর্জ্যে লেড, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়ামের মতো হেভি মেটাল মিশে থাকে। এগুলো শরীরে স্লো পয়জনিং করে। এখন আপনি যদি চাষের মাছ না খেয়ে সমুদ্রের মাছ খান, সেখানেও নদীর মাধ্যমে দূষিত বর্জ্য পদার্থ মিলিত হচ্ছে সাগরে। সামুদ্রিক মাছেও মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপাদানের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।


সাম্প্রতিক সময়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হচ্ছে। প্রতিবার গোসলে যে আমরা যেসব এরোমেটিক কসমেটিকস সামগ্রীগুলো ব্যবহার করি সেখানেও মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। এগুলো পানির মাধ্যমে সমুদ্রে প্রবাহিত হয়। সামুদ্রিক মাছ সেই মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করে। সেগুলো পুনরায় মাছের মাধ্যমে আমাদের দেহে প্রবেশ করে। এই দূষণ রোধ করতে সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি।


বিবার্তা: AQI তে দেখা যায়- ঢাকা পৃথিবীর অন্যতম বায়ুদূষণের শহর। আপনি সেই শহরের বাসিন্দা হিসেবে বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন? এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?


ড. এম এম মাজেদুল ইসলাম: আমার বলতে দ্বিধা নেই যে, ঢাকা বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দূষিত বায়ুর শহর। এর আগে দূষণের তালিকায় প্রথমে ছিলো দিল্লি, এখন ঢাকা। মাঝে কিছুদিন করাচি ছিলো। এগুলো কিন্তু সবগুলো একটি আরেকটির সাথে রিলেটেড। তবে আমাদের দেশে বর্তমানে বায়ু দূষণের মূল কারণ দেশে চলমান ব্যাপক উন্নয়ন। বিশেষ করে ঢাকাকে কেন্দ্র করে সরকারের অনেকগুলো উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে। তবে আরেকটি বিষয় যেটি সবচেয়ে বেশি দায়ী বলে আমি মনে করি, সেটা হচ্ছে প্রোপার ম্যানেজমেন্টের অভাব।


করোনা নিয়ে আমরা এতো কথা বলছি। অথচ প্রতিবছর কতো শতো মানুষ দূষিত বায়ু গ্রহণ করার জন্য মারা যাচ্ছে, সেটার কিন্তু কোনো হিসেব নেই। করোনার যতো লোক মারা গেছে, তার চেয়ে বেশি লোক মারা গিয়েছে বায়ুদূষণে, পানি দূষণে, অথবা রোড এক্সিডেন্টে।


বিবার্তা: বুড়িগঙ্গা দেশের অন্যতম দূষিত নদী হবার পেছনে কারা দায়ী বলে আপনি মনে করেন?


ড. এম এম মাজেদুল ইসলাম: একটি সময় বুড়িগঙ্গা দূষণের অন্যতম কারণ ছিলো হাজারীবাগের ট্যানারি। সেই ট্যানারিগুলো এখন সাভারে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। কিছু হয়তো রয়ে গেছে। কিন্তু দূষণ এখনো থামছে না। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে নদীর তীরবর্তী কলকারখানার ক্যামিক্যাল বর্জ্য। দেশে যতো কেমিক্যাল কারখানা আছে, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি আছে, সেখানে ইটিপি থাকা ম্যান্ডেটরি। কিন্তু অনেক কারখানায় ইটিপি প্লান্ট নেই, থাকলেও সেগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে না। সরকার থেকে যখন মনিটরিংয়ে যায়, তখন তারা সেগুলো চালু করে রাখে। আবার যখন চলে যায়, তখনই আবার ইটিপি প্লান্টগুলো বন্ধ করে দেয়। ফলে অপরিশোধিত ক্যামিক্যাল বর্জ্যগুলো সরাসরি বুড়িগঙ্গায় অথবা ঢাকার পাশে অন্য কোনো নদীতে গিয়ে মিশে যাচ্ছে।


নদী দূষণের আরো একটি বড় কারণ হচ্ছে, মানুষের পয়ঃবর্জ্য। বর্তমানে বাংলাদেশে পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার নেই বললেই চলে। দু’একটা হাতেগোনা থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় সেটা খুবই অপ্রতুল। ফলে সব ধরনের বর্জ্যের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হচ্ছে নদী। গাজীপুর বা ঢাকার আশেপাশের নদীর পানির রং দেখলেই বোঝা যাবে যে, কতোটা দূষিত সেগুলো। সেখানে পানির রং আলকাতরার মতো কালো।


২০০৯ সালে সরকার বুড়িগঙ্গা, বালু ও তুরাগ নদীকে ইকোলজিক্যালি ক্রিটিকাল এরিয়া হিসেবে ঘোষণা করে। তুরাগ নদীকে মানুষের মতো একটি সত্ত্বা দান করা হয়েছে। এই প্রথা পৃথিবীতে সর্বপ্রথম চালু করে মাওরি সম্প্রদায়ের মানুষ। নিয়ম হচ্ছে সেই নদীতে কোনো ধরনের বর্জ্য ফেলা যাবে না। নদীকে তার আপন গতিতে চলতে দিতে হবে। সেসব নদীতে অত্যাধিক মাছ শিকার করা যাবে না। কিন্তু সেটি কি আদৌ বাস্তবায়িত হচ্ছে? আইন আছে কিন্তু সেই আইনের প্রয়োগ নেই। এগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের একটি সামাজিক আন্দোলন দরকার।



বিবার্তা: এ পর্যন্ত আপনার তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। লেখালেখি নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?


ড. এম এম মাজেদুল ইসলাম: সরকারি চাকরির পাশাপাশি আমি বিভিন্ন পেপার-পত্রিকায় লিখি। আমার দুইটি উপন্যাস ও একটি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে। এর পেছনে আমার একমাত্র উদ্দেশ্য, মানুষের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা। যেহেতু আমি পরিবেশ বিজ্ঞানের ছাত্র, আমার মধ্যে সামান্য যে জ্ঞানটুকু আছে, সেই জ্ঞানটুকু দিয়েই আমি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে চাই। আমরা যতোই বলি দেশে শিক্ষার হার বাড়ছে, কিন্তু আমাদের মধ্যে মৌলিক কিছু সচেতনতার বড়ই অভাব আছে বলে আমি মনে করি।


আমার আরো একটি ইচ্ছা আছে। আমি বাস্তবতার নিরিখে কিছু গবেষণাধর্মী লেখা লিখবো, যেগুলো মানুষের প্রাত্যহিক সামাজিক জীবনে উপকারে আসবে।


বিবার্তা: কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান?


ড. এম এম মাজেদুল ইসলাম: আমাদের সরকারের একটি ভিশন রয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী, উন্নত দেশে পরিণত হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। আমার ধারণা, ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা পুরোপুরি উন্নত দেশে পরিণত না হলেও, সেটার কাছাকাছি পৌঁছে যাবো।


কিন্তু চিন্তার বিষয়টি হচ্ছে, আমরা মানব উন্নয়নসূচকে উন্নত দেশের তুলনায় এখনো অনেকটাই পিছিয়ে আছি। ২০৪১ সালের মধ্যে এই সূচকে ও আমাদের অনেকখানি উন্নয়ন করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের যেসব উন্নয়ন হচ্ছে, সেগুলো যেনো টেকসই উন্নয়ন হয়, আমরা দৈনন্দিন জীবনে যে পরিমাণ শক্তির ব্যবহার করি সেটি যেনো গ্রিন এনার্জি হয় সেটার দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো ধরনের উন্নয়ন হতে পারে না। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আমরা যদি একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে না পারি, সেই ব্যর্থতার দায়ভার আমাদের নিতে হবে। পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করে আমরা উন্নয়ন চাই না। টেকসই উন্নয়ন এবং পাশাপাশি মানব উন্নয়ন, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন একটি উন্নত সমাজ আমি দেখতে চাই। আপাতত এটাই আমার স্বপ্ন।


বিবার্তা: বিবার্তাকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।


ড. এম এম মাজেদুল ইসলাম: আপনাকে এবং বিবার্তা পরিবারকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।


বিবার্তা/আদনান/রোমেল/আশিক

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com